অবশ্য অধিকাংশ ইহুদি দূরত্ব বজায় রাখে। মধ্যপ্রাচ্যের হেলেনিস্টিক নগরসমূহে ইহুদি ও গ্রিকদের মাঝে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছিল। প্রাচীন বিশ্বে ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয় ছিল না। নগরীসমূহে দেবতারা দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। মনে করা হতো যে তাঁদের কাল্টের প্রতি অবহেলা করা হলে তাঁরা পৃষ্ঠপোষকতা তুলে নেবেন। যেসব ইহুদি এইসব দেবতার অস্তিত্ব অস্বীকার করত তাদের নাস্তিক ও সমাজের শত্রু আখ্যা দেওয়া হয়। বিসিই দ্বিতীয় শতাব্দী নাগাদ এই বৈরিতা আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে: প্যালেস্তাইনে যখন সেলুসিদ গভর্নর অ্যান্তিওকাস এপিফেন্স জেরুজালেমকে হেলেনাইজ করে মন্দিরে যিউসের কাল্ট চালু করার প্রয়াস পেয়েছিলেন তখন এমনকি একটা বিদ্রোহেরও সৃষ্টি হয়েছিল। ইহুদিরা নিজস্ব সাহিত্য গড়ে তুলতে শুরু করেছিল যেখানে যুক্তি দেখানো হয় যে, প্রজ্ঞা গ্রিক চাতুর্য নয় বরং ইয়াহ্ওয়েহ্ ভীতি। মধ্যপ্রাচ্যে প্রজ্ঞা-সাহিত্য ছিল এক সুপ্রতিষ্ঠিত ধারা, দার্শনিক বিচার বিবেচনা নিয়ে নয় বরং বেঁচে থাকার সর্বোত্তম উপায় অনুসন্ধানের মাধ্যমে জীবনের অর্থ খুঁজে পাবার প্রয়াস পেয়েছে এটা: প্রায়শঃ অনেক বাস্তবভিত্তিক হতে দেখা গেছে এটাকে। বিসিই তৃতীয় শতাব্দীতে বুক অভ প্রোভার্বস-এর রচয়িতা আরেকটু অগ্রসর হয়ে মত প্রকাশ করেছেন যে, প্রজ্ঞা হচ্ছে বিশ্ব সৃষ্টির সময় ঈশ্বরের মহাপরিকল্পনা অর্থাৎ এটাই ছিল তার প্রথম সৃষ্টি। চতুর্থ অধ্যায়ে আমরা যেমন দেখব, এই বিশ্বাসটি আদি ক্রিস্টানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রজ্ঞাকে ব্যক্তিক রূপ দিয়েছেন রচয়িতা যেন একে আলাদা সত্তা মনে হয়:
ইয়াহ্ওয়েহ্ নিজ পথের আরম্ভে আমাকে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন,
তাহার কর্ম সকলের পূর্বে, পূৰ্বাবধি।
আমি স্থাপিত হইয়াছি অনাদি কালাবধি,
আদি অবধি, পৃথিবীর উদ্ভবের পূৰ্বাবধি।
তৎকালে আমি তাহার কাছে কাৰ্য্যকরী ছিলাম;
আমি দিন দিন আনন্দময় * ছিলাম,
তাহার সম্মুখে নিত্য আহ্লাদ করিতাম;
আমি তাহার তুমণ্ডলে আহ্লাদ করিতাম,
মনুষ্য সন্তানগণে আমার আনন্দ হইত।[৭০]
[* (বা) ইয়াহ্য়ে আপন পথের আদিস্বরূপ আমাকে গঠন করিয়াছিলেন।
* (বা) তাঁহারা আনন্দজনক।]
অবশ্য প্রজ্ঞা স্বর্গীয় সত্তা ও ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট বলে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা প্রিস্টলি রচয়িতাদের বর্ণিত ঈশ্বরের প্রতাপে’র মতো, যা মানব জাতি সৃষ্টি ও মানুষের জীবনে অনুভব করতে পারে ঈশ্বরের সেই পরিকল্পনার কথা বোঝায়: রচয়িতা প্রজ্ঞাকে (হোখমাহ) পথে পথে ঘুরে মানুষকে ইয়াহ্ওয়েহ্কে