বরং, উল্টো তারা জোর দিয়েছেন যে ভালো ও আনন্দে থাকা ইহুদিদের কর্তব্য। বারবার তারা বাইবেলিয় চরিত্র জ্যাকব, ডেভিড বা এশতারের অসুস্থ বা অসুখী অবস্থায় পবিত্র আত্মার তাদের ত্যাগ করা বা পরিত্যাগ করার কথা উল্লেখ করেছেন। অনেক সময় আত্মা তাঁদের ছেড়ে যাচ্ছে মনে হলে তাঁরা শ্লোক আবৃতি করে দেখিয়েছেন: ‘হে আমার ঈশ্বর, হে আমার ঈশ্বর, আমাকে কেন তুমি ত্যাগ করলে?’ ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় জেসাস যখন এই প্রশ্নটি উচ্চারণ করেছিলেন, সে সম্পর্কে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন ওঠে এখানে। র্যাবাইগণ শিক্ষা দিয়েছেন যে, নারী-পুরুষ কষ্ট পাক এটা চাননি ঈশ্বর। দেহ যেহেতু ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে গঠিত, সুতরাং একে সম্মান দিতে হবে, যত্ন নিতে হবে: এমনকি মদ পান বা যৌনতার মতো আনন্দ ত্যাগ করাটাও পাপ হতে পারে, কারণ মানুষের উপভোগের জন্যেই ঈশ্বর এগুলো দান করেছেন। দুঃখ কষ্টে আর সন্ন্যাসে ঈশ্বরকে পাওয়া যাবে না। তারা মানুষকে পবিত্র আত্মা ‘অধিকার করার প্রকৃত পথে চলার তাগিদ দেওয়ার সময় আসলে এক অর্থে নিজেদের জন্যে ঈশ্বরের নিজস্ব ইমেজ গড়ে নেওয়ার কথাই বুঝিয়েছেন। তারা শিক্ষা দিয়েছেন যে, ঈশ্বরের কাজের শুরু ও মানুষের কাজের শেষ কোথায় বলা মোটেই সহজ নয়। পয়গম্বরগণ সব সময় তাঁদের। নিজস্ব অন্তদৃষ্টি ঈশ্বরের ওপর আরোপ করে পৃথিবীতে তাঁকে দৃশ্যমান করে ভুলেছেন। এখন র্যাবাইরা এমন একটা কাজে নিজেদের নিয়োজিত করলেন যেটা একাধারে মানবীয় ও স্বর্গীয়। যখন তারা কোনও নতুন বিধান জারি করেছেন, সেটাকে একই সঙ্গে ঈশ্বর প্রদত্ত ও তাদের নিজস্ব আরোপিত বলেও দেখা হয়েছে। তোরাহ্র সংখ্যা বাড়িয়ে তাঁরা পৃথিবীতে তাঁর উপস্থিতির বিস্তার ঘটাচ্ছিলেন এবং একে আরও কার্যকর করে তুলছিলেন। নিজেরাই তোরাহর অবতার হিসাবে শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত হয়েছেন তারা; ‘ল’-এর ক্ষেত্রে দক্ষতার কারণে অন্য যে কারও চেয়ে তারা অনেক বেশি মাত্রায় ‘ঈশ্বরের মতো’[৯৮] ছিলেন ।
সর্বব্যাপী ও অন্তস্থ ঈশ্বরের এই বোধ ইহুদিদের মানুষকে পবিত্র হিসাবে দেখতে সাহায্য করেছে। র্যাবাই আকিভার শিক্ষা (reduce), ‘প্রতিবেশীকে নিজের মতো করেই ভালোবাসতে হবে’ই ছিল ‘তোরাহর মহান নীতি।’[৯৯] ঈশ্বর, যিনি তাঁর অনুরূপে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, মানুষের বিরুদ্ধে আক্রমণ সেই ঈশ্বরেরই প্রত্যাখ্যান স্বরূপ। এটা নাস্তিক্যের সমান, ঈশ্বরকে অগ্রাহ্য করার ব্লাসফেমাস প্রয়াস। এ কারণেই হত্যা সর্বোচ্চ পাপ, ঐশীগ্রন্থ আমাদের শেখায়, যে মানুষের রক্ত ঝরায় সে যেন স্বর্গীয় প্রতিরূপকেই বিনষ্ট করে।’