দ্য উইজডম অভ সলোমন-এর রচয়িতা গ্রিক চিন্তা-ভাবনা ও ইহুদি ধর্মের মধ্যকার টানাপোড়েন ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। আমরা দেখেছি, অ্যারিস্টটলের সৃষ্ট জগৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ নির্বিকার ঈশ্বর ও বাইবেলের মানবীয় ব্যাপারে তীব্রভাবে জড়িত ঈশ্বরের মাঝে এক জটিল এবং সম্ভবত সমন্বয়ের অতীত পার্থক্য রয়েছে। গ্রিক ঈশ্বরকে মানুষের যুক্তির মাধ্যমে আবিষ্কার করা সম্ভব ছিল, কিন্তু বাইবেলের ঈশ্বর কেবল প্রত্যাদেশের মাধ্যমেই নিজেকে প্রকাশ করেন। এক অতল গহ্বর ইয়াহ্ওয়েহ্কে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল, কিন্তু গ্রিকরা বিশ্বাস করত যে, যুক্তির ক্ষমতা মানুষকে ঈশ্বরের নিকটবর্তী করে; সুতরাং আপন প্রচেষ্টা দিয়েই তারা তার কাছে পৌঁছুতে পারবে। তা সত্ত্বেও যখনই একেশ্বরবাদীরা গ্রিক দর্শনের প্রেমে পড়েছে অনিবার্যভবে তারা তাদের ঈশ্বরকে নিজেদের ঈশ্বরের সঙ্গে মেলানোর প্রয়াস পেয়েছে। এটা আমাদের কাহিনীর একটা প্রধান থিম হয়ে দাঁড়াবে। প্রথম যাঁরা এই প্রয়াস পেয়েছিলেন তাঁদের প্রথম জন হচ্ছেন প্রখ্যাত ইহুদি দার্শনিক ফিলো অভ আলেকজান্দ্রিয়া (৩০ বিসিই-৪৫ সিই)। ফিলো ছিলেন প্লেটোনিস্ট; আপন মেধা ও জ্ঞানে যুক্তিবাদী দার্শনিক হিসাবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। চমৎকার গ্রিক ভাষায় লিখতেন তিনি। সম্ভবত হিব্রু ভাষায় কথা বলতেন না, তবু ধর্মপ্রাণ ইহুদি ও মিতভোতের অনুসারী ছিলেন। নিজ ঈশ্বর ও গ্রিক ঈশ্বরের মাঝে বেমানান কিছু দেখেননি তিনি। তবে অবশ্যই একথা বলা প্রয়োজন যে, ফিলোর ঈশ্বরকে ইয়াহ্ওয়েহ্ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে হয়। যেমন, ফিলো যেন বাইবেলের ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোর ব্যাপারে বিব্রত ছিলেন, এগুলোকে তিনি বিস্তারিত রূপক বর্ণনায় পরিণত করার প্রয়াস। পেয়েছিলেন। স্মরণযোগ্য, অ্যারিস্টটল ইতিহাসকে অদার্শনিকসুলভ বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর ঈশ্বরের কোনও মানবীয় গুণ নেই: যেমন, তিনি ক্রুদ্ধ’ হয়েছেন বলাটা খুবই ভুল হবে। আমরা ঈশ্বর সম্পর্কে যেটুকু জানতে পারি সেটা হলো তার অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা মাত্র। তবু ধার্মিক ইহুদি হিসাবে ফিলো বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর পয়গম্বরদের সামনে নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন। কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছিল?
সম্পূর্ণ উপলব্ধির অতীত ঈশ্বরের মূল সত্তা (আউসিয়া) এবং পৃথিবীতে তার কর্মকাণ্ডকে ফিলো তার ক্ষমতা (dynameis) বা শক্তি’ (energeia) বলেছেন, এ দুটোর মাঝে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টেনে এ সমস্যার সমাধান করেছিলেন তিনি। মূলত এটা ‘P’ এবং প্রজ্ঞা-রচয়িতাদের সমাধানের অনুরূপ। ছিল। ঈশ্বর স্বয়ং কেমন কোনওদিনই আমরা তা জানতে পারব না। ফিলো তাঁকে দিয়ে মোজেসকে বুলিয়েছেন: আমাকে বুঝতে পারাটা মানুষের প্রকৃতি, এমনকি গোটা আকাশ এবং মহাবিশ্বের সাধের অতীত। আমাদের সীমিত উপলব্ধিতে নিজেকে অভিযোজিত করার জন্যে ঈশ্বর তার ক্ষমতার মাধ্যমে যোগাযোগ করেন যার সঙ্গে প্লেটোর স্বর্গীয় আকারের মিল আছে বলে মনে হয় (যদিও ফিলো সব সময় এ ব্যাপারে স্থির নন)। এগুলো মানুষের বোধগম্য উচস্তরের বাস্তবতা। এগুলো ঈশ্বরের কাছ থেকে উৎসারিত বলে মনে করেছেন ফিলো, যেমন প্লেটো ও অ্যারিস্টটল আদি কারণ হতে মহাবিশ্বকে উৎসারিত হতে দেখেছিলেন। এসব ক্ষমতার দুটি বিশেষভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিলো এদের নাম দিয়েছেন রাজকীয় ক্ষমতা (Kingly Power), যা মহাবিশ্বের শৃঙ্খলার মাঝে ঈশ্বরের প্রকাশ ঘটায়; এবং সৃজনী ক্ষমতা, যার মাধ্যমে ঈশ্বর মানুষের ওপর বর্ষিত আশীর্বাদের মাঝে নিজেকে প্রকাশ করেন। এসব ক্ষমতার কোনওটাকে স্বর্গীয় সত্তার আউসিয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা চলবে না-যেটা দুর্ভেদ্য রহস্যের আড়ালে ঢাকা থাকে। এগুলো কেবল আমাদের বোধের অতীত এক সত্তার কিঞ্চিৎ আভাস পেতে সাহায্য করে। মাঝে মাঝে ফিলো ঈশ্বরের অপরিহার্য সত্তাকে (আউসিয়া) রাজকীয় ও সৃজনী ক্ষমতায় পরিবেষ্টিত থাকার কথা বলেছেন, অনেকটা ট্রিনিটর মতো। উদাহরণ স্বরূপ, তিনি মামরিতে দুজন দেবদূতসহ ইয়াহ্ওয়েহ্র অ্যাব্রাহামের কাছে হাজির হওয়ার কাহিনীর ব্যাখ্যা করার সময় যুক্তি দেখান: ঈশ্বরের আউসিয়ার রূপক উপস্থাপন দুই উচ্চতম ক্ষমতাসহ তিনি স্বয়ং।[৭৪]
‘J’ হয়তো এ ধারণায় হতবুদ্ধি হয়ে পড়তেন। প্রকৃতপক্ষেই, ইহুদিরা ঈশ্বর সম্পর্কে ফিলোর ধারণাকে অনেকটা অসত্য হিসাবে দেখেছে। ক্রিশ্চানরা। অবশ্য তাকে দারুণ রকম উপকারী হিসাবে দেখবে এবং আমরা দেখব, গ্রিকরা ঈশ্বরের দুয়ে ‘সত্তা’ (essence) এবং যে শক্তি’ (energies) তাঁকে আমাদের কাছে প্রকাশ করে, এ দুটোর পার্থক্য লুফে নিয়েছিল। তারা তাঁর স্বর্গীয় লোগোসের তত্ত্বেও প্রভাবিত হবে। প্রজ্ঞা-রচয়িতদের মতো ফিলো কল্পনা করেছেন যে ঈশ্বর সৃষ্টির একটা মহাপরিকল্পনা (লোগোস) প্রণয়ন করেছিলেন; যার সঙ্গে প্লেটোর আকৃতির জগতের মিল রয়েছে। এইসব আকৃতি এরপর ভৌত বিশ্বে স্থাপন করা হয়। ফিলো কিন্তু সবসময় অটল ছিলেন না। কখনও তিনি বলেছেন, লোপোস অন্যতম একটা শক্তি, অন্য সময় মনে হয়েছে তিনি একে শক্তির চেয়েও বড় কিছু মানুষের পক্ষে অর্জনযোগ্য ঈশ্বর সম্পর্কিত সর্বোচ্চ ধারণা মনে করছেন। অবশ্য, আমরা যখন লোগোসের কথা ভাবি তখন ঈশ্বর সম্পর্কে কোনও ইতিবাচক জ্ঞান পাই নাঃ আমাদেরকে বাস্তব যুক্তির নাগালের বাইরে এক অনুভবভিত্তিক উপলব্ধির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় যা ‘চিন্তার উপায়ের চেয়ে উন্নত কিছু চিন্তা করা যেতে পারে এমন যেকোনো কিছুর চেয়ে মূল্যবান।’[৭৫] এটা প্লেটোর ধ্যান (থিয়োরিয়া-র মতো কিছু, একই ধরনের একটা ব্যাপার। ফিলো জোর দিয়ে বলেছেন, আমরা কখনওই ঈশ্বরের প্রকৃত সত্তার কাছাকাছি যেতে পারব নাঃ ঈশ্বর মানব মনকে যে পরমানন্দ স্বীকৃতিতে ছাপিয়ে যান তার মাঝেই সর্বোচ্চ সত্য অনুধাবন করতে পারি আমরা।
