প্যালেস্তাইনের সকল ইহুদির মাঝে ফারিজিরা ছিল সবচেয়ে প্রগতিশীল। এরা এসিনদের সমাধানকে বাড়াবাড়িরকম অভিজাত শ্রেণীর মনে করেছিল। নিউ টেস্টামেন্টে ফারিজিদের কপটাচারী ও চরম ভণ্ড হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর জন্যে দায়ী প্রথম শতকের ধর্মীয় যুক্তিতর্কের বিকৃতি। ফারিজিরা অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ইহুদি ছিল। তারা বিশ্বাস করত গোটা ইসরায়েল পুরোহিতদের এক পবিত্র জাতি হিসাবে অ্যাখ্যায়িত। মন্দিরের মতো তুচ্ছ ঘরেও ঈশ্বর অবস্থান করতে পারেন। এরই প্রেক্ষিতে তারা রাজকীয় বা স্বীকৃত পুরোহিত গোত্রের মতো জীবন যাপন করত এবং নিজস্ব বাড়িতে পবিত্রতা অর্জনের সেইসব বিধিবিধান পালন করত সেগুলো কেবল মন্দিরের জন্যে প্রযোজ্য ছিল। আচরিক অবস্থায় খাদ্যগ্রহণের ওপর জোর দিত তারা, কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল যে প্রত্যেক ইহুদির খাবার টেবিল আসলে মন্দিরে ঈশ্বরের বেদীর মতো। দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়ে ঈশ্বরের উপস্থিতির একটা অনুভূতি গড়ে তুলেছিল ওরা। পুরোহিত শ্রেণী ও জাঁকাল আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই ইহুদিরা। এখন ঈশ্বরের কাছে সরাসরি প্রার্থনা জানাতে পারে। প্রতিবেশীদের প্রতি সদয় আচরণ দিয়ে পাপের প্রায়শ্চিত করতে পারে; তোরাহ অনুযায়ী দান হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিতভাহ (mitzvah): দুজন বা তিনজন ইহুদি সম্মিলিতভাবে যখন তোরাহ্ পাঠ করে, ঈশ্বর তখন তাদের মাঝে উপস্থিত থাকেন। শতাব্দীর গোড়ার দিকের বছরগুলোয় দুটো আলাদা মতবাদ জন্ম নিয়েছিল। একটির নেতৃত্বে ছিলেন শাম্মাই দ্য এল্ডার, এটা ছিল বেশি উগ্র। অন্যটির নেতৃত্বে ছিলেন মহান ব্যাবাই হিল্লেল দ্য এল্ডার। ফারিজিদের ইতিহাসে এই মতবাদই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে। একটা গল্প চালু আছে যে, একদিন জনৈক পৌত্তলিক এসে হিল্লেলকে জানায় তিনি এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় প্রভু গোটা তোরাহ্ আবৃত্তি করতে পারলে সে ইহুদিবাদে দীক্ষা নেবে। হিল্লেল জবাব দিয়েছেন: “নিজে যেটা করতে পারবে না সেটা অন্যকে করতে বলো না। এটা গোটা তোরাহ; যাও এবং শিখে নাও।”[৭৭]
দুর্যোগের বছর ৭০ সাল নাগাদ প্যালেস্তাইনি ইহুদিবাদে ফারিজিরা সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও গুরুত্বপূর্ণ গোত্রে পরিণত হয়; ইতিমধ্যেই ওরা দেখিয়ে দিয়েছিল যে, ঈশ্বরের উপাসনা করার জন্যে মন্দিরের প্রয়োজন নেই ওদের, এই বিখ্যাত গল্পটি যেমন দেখায়:
একবার ব্যাবাই ইয়োহান্নান বেন যাক্কাই জেরুজালেম থেকে আসছিলেন, র্যাবাই জোশুয়া তাকে অনুসরণ করেন এবং মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান।
“আমাদের দুর্দশা!’ বললেন ব্যাবাই জোশুয়া, এই যে, যেখানে ইসরায়েলিদের অসাম্যতার প্রায়শ্চিত হতো, সেটি ধ্বংস হয়ে গেছে।’
‘বস আমার,’ বললেন ব্যাবাই ইয়োহান্নান, ‘দুঃখ করো না। এটার মতোই কার্যকর প্রায়শ্চিত্তের স্থান আমাদের কাছে। এবং সেটা কী? এটা হচ্ছে প্রেমময় দয়ার প্রকাশ, যেমন কথায় আছে: “কারণ আমি ক্ষমা চাই, উৎসর্গ নয়”।[৭৮]
