তাঁদের সত্তার অনুভূতি এত প্রবল ছিল যে প্রচলিত যে কোনও বাস্তব মতবাদ বেমানান মনে হতো। র্যাবাইগণ বারবার মত প্রকাশ করেছেন যে সিনাই পর্বতের পাদদেশে অপেক্ষমান প্রত্যেক ইসরায়েলি ভিন্ন ভিন্নভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনুভব করেছিল। ব্যাপারটি ছিল এরকম, ঈশ্বর ‘প্রত্যেকের উপলব্ধির মাত্রা অনুযায়ী’[৮১] ওদের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলেন। একজন র্যাবাই যেমন বলেছেন: ‘ঈশ্বর গুরুভার হয়ে মানুষের কাছে আসেন বরং তাকে গ্রহণ করার মানুষটির ক্ষমতার সঙ্গে মানানসইভাবেই উপস্থিত হন।[৮২] র্যাবাইদের এই গুরত্বপূর্ণ দর্শনের মানে হচ্ছে ঈশ্বরকে কোনও সূত্র দিয়ে বর্ণনা করা সম্ভব নয় বা সবার কাছে তিনি একরকম নন। তিনি অত্যাবশ্যকীয়ভাবে মানসিক উপলব্ধি। প্রত্যেক ব্যক্তি যার যার নিজস্ব বিশেষ মেজাজ-মর্জির চাহিদার সমাধান হিসাবে ভিন্ন ভিন্নভাবে ঈশ্বরের সত্তার অভিজ্ঞতা লাভ করবে। র্যাবাই জোর দিয়ে বলছেন, প্রত্যেক ব্যক্তি পয়গম্বর ভিন্ন ভিন্নভাবে ঈশ্বরকে অনুভব করেছেন, কারণ তাঁর ব্যক্তিত্ব ঈশ্বর সম্পর্কে তাঁর ধারণাকে প্রভাবিত করেছে। আমরা দেখব, অন্য একেশ্বরবাদীরাও পুরোপুরি অনুরূপ ধারণা গড়ে তুলবে। এখন পর্যন্ত ইহুদিদের ঈশ্বর সম্পর্কিত ধর্মতাত্ত্বিক ধারণাসমূহ ব্যক্তিগত ব্যাপার, প্রশাসন এগুলো চাপিয়ে দেয় না।
যে কোনও প্রথাবদ্ধ মতবাদ ঈশ্বরের আবশ্যকীয় রহস্যময়তাকে সীমিত করে দেবে। র্যাবাই যুক্তি দেখিয়েছেন, ঈশ্বর সম্পূর্ণ বোধের অতীত। এমনকি মোজেসও ঈশ্বরের রহস্য ভেদ করতে পারেননিঃ দীর্ঘ গবেষণার পর রাজা ডেভিড স্বীকার গেছেন যে, তাঁকে বোঝার চেষ্টা বৃথা, কারণ তিনি মানুষের বুদ্ধির নাগালের বাইরে।[৮৩] ইহুদিরা এমনকি ঈশ্বরের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করার অনুমতি পায়নি, এটা তাঁকে প্রকাশ করার যে কোনও প্রয়াস যে অপর্যাপ্ত হতে বাধ্য তারই স্মারক: YHWH এভাবে ঈশ্বরের নাম লেখা হয়েছিল, কিন্তু ধর্মগ্রন্থ পাঠের সময় নামটি উচ্চারণ করা হয় না। প্রকৃতিতে ঈশ্বরের কর্মকাণ্ডের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে পারি আমরা; কিন্তু র্যাবাই হুনা যেমন বলেছেন, এটা কেবল গোটা সত্তা সম্পর্কে আমাদের খুবই সামান্য ধারণা দেয়: ‘বজ্র, ঘূর্ণিঝড়, তুফান, বিশ্বজগতের নিয়ম শৃঙ্খলার অর্থ এবং নিজ প্রকৃতি মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়; তাহলে কী করে সে সকল রাজার রাজার কার্যকলাপ বোঝার দাবি করে? ঈশ্বরের ধারণার মোদ্দা কথা হচ্ছে রহস্যময়তা এবং জীবনের বিস্ময় সম্পর্কে অনুভূতি উৎসাহিত করা নিখুঁত সমাধানের সন্ধান নয়। র্যাবাইগণ এমনকি প্রার্থনার সময় ঘনঘন ঈশ্বরের প্রশংসা করার ব্যাপারে ইহুদিদের সতর্ক করে দিয়েছেন, কারণ তাদের ভাষা ত্রুটিপূর্ণ হতে বাধ্য। [৮৫]