[১০০] আরেকজন মানুষের সেবা করার কাজটি হচ্ছে imitatio de: এতে ঈশ্বরের বদান্যতা আর দয়ার পুনসৃষ্টি ঘটে। যেহেতু সকলকেই ঈশ্বরের প্রতিরূপে গড়ে তোলা হয়েছে, সেহেতু সবাই সমান: এমনকি সর্বোচ্চ পুরোহিত যদি কাউকে আহত করেন তো তাকেও প্রহার করা যাবে, কেননা আঘাত করে তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করার অনুরূপ অপরাধ করেছেন।[১০১] ঈশ্বর আদম (adam) নামে একজন মানুষকে সৃষ্টি করেছিলেন আমাদের এই শিক্ষা দেওয়ার জন্যে যে, যদি কেউ একজন মানুষকেও ধ্বংস করে তাকে এমন শাস্তি দেওয়া হবে যেন সে গোটা বিশ্ব ধ্বংস করেছে।[১০২] এটা স্রেফ চড়া আবেগ ছিল না, বরং আইনের মূল নীতি: এর অর্থ ছিল, উদাহরণ স্বরূপ, যুদ্ধ বিদ্রোহের সময় কোনও একদলের স্বার্থে একজন ব্যক্তিকেও হত্যা করা যাবে না। কাউকে অপমানিত করা, হোক না সে গোয় (Goy) বা দাস, অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ, কেননা এটা হত্যার সমান, ঈশ্বরের ভাবমূর্তিকে অস্বীকার করার অপবিত্র অপরাধ ।[১০৩] মুক্তি বা স্বাধীনতার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: র্যাবাইদের গোটা সাহিত্য তন্নতন্ন করে খুঁজেও কাউকে বন্দি করার কোনও রকম উল্লেখ খুঁজে পাওয়া কঠিন, কারণ একমাত্র ঈশ্বরই কারও স্বাধীনতা খর্ব করার অধিকারী। কারও সম্পর্কে বাজে গুজব রটানো ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করার সামিল।[১০৪] ঈশ্বরকে বড় ভাইয়ের মতো কিছু যেন না ভাবে ইহুদিরা, মহাশূন্য হতে যিনি তাদের প্রতিটি নড়াচড়ার উপর নজর রাখছেন; বরং তাদের প্রত্যেক মানুষের মাঝে ঈশ্বর উপস্থিতির একটা বোধ জাগিয়ে তুলতে হবে যাতে অন্যদের সঙ্গে আমাদের আচার আচরণ পবিত্র সাক্ষাতে পরিণত হয়।
প্রকৃতির দাবি অনুযায়ী বাস করতে পশু জগতের কোনও সমস্যা হয় না, কিন্তু নারী-পুরুষের জন্যে যেন পুরোপুরি মানুষ হয়ে ওঠা কঠিন। ইসরায়েলের ঈশ্বর মাঝে মাঝে যেন একেবারে অপবিত্র ও অমানুষিক নিষ্ঠুরতাকে উৎসাহিত করেছিলেন বলে মনে হয়। কিন্তু শত শত বছরের পরিক্রমায় ইয়াহ্ওয়েহ্ এমন এক ধারণার রূপ নিয়েছিলেন যা মানুষকে স্বজাতির প্রতি দরদ ও শ্রদ্ধা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে, যা ছিল অ্যাক্সিয়াল যুগের সকল ধর্মের বৈশিষ্ট্য বা নির্দেশক। র্যাবাইদের মতবাদ ঈশ্বরের ধর্মসমূহের দ্বিতীয়টির অনেক কাছাকাছি, ঠিক একই ঐতিহ্য বা ধারায় প্রোথিত ছিল যার শেকড় ।