কথিত আছে, জেরুজালেম অধিকারের পর র্যাবাই ইয়োহান্নানকে একটা কফিনে করে জ্বলন্ত নগরী থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ইহুদি বিদ্রোহের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি, রাষ্ট্র ছাড়াই ইহুদিরা ভালো থাকবে বলে ধারণা ছিল তাঁর। রোমানরা ইয়োহান্নানকে জেরুজালেমের পশ্চিমে জবনেহতে স্ব-শাসিত একটা ফারিজিয় সমাজ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছিল। প্যালেস্তাইন ও বাবিলোনিয়ায়ও একই ধরনের সমাজ প্রতিষ্ঠা করা হয় যারা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখত। এই সমাজগুলো তান্নাইম নামে পরিচিত পণ্ডিতদের জন্ম দিয়েছিল, যাদের মধ্যে খোদ র্যাবাই ইয়োহান্নান স্বয়ং, র্যাবাই আকিভা দ্য মিস্টিক এবং র্যাবাই ইশমায়েল অন্তর্ভুক্ত ছিলেন: এঁরা মিশনাহ সংকলিত করেন: কথ্য আইনের লিখিত রূপ, মোজেসের আইনকে যা হালনাগাদ করেছে। এরপর অ্যামোরাইম নামে পরিচিত নতুন আরেক শ্রেণীর পণ্ডিত মিশনার ব্যাখ্যা দান শুরু করেন এবং সম্মিলিতভাবে তালমুদ নাম পরিচিত প্রবন্ধগুচ্ছ রচনা করেন। আসলে দুটো তালমুদ সংকলিত হয়েছিল; চতুর্থ শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমাপ্ত জেরুজালেম তালমুদ এবং অধিকতর প্রভাবশালী হিসাবে বিবেচিত বাবিলোনিয় তালমুদ-এর সংকলন পঞ্চম শতকের শেষের দিকে শেষ হয়। প্রত্যেক প্রজন্মের পণ্ডিতগণ তালমুদ এবং এর ওপর প্রদত্ত পূর্বসুরিদের ব্যাখ্যার ওপর নিজস্ব মতামত দান শুরু করায় এই প্রক্রিয়াটি অব্যাহত রয়ে যায়। বহিরাগতরা যেমনটি ভাবতে চান, এই প্রথাসিদ্ধ ধ্যান উপলব্ধি নিরস বিষয় ছিল না। এটা ছিল ঈশ্বরের বাণী নিয়েই অনন্ত ধ্যান, নতুন পবিত্র মন্দির; পূর্ববর্তী ব্যাখ্যার প্রত্যেকটা এক নতুন মন্দিরের দেয়াল ও দরবারের প্রতীক, আপন জাতির মাঝে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে স্থাপন করছে।
ইয়াহ্ওয়েহ্ বরাবরই এক দুৰ্জ্জেয় উপাস্য ছিলেন, যিনি মহাশূন্য থেকে অদৃশ্য থেকে মানবজাতিকে পরিচালনা করছেন। র্যাবাইগণ তাঁকে মানুষের মাঝে ও জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে গভীরভাবে উপস্থিত করে তোলেন। মন্দির হাতছাড়া ও ফের নির্বাসিত হওয়ার যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞতার পর নিজেদের মাঝে একজন ঈশ্বরের উপস্থিতির প্রয়োজন ছিল ইহুদিদের। র্যাবাইগণ ঈশ্বর সংক্রান্ত কোনও আনুষ্ঠানিক মতবাদ গড়ে তোলেননি। পরিবর্তে প্রায় দৃশ্যমান। সত্তার মতো তাঁকে অনুভব করেছেন। ওঁদের আধ্যাত্মিকতাকে ‘স্বাভাবিক অতিন্দ্রীয়বাদ’[৭৯] হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তালমুদের একেবারে শুরুর দিকের অনুচ্ছেদগুলোয় ঈশ্বরকে রহস্যময় বাস্তব সত্তা হিসাবে অনুভব করা হয়েছে। র্যাবাইগণ পবিত্র আত্মা (Holy Spirit)-র কথা বলেছেন যিনি সৃষ্টি এবং স্যাঙ্কচুয়্যারির নির্মাণ নিয়ে ভাবিত ছিলেন; প্রবল হাওয়া বা প্রচণ্ড অগ্নিশিখায় নিজ উপস্থিতি অনুভব করিয়েছিলেন। অন্যরা ঘণ্টাধ্বনি বা তীক্ষ্ণ করাঘাতের শব্দের মতো শুনতে পেয়েছেন একে। উদাহরণস্বরূপ, র্যাবাই ইয়োহান্নান একদিন ইযেকিয়েলের রথ দর্শনের প্রসঙ্গে আলোচনা করছিলেন, এমন সময় আকাশ থেকে আগুন নেমে এল এবং কাছেই দেবদূতদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল: এক অদৃশ্য কণ্ঠস্বর জানিয়ে দিল যে, ঈশ্বরের কাছ থেকে এক বিশেষ মিশন পেয়েছেন তিনি। [৮০]