এই দুৰ্জেয় এবং দুর্বোধ্য সত্তা কীভাবে বিশ্ব জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছিলেন? র্যাবাইগণ একটি প্যারাডক্সের মাধ্যমে এই সংক্রান্ত মত প্রকাশ করেছেন: ‘ঈশ্বর হচ্ছেন পৃথিবীর স্থান, কিন্তু পৃথিবী ঈশ্বরের স্থান নয়।’[৮৬] ঈশ্বর পৃথিবীকে ঘিরে আছেন, আবৃত্ত করে রেখেছেন, কিন্তু সাধারণ সৃষ্টির মতো তিনি এখানে বাস করেন নাই। আরেকটি প্রিয় ইমেজে তারা বলছেন। যে, আত্মা যেমন দেহকে ভরিয়ে রাখে ঈশ্বর তেমনি পৃথিবীকে ভরে রেখেছেন: আত্মা দেহে থেকেও দেহাতীত। আবার, তারা এও বলেছেন যে, ঈশ্বর ঘোড়ার পিঠে একজন সওয়ারির মতো: যখন তিনি ঘোড়ার দিকে থাকেন, আরোহীকে ঘোড়ার ওপর নির্ভর করতে হয়, কিন্তু তিনি পশুটির চেয়ে উন্নত এবং লাগাম থাকে তাঁর হাতে। এগুলো ইমেজ মাত্র এবং অনিবার্যভাবে অপূর্ণাঙ্গ; এগুলো ছিল এক বিশাল, সংজ্ঞাতীত কিছুর কল্পনাভিত্তিক বর্ণনা, যার মাঝে আমরা বেঁচে থাকি, চলাফেরা করি এবং আমাদের সত্তাকে পাই। তারা পৃথিবীতে ঈশ্বরের অস্তিত্বের কথা বলবার সময় বাইবেল-লেখকদের মতো বৃহত্তর প্রবেশাতীত স্বর্গীয় রহস্যের সঙ্গে তিনি তাঁর যেসব চিহ্ন দেখার অনুমতি দিয়ে থাকেন তার মাঝে সযত্নে পার্থক্য টানার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁরা YHWH এবং পবিত্র আত্মার ‘প্রতাপ’ (কাভোদ) ইমেজ পছন্দ করেছেন, এগুলো আমাদের অনুভূতির ঈশ্বরের সঙ্গে যে স্বর্গীয় সত্তার প্রকৃত রূপ মেলে না তারই স্মারক।
তাদের অন্যতম প্রিয় ঈশ্বর সমার্থক শব্দ ছিল হিব্রু শাকান হতে গৃহীত শেকিনাহ, যার অর্থ কারও তাঁবুতে বাস করা বা আবৃত্ত করা; যেহেতু এখন আর মন্দিরের অস্তিত্ব নেই, যেই ঈশ্বর ইসরায়েলিদের পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর সময় সঙ্গী হয়েছিলেন তাঁর ইমেজ ঈশ্বরের নৈকট্যের কথা তুলে ধরেছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, পৃথিবীতে তাঁর জাতির সঙ্গে বাসকারী শেকিনাহ এখনও টেম্পল মাউন্টে বাস করছেন, যদিও মন্দির ধ্বংস হয়ে গেছে। অন্য র্যাবাইদের যুক্তি ছিল, মন্দির ধ্বংস হওয়ায় শেকিনাহ জেরুজালেম থেকে মুক্ত হয়ে বাকি বিশ্বে বাস করার সুযোগ পেয়েছেন। স্বর্গীয় প্রতাপ’ বা পবিত্র আত্মার মতো শেকিনাহকে আলাদা স্বর্গীয় সত্তা হিসাবে চিন্তা করা হয়নি বরং পৃথিবীতে ঈশ্বরের উপস্থিতি মনে করা হয়েছে। র্যাবাইগণ স্বজাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করেছেন এবং লক্ষ করেছেন যে এটা সবসময় ওদের সঙ্গে ছিল:
