যেমন শোনাচ্ছে, ততটা নিরস নয় ব্যাপারটা: অজানার উদ্দেশে এক আবেগময় আনন্দ যাত্রার বিবরণ দিয়েছেন ফিলো, যা তাঁকে মুক্তি ও সৃজনশীল ক্ষমতা এনে দিয়েছে। প্লেটোর মতো আত্মাকে তিনি ভৌত জগতে নির্বাসিত অবস্থায় থাকার মতো দেখেছেন। একে অবশ্যই আবেগ, অনুভূতি এমনকি ভাষা ত্যাগ করে, এর প্রকৃত আবাস ঈশ্বরের দিকে এগোতে হবে, কারণ এসব আমাদের অপূর্ণ পৃথিবীর সঙ্গে বেঁধে রাখে। শেষ পর্যন্ত এটা এমন এক আনন্দের পর্যায়ে উন্নীত হবে যা একে অহমের আতঙ্কময় সীমাবদ্ধতা থেকে এক বৃহত্তর পূর্ণ সত্তায় তুলে নেবে। আমরা দেখেছি, ঈশ্বর সম্পর্কিত ধারণা প্রায়শঃই কল্পনা-নির্ভর অনুশীলন ছিল। পয়গম্বরগণ নিজ নিজ অভিজ্ঞতা নিয়ে ভেবেছেন, মনে করেছেন একে ঈশ্বর নামে আখ্যায়িত সত্তার প্রতি আরোপ করা যেতে পারে। ফিলো দেখাচ্ছেন: ধর্মীয় ভাবনা অনেকাংশে সৃজনশীলতার অন্যান্য রূপের মতোই। কখনও কখনও, বলেছেন তিনি, নিজের গ্রন্থসমূহ নিয়ে বিষণ্ণ মনে সংগ্রাম করে কোনও পথ খুঁজে পাননি, আবার কখনও মনে হয়েছে তার ওপর স্বর্গীয় প্রভাব ক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছে:
আমি…সহসা পরিপূর্ণ হয়ে উঠলাম, ধারণাগুলো তুষারপাতের মতো নেমে আসছে, যার ফলে স্বর্গীয় প্রভাবে আমি করিব্যান্টিক (Corybrantic) উন্মাদনায় ভরে উঠলাম এবং স্থান-কাল-পাত্র, বর্তমান, নিজেকে কী বলা হয়েছে, কী লেখা হয়েছে, সবকিছু সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ হয়ে গেলাম। কেননা আমি অভিব্যক্তি, ধারণা, জীবনের এক আনন্দ, বস্তুর স্পষ্ট স্বচ্ছতা অতিক্রম করে যাওয়া তীক্ষ্ণ দর্শন, যা সবচেয়ে স্পষ্ট উপস্থাপনের ফলে চোখের সামনে উপস্থিত হতে পারে, তা অর্জন করলাম।[৭৬]
অচিরেই গ্রিক জগতের সঙ্গে এমন একটা সমন্বয় অর্জন দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। ফিলোর মৃত্যুর বছর আলেকজান্দ্রিয়ার ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হত্যালীলা পরিচালিত হয় এবং ইহুদিদের বিদ্রোহের ব্যাপক আশঙ্কার সৃষ্টি হয়। বিসিই প্রথম শতকে রোমানরা যখন উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল তখন তারা নিজেরাই গ্রিক সংস্কৃতির কাছে পরাস্ত হয়ে পুর্বসূরিদের উপাস্যদের গ্রিক দেবনিচয়ের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে এবং অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে গ্রিক দর্শনকে আপন করে নেয়। তারা অবশ্য ইহুদিদের প্রতি গ্রিকদের বৈরিতার উত্তরাধিকার লাভ করেনি। প্রকৃতপক্ষে, গ্রিকদের চেয়ে ইহুদিদেরই বেশি পছন্দ করত তারা, গ্রিক নগরসমূহে ওদের প্রয়োজনীয় মিত্র হিসাবে বিবেচনা করত যেখানে রোমের প্রতি বৈরিতার ক্ষীণ অস্তিত্ব ছিল । ইহুদিদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল: ওদের ধর্ষ সুপ্রাচীন ঐতিহ্য হিসাবে পরিচিত ছিল, একে সম্মান জানানো হয়েছে। ইহুদি ও রোমানদের ভেতর সম্পর্ক এমনকি প্যালেস্তাইনেও চমৎকার ছিল, যেখানে বিদেশী শাসন সহজে মেনে নেওয়া হতো না। বিসিই প্রথম শতাব্দী নাগাদ রোমান সাম্রাজ্যে ইহুদিবাদ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। গোটা সাম্রাজ্যের এক দশমাংশ ছিল ইহুদি: ফিলোর আলেকজান্দ্রিয়ায় জনসংখ্যার চল্লিশ শতাংশ ছিল ইহুদি। রোমান সাম্রাজ্যের জনগণ এক নতুন ধর্মীয় সমাধানের অনুসন্ধানে ছিল: একেশ্বরবাদী ধ্যান-ধারণাসমূহ প্রচারণা পাচ্ছিল, স্থানীয় দেবতাদের আরও বৃহৎ, সর্বব্যাপী এক ঐশ্বরিক সত্তার প্রকাশ হিসাবে দেখা হচ্ছিল। রোমানরা ইহুদিবাদের উন্নত নৈতিক চরিত্রে আকৃষ্ট হয়েছে। বোধগম্য কারণে যারা হত্যা করা ও গোটা তোরাহ্ অনুসরণ করার বেলায় অনিচ্ছুক ছিল তারা প্রায়শঃই ‘গডফিয়ারার’ (Godfearer) নামে পরিচিত সিনাগগের সম্মান সূচক সদস্যপদ গ্রহণ করত, ওদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান ছিল। এমনকি এমনও মত প্রকাশ করা হয়েছে যে ফ্ল্যাভিয় সম্রাটদের একজন সম্ভবত ইহুদিবাদে দীক্ষিত হয়েছিলেন, যেমন কতস্তাইন পরে ক্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করবেন। অবশ্য, প্যালেস্তাইনে রাজনৈতিক উগ্রপন্থীদের একটা দল তীব্রভাবে রোমান শাসনের বিরোধিতা করে। সিই ৬৬ সালে তারা রোমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং অবিশ্বাস্যভাবে রোমান সেনাবাহিনীকে চার বছর ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। বিদ্রোহ ডায়াসপোরার ইহুদিদের মাঝে ছড়িয়ে যাবার আশঙ্কা করে কর্তৃপক্ষ, ফলে নিষ্ঠুরভাবে তা দমন করে। সিই ৭০ সালে নতুন সম্রাট ভেসপাসিয়ান-এর সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত জেরুজালেম অধিকার করে, মন্দির পুড়িয়ে ধূলিসাৎ করে নগরীটিকে রোমান নগরে রূপান্তরিত করে এর নাম রাখে আইলিয়া কাপিলানা। আরও একবার দেশান্তরী হতে বাধ্য হয় ইহুদিরা।
নয়া ইহুদিবাদের মূল প্রেরণা মন্দির ধ্বংস বিরাট দুঃখের কারণ ছিল; কিন্তু পরবর্তী ঘটনার প্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে মনে হয় ডায়াসপোরার হেলেনাইজড ইহুদিদের তুলনায় প্রায়শঃ অনেক বেশি রক্ষণশীল প্যালেস্তাইনের ইহুদিরা, সম্ভবত আগে থেকেই এই বিপর্যয়ের জন্যে তৈরি ছিল। পবিত্র ভূমিতে অসংখ্য গোত্র মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল যারা বিভিন্নভাবে জেরুজালেম মন্দির থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিল । এসিন ও কুমরান গোষ্ঠীর বিশ্বাস ছিল যে মন্দির অর্থলিলু ও দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়েছে; আলাদা কমিউনিটিতে বাস শুরু করেছিল তারা, মৃত সাগর তীরবর্তী মঠ ধরনের কমিউনিটির মতো একটা নতুন মন্দির গড়ে তুলছে বলে বিশ্বাস ছিল তাদের, যা হাতে নির্মিত নয়। ওদের মন্দির হবে আত্মার; প্রাচীন রীতি অনুযায়ী পশু উৎসর্গ করার বদলে নিজেদের পরিশুদ্ধ করত তারা এবং দীক্ষাগ্রহণমূলক অনুষ্ঠান ও দলীয় ভোজের মাধ্যমে পাপের ক্ষমা প্রার্থনা করত। পাথরের মন্দিরে নয়, ঈশ্বরের আবাস হবে প্রেমময় ভ্রাতৃসংঘে।