ভয় করার আহ্বান জানাচ্ছেন বলে দেখিয়েছেন। বিসিই দ্বিতীয় শতাব্দীতে জেরুজালেমের একজন ধর্মভীরু ইহুদি জেসাস বেন সিরা প্রজ্ঞার একই রকম চিত্র এঁকেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন, স্বর্গীয় সভায় দাঁড়িয়ে প্রজ্ঞা নিজ গুণ গাইছেন: তার আগমন ঘটেছে স্বর্গীয় বাণী হিসাবে পরম প্রভুর (Most High) মুখ হতে যা দিয়ে ঈশ্বর বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন; সৃষ্টির সর্বত্র তার উপস্থিতি রয়েছে কিন্তু ইসরায়েলের জনগণের মাঝে আপন আবাস বেছে নিয়েছেন তিনি।[৭১]
ইয়াহ্ওয়েহ্র প্রতাপে’র মতো প্রজ্ঞার চরিত্রটি পৃথিবীতে ঈশ্বরের কর্মকাণ্ডের একটা প্রতীক। ইহুদিরা ইয়াহ্ওয়েহ্র এমন এক উঁচু ধারণার বিকাশ ঘটাচ্ছিল যে মানব জীবনে তার সরাসরি হস্তক্ষেপের কল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ‘P’-এর মতো তারা ঈশ্বরকে আমাদের জ্ঞান ও স্বর্গীয় সত্তার অভিজ্ঞতার মাঝে পার্থক্য টানার পক্ষপাতি ছিল। আমরা যখন মানুষের খোঁজে ঈশ্বরকে ছেড়ে প্রজ্ঞার গোটা বিশ্ব ঘুরে বেড়ানোর কথা পড়ি তখন খুব সহজেই ইশতার, আনা ও আইসিসের মতো পৌত্তলিক দেবীদের কথা মনে পড়ে যায় যাঁরা নিষ্কৃতির দায়িত্ব নিয়ে স্বর্গীয় জগৎ হতে অবতরণ করেছিলেন। বিসিই ৫০ সালের দিকে প্রজ্ঞা-সাহিত্য আলেকজান্দ্রিয়ায় ধর্মীয় যুক্তির রূপ লাভ করেছিল। আলেকজান্দ্রিয়ার এক ইহুদি দ্য উইজডম অভ সলোমন-এ ইহুদিদের চারপাশের আগ্রাসী হেলেনিক সংস্কৃতিকে প্রতিহত করে আপন ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এখানে ইহুদিদের গুরুত্বপূর্ণ বসতি ছিল-গ্রিক দর্শন নয় বরং ইয়াহ্ওয়েহ্ ভীতিই প্রকৃত প্রজ্ঞা গড়ে তুলেছে। গ্রিক ভাষায় লিখেছেন তিনি; প্রজ্ঞাকে (সোফিয়া) ব্যক্তিরূপ দিয়েছেন ও যুক্তি উত্থাপন করেছেন যে একে ইহুদি ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়:
[সোফিয়া] ঈশ্বরের ক্ষমতার প্রশ্বাস,
সর্বশক্তিমানের প্রতাপের নিখাদ উৎসারণ;
সুতরাং অপবিত্র কোনও কিছুই তাহার মাঝে প্রবেশাধিকার পাইবে না।
তিনি অনন্ত আলোকের প্রতিফলন,
ঈশ্বরের সক্রিয় ক্ষমতার ঝলমলে শশী,
তাহার মহত্বের ভাবমূর্তি। [৭২]
এই অনুচ্ছেদটি জেসাসের মর্যাদা সংক্রান্ত আলোচনার ক্ষেত্রে ক্রিশ্চানদের কাছেও দারুণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইহুদি রচয়িতা অবশ্য সোফিয়াকে কেবল দুয়ে ঈশ্বরের এক বৈশিষ্ট্য হিসাবে দেখেছেন, যিনি নিজেকে মানবীয় উপলব্ধির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। তিনি হচ্ছেন ঈশ্বর-যেভাবে-আপনাকে মানুষের-কাছে-প্রকাশ করেছেন, ঈশ্বর সম্পর্কিত মানবীয় উপলব্ধি, ঈশ্বরের প্রকৃত সত্তার চেয়ে রহস্যজনকভাবে আলাদা; যিনি সব সময় আমাদের উপলব্ধিকে এড়িয়ে যাবেন।
