পেন্টাটিউকে ‘P’-র সবচেয়ে বিখ্যাত অবদান অবশ্যই জেনেসিসের প্রথম অধ্যায়ে সৃষ্টি সংক্রান্ত বিবরণ, যা এনুমা এলিশের অনুসরণ। আদিম গহ্ববের (tehom, tiamat-এর অপভ্রংশ) পানি দিয়ে শুরু করেছেন ‘P’, যেখান থেকে স্বর্গ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন ইয়াহ্ওয়েহ্। তবে দেবতাদের যুদ্ধের কোনও উল্লেখ নেই, উল্লেখ নেই ইয়াম, লোতান বা রাহাবের বিরুদ্ধে লড়াইয়েরও। ইয়াহ্ওয়েহ্ একাই সবকিছুর অস্তিত্ব দান করার দাবিদার। বস্তু ক্রম-উৎসারিত হয়নি, বরং ইয়াহ্ওয়েহ্ স্রেফ অনায়াস ইচ্ছা দিয়েই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্বভাবতই পৃথিবীকে ইয়াহ্ওয়েহ্ উপাদান বিশিষ্ট স্বর্গীয় ভাবতে যাননি ‘P’। প্রকৃতপক্ষে ‘P’-র ধর্মতত্ত্বে ‘পৃথকীকরণ’ (Separation) খুবই গুরুত্বপূর্ণ: রাত্রি হতে দিন, পানি হতে জমিন এবং অন্ধকার হতে আলোকে পৃথক করার ভেতর দিয়ে ঈশ্বর মহাবিশ্বকে এক সুশৃঙ্খল রূপ দিয়েছেন। প্রত্যেক পর্যায়ে ইয়াহ্ওয়েহ্ সৃষ্টিকে আশীর্বাদ ও পবিত্র করেছেন এবং ভালো’ আখ্যা দিয়েছেন। বাবিলনিয়দের কাহিনীর বিপরীতে মানব সৃষ্টি হচ্ছে সৃষ্টির ক্লাইমেক্স, হাস্যকর পশ্চাদচিন্তা নয়। নারী এবং পুরুষ স্বর্গীয় প্রকৃতির অংশীদার না হতে পারে, কিন্তু ঈশ্বরের অনুরূপ আকৃতিতে সৃষ্টি করা হয়েছে তাদের তাদের অবশ্যই তার সৃজনশীল কর্মধারাকে এগিয়ে নিতে হবে। এনুমা এলিশে যেমন রয়েছে, ছয়দিনব্যাপী সৃষ্টি কর্মের পর সপ্তম দিনে সাবাথের মতো বিশ্রামের কথা রয়েছে: বাবিলনিয় বর্ণনায় এই দিনে মহাসভা ‘নিয়তি নির্ধারণ ও মারদুককে স্বর্গীয় উপাধি দান করার জন্যে মিলিত হয়েছিল। ‘P’-র বর্ণনায় প্রথম দিনে বিরাজিত আদিম বিশৃঙ্খলার প্রতীকী বিপরীত অবস্থান পেয়েছে সাবাথ। শিক্ষামূলক সুর ও পুনরাবৃত্তি বোঝায়, ‘P’-র সৃষ্টি-কাহিনী এনুমা এলিশের মতো আচরিক আবৃত্তির উদ্দেশে রচিত হয়েছিল; ইয়াহ্ওয়েহ্র কাজের প্রশংসা এবং ইসরায়েলের স্রষ্টা ও শাসক হিসাবে তাকে অভিষিক্ত করার জন্য।
স্বভাবতই ‘P’-র ইহুদিবাদে নতুন মন্দির ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। নিকট প্রাচ্যে মন্দিরকে প্রায়শঃই মহাবিশ্বের অনুকৃতি হিসাবে কল্পনা করা হয়েছে। মন্দির নির্মাণ ছিল এমন এক কর্মকাণ্ড যা মানুষকে খোদ দেবতাদের সৃজনশীলতায় যোগ দিতে সক্ষম করে তোলে। নির্বাসনকালে বহু ইসরায়েলি চুক্তির আর্ক-এর পুরোনো কাহিনীসমূহে সান্ত্বনা খুঁজে পেত; আর্ক একটা বহনযোগ্য মন্দির যেখানে ঈশ্বর তার জাতির সঙ্গে তাঁবু খাঁটিয়েছেন’ (Shaken), তাদের গৃহহীন অবস্থার অংশীদার হয়েছেন। স্যাঙ্কচুয়্যারি নির্মাণ, বিরান এলাকায় ভল্ট অভ মিটিং বর্ণনা করার সময় প্রাচীন পুরাণের আশ্রয় নিয়েছেন ‘P’। এর স্থাপত্য নকশা নতুন নয় বরং স্বর্গীয় মডেলেরই অনুকরণ: সিনাই পর্বতে মোজেসকে ইয়াহ্ওয়েহ্ অত্যন্ত দীর্ঘ ও বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছিলেন: ‘তাহারা আমার নিমিত্তে এক ধৰ্মধাম নির্মাণ করুক, তাহাতে আমি তাহাদের মধ্যে বাস করিব। আবাসের ও তাহার সকল দ্রব্যের বা আদর্শ আমি তোমাকে দেখাই, তদনুসারে তোমরা সকলই করিবে।