এসো এবং দেখ ইসরায়েলিরা ঈশ্বরের কত প্রিয়, কারণ ওরা যেখানেই গেছে শেকিনাহ্ ওদের অনুসরণ করেছে, যেমন বলা হয়েছে, ‘ওরা যখন মিশরে ছিল আমি কি তখন ওদের পূর্বপুরুষদের ঘরে নিজেকে সহজে প্রকাশ করেছিলাম? খাবিলনে শেকিনাহ্ ওদের সঙ্গে ছিল, যেমন বলা হয়েছে, তোমাদের স্বার্থে আমাকে বাবিলনে পাঠানো হয়েছিল।’ এবং ভবিষ্যতে যখন ইসরায়েল নিষ্কৃতি লাভ করবে, শেকিনাহ ওদের সঙ্গে থাকবে, যেমন বলা হয়েছে, ‘তোমাদের প্রভু তোমাদের ঈশ্বর তোমাদের বন্দিত্ব ঘোচাবেন।’ অর্থাৎ ঈশ্বর বন্দিত্বের সাথে ফিরে আসবেন। [৮৮]
ইসরায়েল এবং ঈশ্বরের সম্পর্ক এতো নিবিড় ছিল যে অতীতে যখন তিনি ইসরায়েলকে উদ্ধার করেছেন, ইসরায়েলিরা ঈশ্বরকে বলেছে: ‘আপনি আপনাকেই মুক্তি দিয়েছেন।’[৮৯] নিজস্ব ইহুদি ঢঙে র্যাবাইগণ এই ধারণা গড়ে তুলছিলেন যে, ঈশ্বরের অনুভূতি সত্তার (Self) সঙ্গে জড়িত, হিন্দুরা যাকে আত্মা বলেছে। নির্বাসিতরা যেখানেই যাক না সেখানেই ঈশ্বরের অস্তিত্বের অনুভূতি বা ধারণা গড়ে তুলতে শোকিনাহর ইমেজ সাহায্য করেছিল। র্যাবাইগণ ডায়াসপোরার এক সিনাগগ থেকে অন্যটিতে শেকিনাহর ঘুরে বেড়ানোর কথা বলেছেন, অন্যরা বলেছেন এটা সিনাগগের দরজায় দাঁড়িয়ে ইহুদিদের হাউস অভ স্টাডিজের দিকে প্রতি পদক্ষেপে অগ্রসর হওয়াকে আশীর্বাদ জানায়; ইহুদিরা সিনাগগে সম্মিলিতভাবে শেমা আবৃত্তি করার সময়ও শেকিনাহ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।[৯০] পূর্বকালের ক্রিশ্চানদের মতো ইসরায়েলিরা তাদের র্যাবাইদের দ্বারা নিজেদেরকে ‘এক দেহ এবং এক আত্মা’[৯১] বিশিষ্ট একটি সমাজ হিসেবে দেখতে উৎসাহিত হয়েছে। এই সমাজই নতুন মন্দির, অন্তস্থ ঈশ্বরের আবাস: এজন্যেই যখন তারা সিনাগগে ‘ভক্তি সহকারে নিখুঁত সমস্বরে শেমা আবৃত্তি করে এক সুরে এক মনে আর এক কণ্ঠে’ তখন ঈশ্বর তাদের মাঝে উপস্থিত থাকেন। কিন্তু সমাজের যে কোনওরকম অসামঞ্জস্য তিনি ঘৃণা করেন এবং স্বর্গে ফিরে যান, দেবদূতরা যেখানে ‘এক স্বরে এবং এক সূরে’ স্বর্গীয় প্রশংসার গান[৯২] গাইতে থাকে। ঈশ্বর এবং ইসরায়েলের উচ্চ সম্মিলন তখনই সম্ভব হবে যখন ইসরায়েলিদের সঙ্গে ইসরায়েলিদের নিম্ন সম্মিলন সম্পন্ন হবে: র্যাবাইগণ ক্রমাগত তাদের বলে গেছেন, ইহুদিদের কোনও দল যখন একসঙ্গে তোরাহ্ পাঠ করে, শেকিনাহ্ তাদের মাঝে বসে থাকে। [৯৩]
নির্বাসিত অবস্থায় ইহুদিরা চারপাশের বিশ্বের কঠোরতা অনুভব করেছে; এই ধরনের উপস্থিতির বোধ তাদের সদাশয় ঈশ্বর দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকার অনুভূতি লাভে সাহায্য করেছে। তারা যখন তাদের ফিলেক্টরিগুলো (Plyaetoris: tfillin) হাত ও মাথায় জড়াত, আচরিক ঝালড় পরত এবং শেমার বাণী লেখা nezuzah দরজায় ঝোলাত ডিউটেরোনমি অনুযায়ী ঐসব অস্পষ্ট ও অদ্ভুত আচরণের ব্যাখ্যার প্রয়াস না পেতে বলা হয়েছে তাদের, তা এর মূল্য সীমীত করে দেবে; বরং তাদের উচিত হবে এসব mitzvot-এর অনুসরণ যেন ঈশ্বরের পরিব্যাপী ভালোবাসা সম্পর্কে সজাগ করে তুলতে পারে সে অবকাশ দেওয়া; ‘ইসরায়েল প্রিয়ভাজন! mitzvot দিয়ে বাইবেল তাঁকে ঘিরে রেখেছে: মাথা আর বাহুতে tfillin, দরজায় একটা mizuzah, পোশাকে titzit,[৯৪] এগুলো যেন কোনও রাজার তার রানিকে আরও সুন্দর করে তোলার জন্যে উপহার দেওয়া রত্নের মতো। ব্যাপারটা সহজ ছিল না। তালমুদ দেখায় যে, কেউ কেউ চিন্তা করেছিল এমন অন্ধকার পৃথিবীতে ঈশ্বর খুব একটা আসেন-যান কিনা।[৯৫] যারা জেরুজালেম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল কেবল তাদের মাঝেই নয়, বরং বরাবর ডায়াসপোরায় বাসকারী ইহুদিদের মাঝেও র্যাবাইদের আধ্যাত্মিকতা ইহুদিদের একটা মান স্থাপন করেছিল। সেটা একটা নিখুঁত তত্ত্বীয় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল বলে নয়: আইন-এর বহু অনুশীলনের যৌক্তিক কোনও অর্থ নেই, র্যাবাইদের ধর্ম গৃহীত হয়েছিল এর কার্যকারিতার জন্যে। র্যাবাইদের দর্শন তাদের স্বজাতির হতাশায় কবলিত হওয়া ঠেকিয়েছিল।