০৩. জেন্টাইলদের প্রতি আলো
ফিলো যখন আলেকজান্দ্রিয়ায় তাঁর প্লেটোনাইজড় ইহুদিবাদ প্রচার করছেন এবং হিল্লেল ও শাম্মাই জেরুজালেমে যুক্তির জাল বিস্তার করে চলেছেন; সেই একই সময়ে একজন ক্যারিশম্যাটিক ফেইথ হীলার উত্তর প্যালেস্তাইনে কাজ শুরু করেছিলেন। জেসাস সম্পর্কে খুব কমই জানি আমরা। তাঁর জীবনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিবরণী হচ্ছে সেইন্ট মার্কের গস্পেল, যা জেসাসের মৃত্যুর প্রায় চল্লিশ বছর পর আনুমানিক ৭০ সালে রচিত হয়েছিল। ততদিনে জেসাস তাঁর অনুসারীদের জন্যে যে তাৎপর্য অর্জন করেছিলেন সেগুলোর ঐতিহাসিক বাস্ত বতা পৌরাণিক উপাদানের ভারে চাপা পড়ে গিয়েছিল। সেইন্ট মার্ক এই তাৎপর্যকেই মূলত বিশ্বস্ত, সরলরৈখিক উপস্থাপনের বদলে তুলে ধরেছেন। প্রাথমিক ক্রিশ্চানরা তাকে এক নতুন মোজেস, নয়া জোশুয়া, নতুন ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে দেখেছে। বুদ্ধের মতো জেসাসও যেন তাঁর সমসাময়িক অনেকের গভীর আকাঙ্ক্ষা ধারণ করেছেন এবং যে-স্বপ্ন ইহুদিদের শত শত বছর তাড়া করে ফিরেছিল তার বাস্তবায়ন ঘটিয়েছেন। জীবদ্দশায় প্যালেস্তাইনের ইহুদিরা তাঁকে মেসায়াহ বলে বিশ্বাস করেছিল: তিনি জেরুজালেমে প্রবেশ করেছিলেন এবং ডেভিডের পুত্র বলে তার গুণ গাওয়া হয়েছিল; কিন্তু এর মাত্র কয়েকদিন পরেই রোমানদের কষ্টদায়ক কুসিফিক্সশন নামক শাস্তি প্রয়োগ করে তাকে হত্যা করা হয় । কিন্তু সাধারণ অপরাধীর মতো মৃত্যুবরণকারী একজন মেসায়াহর কেলেঙ্কারী সত্ত্বেও অনুসারীরা বিশ্বাস করতে চায়নি যে তাঁকে বিশ্বাস করা ভুল হয়েছে। গুজব ছিল যে, তিনি মৃত অবস্থা থেকে আবার উত্থিত হয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেছে, কুসিফিক্সশনের তিন দিন পর নাকি তাঁর কবর ফাঁকা দেখা গেছে; অন্যরা তাকে স্বপ্নে দেখেছে; এবং একবার ৫০০ মানুষ যুগপৎ দেখতে পেয়েছিল তাঁকে। অনুসারীদের বিশ্বাস ছিল যে অচিরেই তিনি ঈশ্বরের মেসিয়ানিক রাজ্য উদ্বোধন করার জন্যে আবার ফিরে আসবেন। যেহেতু এধরনের বিশ্বাস ধর্ম বিরোধী কিছু ছিল না, ওদের গোত্রটিকে হিল্লেলের পৌত্র এবং অন্যতম মহান তেন্নাইম র্যাবাই গ্যামালিয়ের মতো ব্যক্তিও প্রকৃত ইহুদি হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। তাঁর অনুসারীরা খাঁটি ইহুদিদের মতো প্রতিদিন মন্দিরে উপাসনা করত। শেষ পর্যন্ত অবশ্য জেসাসের জীবন, মৃত্যু ও পুনরুত্থানে অনুপ্রাণিত নব্য ইসরায়েল এক অ-ইহুদি (জেন্টাইল) ধর্ম বিশ্বাসে পরিণত হবে, যা ঈশ্বর সম্পর্কে এর নিজস্ব সুস্পষ্ট ধারণা গড়ে তুলবে।