[৬৫] স্যাঙ্কচুয়্যারি নির্মাণের দীর্ঘ বিবরণী আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করার কথা বলা হয়নি; এটা কেউ কল্পনা করেনি যে প্রাচীন ইসরায়েলিরা সত্যি সত্যি স্বর্ণ, রৌপ্য, পিত্তল; এবং নীল, বেগুনি ও লাল, এবং শাদা মসিনা সূত্র ও ছাগলোম ও রজীকৃত মেষচৰ্ম্ম ও শিটী কাষ্ঠ ইত্যাদি দিয়ে এমন একটা বিশাল উপাসনাগৃহ নির্মাণ করেছিল।[৬৬] এই দীর্ঘ প্রক্ষেপন আসলে ‘P-র সৃষ্টি-কাহিনীর স্মারক। নির্মাণের প্রত্যেক পর্যায়ে মোজেস সকল কাজ দেখেছেন এবং সৃষ্টির দিনের ইয়াহ্ওয়েহ্র মতো মানুষকে আশীর্বাদ করেছেন। বছরের প্রথম মাসের প্রথম দিনে স্যাঙ্কচুয়্যারি নির্মিত হয়েছিল; উপাসনালয়ের স্থপতি বেয়ালেল ঈশ্বরের চেতনা (ruachelohim) দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন যা বিশ্বসৃষ্টি নিয়ে গভীর চিন্তাধারা ছিল, এবং উভয় বিবরণীই সাবাথ বিশ্রামের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে।[৬৭] মন্দির নির্মাণ আদি সাম্যেরও একটা প্রতীক যা মানবজাতি পৃথিবী ধ্বংস করার আগে বিরাজমান ছিল।
ডিউটেরোনমিতে দাসসহ প্রত্যেককে একদিন বিশ্রাম দান ও ইসরায়েলিদের এক্সোডাসের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য সাবাথের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।[৬৮] সাবাথকে এক নতুন তাৎপর্য দান করেছেন ‘P’। ঈশ্বরকে অনুসরণ করার ও বিশ্ব সৃষ্টির স্মরণের উপলক্ষ্যে পরিণত হয়েছে এটা। সাবাথ বিশ্রাম গ্রহণের সময় ইহুদিরা এমন এক কর্মকাণ্ডে অংশ নিত যা আদিতে ঈশ্বর একাই পালন করেছিলেন: স্বর্গীয় জীবন যাপনের একটা প্রতীকী প্রয়াস এটা ছিল। প্রাচীন পৌত্তলিকতাবাদে মানবীয় প্রতিটি আচরণ দেবতাদের কর্মকাণ্ডের অনুকরণ ছিল, কিন্তু ইয়াহ্ওয়েহ্র কাল্ট স্বর্গীয় ও মানব জগতের মাঝখানে এক বিশাল দূরত্ব তুলে ধরেছিল। এবার মমাজেসের ভোরাহ্ অনুকরণের মাধ্যমে ইহুদিরা ইয়াহ্ওয়েহ্র আরও কাছাকাছি যাবার প্রেরণা পেল। ডিউটেরোনমিতে বেশ কিছু অবশ্য পালনীয় আইনের উল্লেখ করা হয়েছে, টেন কমান্ডমেন্টস যার অন্তর্ভুক্ত ছিল। নির্বাসন ও এর অব্যবহিত পরবর্তী সময়ে পেন্টাটিউকে একে বিস্তৃত করে ৬১৩টি নির্দেশ (mitzvot) সম্বলিত জটিল বিধিবিধানে পরিণত করা হয়। সূক্ষ্ম এই নির্দেশনাগুলো বহিরাগত কারও চোখে অপ্রাসঙ্গিক ঠেকে; নিউ টেস্টামেন্টের যুক্তিতর্কে তা খুব নেতিবাচক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ক্রিশ্চানরা যেমনটি ভাবতে চায়, ইহুদিরা সেরকম অসহনীয় ভার মনে করেনি এগুলোকে, বরং তারা একে ঈশ্বরের সকাশে বেঁচে থাকার প্রতীকী উপায় হিসাবে দেখেছে। ডিউটেরোনমিতে আহার সংক্রান্ত বিধিবিধান ইসরায়েলের বিশেষ মর্যাদার নিদর্শন ছিল।[৬৯] এগুলোকে ঈশ্বরের পবিত্র ভিন্নতার আচরিক প্রয়াস হিসাবেও দেখেছে তারা, মানুষ ও স্বর্গের মধ্যকার বেদনাদায়ক বিচ্ছিন্নতাকে যা দূর করে দিয়েছে। ইসরায়েলিরা যখন মধুঁকে মাংস হতে, অপরিচ্ছন্ন থেকে পরিচ্ছন্নকে ও গোটা সপ্তাহ থেকে সাবাথকে আলাদা করে তখন তারা ঈশ্বরের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড অনুকরণের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ হতে পারে।