অবশ্য এ ধরনের আধ্যাত্মিকতা ছিল কেবল পুরুষের জন্যে-কেননা প্রয়োজন না থাকায়, নারীদের র্যাবাই হওয়া, তোরাহ্ পাঠ বা সিনাগগে যাবার অনুমতি ছিল না। সেসময়ের অধিকাংশ মতাদর্শের মতো ঈশ্বরের ধর্ম পুরুষতান্ত্রিক রূপ নিচ্ছিল। নারীদের দায়িত্ব ছিল বাড়িতে আচরিক পবিত্রতা বজায় রাখা। ইহুদিরা বহু আগেই বিভিন্ন উপকরণ আলাদা করার মাধ্যমে সৃষ্টিকে পবিত্র করেছিল। এই চেতনার আলোকে নারীদের পুরুষ সমাজ থেকে একটা ভিন্ন স্তরে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ঠিক যেমন রান্নাঘরে দুধ আর মাংস আলাদা তাকে রাখতে হয়। বাস্তব ক্ষেত্রে এর অর্থ ছিল ওদের নিম্নস্তরে ঠেলে দেওয়া। যদিও র্যাবাইরা শিক্ষা দিয়েছিলেন যে নারীরা ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট, কিন্তু পুরুষদের সকালের প্রার্থনায় তাদের অ-ইহুদি (জেন্টাইল) দাস বা নারী হিসাবে সৃষ্টি না করার জন্যে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানানোর আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তবু বিয়েকে পবিত্র দায়িত্ব এবং পারিবারিক জীবনকে পবিত্র বিবেচনা করা হতো। র্যাবাইগণ বিধিবিধানে এর পবিত্রতার প্রতি জোর দিয়েছেন যাকে প্রায়শঃই ভুল বোঝা হয়েছে। ঋতুস্রাবের সময় যৌন মিলনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণ এই নয় নারীকে নোংরা বা অস্পৃশ্য হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। পুরুষরা যেন স্ত্রী-সঙ্গকে নিশ্চিত ভেবে না বসে সেজন্যেই এই অবকাশের সৃষ্টি করা হয়েছিল: ‘কারণ একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে অনেক বেশি জেনে ফেলতে পারে এবং তাতে বিতৃষ্ণা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে, তোরাহ্ বলছে (ঋতুস্রাবের পর। সাতদিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীকে নিদ্দাহ (যৌন সঙ্গমের অতীত] হতে হবে যাতে করে পরে সে পুরুষের কাছে বিয়ের দিনের মতো প্রিয় হয়ে। উঠতে পারে।’[৯৬] উৎসবের দিনে সিনাগগে যাবার আগে একজন পুরুষের জন্যে আচরিক স্নান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে সে সাধারণ অর্থে অপরিচ্ছন্ন বা নোংরা বলে নয়, বরং সে যেন পবিত্র প্রার্থনার জন্যে নিজেকে আরও বেশি পবিত্র করে তুলতে পারে সে জন্যে। এবং একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ঋতুস্রাবের পর আসন্ন পবিত্রতা অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করে নেওয়ার লক্ষ্যে নারীকে আচরিক-স্নানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এভাবে যৌনতা যে পবিত্র হতে পারে, এ ধারণা ক্রিশ্চানদের কাছে বিসদৃশ্য শোনাবে, খৃস্টধর্মে যৌনতা ও ঈশ্বরকে অনেক সময় পরস্পর বিরোধী হিসাবে দেখা হবে। এ কথা সত্যি যে, পরবর্তীকালের ইহুদিরা র্যাবাইদের এসব বিধিনিষেধের নেতিবাচক ব্যাখ্যা করেছে, কিন্তু র্যাবাইগণ নিরানন্দ, সন্ন্যাসমূলক জীবনবিরোধী আধ্যাত্মিকতার প্রচার করেননি।
