সুতরাং, ইয়াহ্ওয়েহ্ পরিণত হয়েছিলেন এক এবং অদ্বিতীয় ঈশ্বরে। দার্শনিক দিক দিয়ে তাঁর দাবির যৌক্তিকতা বিচারের কোনও প্রয়াস ছিল না। বরাবরের মতো নতুন মতাদর্শ যৌক্তিকভাবে তুলে ধরা সম্ভব বলে নয় বরং তা হতাশা রোধ ও আশা সঞ্চারে কার্যকর বলেই সফল হয়েছিল। ইহুদিরা স্থানচ্যুত ও বিতাড়িত অবস্থায় থাকায় ইয়াহ্ওয়েহ্র বিচ্ছিন্নতাবাদী কাল্টকে আর দূরবর্তী, অস্বস্তিকর ভাবতে পারেনি। এটা বরং প্রবলভাবে ওদের অবস্থা তুলে ধরেছে।
কিন্তু দ্বিতীয় ইসায়াহ্র ঈশ্বরের ইমেজে আরামপ্রদ কিছুই ছিল না। তিনি মানব মনের ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছেন
কারণ ইয়াহ্ওয়েহ্ কহেন, আমার সংকল্প সকল ও
তোমাদের সংকল্প সকল এক নয়,
এবং তোমাদের পথ সকল ও আমার পথ সকল এক নয়।
কারণ ভূতল হইতে আকাশ মণ্ডল যত উচ্চ,
তোমাদের পথ হইতে আমার পথও
তোমাদের সংকল্প হইতে আমার সংকল্প তত উচ্চ।[৫৮]
ঈশ্বরের রূপ ভাষা ও ধারণার আওতার অতীত। মানুষ যা আশা করে। ইয়াহ্ওয়েহ্ সবসময় সেটা করেনও না। অত্যন্ত দুঃসাহসী এক অনুচ্ছেদে, আজকের দিনে যেটাকে বেশ কটু মনে হয়, পয়গম্বর আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, এমন এক সময় আসবে যখন মিশর ও আসিরিয়াও ইসরায়েলের পাশে ইয়াহ্ওয়েহ্র জাতিতে রূপান্তরিত হবে। ইয়াহ্ওয়েহ্ বলবেন: ‘আমার প্রজা মিসর আমার হস্তকৃত অশূর ও অধিকার ইস্রায়েল আশীর্ব্বাদ যুক্ত হউক।”[৫৯] দুয়ে সত্তার প্রতাঁকে পরিণত হয়েছিলেন তিনি যার ফলে নির্বাচনের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা তুচ্ছ ও অপর্যাপ্ত মনে হয়েছে।
বিসিই ৫৩৯ সালে পারসিয়ার রাজা সাইরাস বাবিলনিয় সাম্রাজ্য অধিকার করার পর পয়গম্বরদের বিরুদ্ধে বুঝি বদলা নেওয়া হয়েছে মনে হয়েছে। সাইরাস তার নতুন প্রজারে ওপর পারসিয় দেবতাদের চাপিয়ে দেননি, তবে বিজয়ীর বেশে বাবিলনে প্রবেশ করার পর মারদুকের মন্দিরে উপাসনা করেছেন। বাবিলনিয়দের কাছে পরাস্ত জাতির দেবতাদের প্রতিমাও তাদের আদি গৃহে পুনঃস্থাপন করেন তিনি। বিশ্ব বিশালাকৃতির আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যের অধীনে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়ায় দেশান্তরীকরণের পুরোনো পদ্ধতি প্রয়োগ প্রয়োজন মনে করেননি। প্রজারা তাদের নিজস্ব এলাকায় নিজস্ব দেবতাদের উপাসনা করলে শাসন করার বিষয়টি অনেক সহজ হয়ে যায়। গোটা সাম্রাজ্য জুড়ে প্রাচীন মন্দিরসমূহের পুনঃস্থাপন উৎসাহিত করেছেন তিনি, বারবার দাবি করেছেন, তাদের দেবতাই তাঁর ওপর এই দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। তিনি ছিলেন পৌত্তলিক ধর্মের কোনও কোনও রূপের অন্তর্দৃষ্টির সহনশীলতা ও উদারতার উদাহরণ। ৫৩৮ সালে ইহুদিদের জুদাহয় ফিরে তাদের মন্দির পুনর্নির্মাণের অনুমতি দিয়ে এক আদেশ জারি করেন সাইরাস। কিন্তু ওদের অধিকাংশই ফিরে না যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর থেকে কেবল সংখ্যালঘু একটা দল প্রতিশ্রুত ভূমিতে বাস করবে। বাইবেল আমাদের বলছে, ৪২,৩৬০ জন ইহুদি বাবিলন ও তেল আবিব ত্যাগ করে স্বদেশের পথ ধরেছিল, যেখানে তারা তাদের হতবুদ্ধি স্বজাতিদের ওপর নতুন জুদাইজম চাপিয়ে দিয়েছিল।
আমরা নির্বাসনের পর রচিত এবং পেন্টাটিউকের অংশে পরিণত প্রিস্টলি ট্র্যাডিশনের রচনায় এর সঙ্গে কী জড়িত ছিল তা দেখতে পাই। এটা আমাদের ‘J’ এবং ‘E’ বর্ণিত ঘটনাবলীর নিজস্ব ব্যাখ্যা যোগায় এবং নাম্বারস ও লেভিটিকাস শীর্ষক দুটো নতুন পুস্তক যোগ করেছে। আমাদের প্রত্যাশা মতোই ইয়াহ্ওয়েহ্ সম্পর্কে অত্যন্ত উন্নত ও অতিরঞ্জিত ধারণা ছিল ‘P’-র। যেমন, তিনি বিশ্বাস করতেন না যে ‘J’ যেভাবে বলেছেন সেভাবে কারও পক্ষেই সত্যি সত্যি ঈশ্বরকে দেখা সম্ভব। ইযেকিয়েলের বহু ধারণার মতো তাঁর বিশ্বাস ছিল ঈশ্বর সম্পর্কে মানুষের ধারণা এবং প্রকৃত সত্তার মাঝে একটা পার্থক্য রয়েছে। ‘P’-এর সিনাই পর্বতে মোজেসের কাহিনীতে মোজেস ইয়াহ্ওয়েহ্হ্ দর্শন লাভের জন্যে আবেদন জানাচ্ছেন, ইয়াহ্ওয়েহ্ জবাবে বলছেন: ‘তুমি আমার মুখ দেখিতে পাইবে না, কেননা মনুষ্য আমাকে দেখিলে বাঁচিতে পারে না।’[৬০] তার বদলে স্বর্গীয় প্রতাপ থেকে রক্ষা পাবার জন্যে পাহাড় প্রাচীরের একটা ফোকরে আশ্রয় নিতে হবে মোজেসকে যেখান থেকে তিনি ইয়াহ্ওয়েহ্ বিদায় নেওয়ার সময় এক ঝলকের জন্যে অনেকটা পেছন থেকে দেখতে পাবেন। ‘P’-এমন একটা ধারণা যোগান দিয়েছেন যেটা ঈশ্বরের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। নারী-পুরুষ কেবল স্বর্গীয় সত্তার একটা আভা দেখতে পাবে, যাকে তিনি বলছেন ‘ইয়াহ্ওয়েহ্র প্রতাপ (kavod), ‘তাঁর সত্তার একটা প্রকাশ, যাকে স্বয়ং ঈশ্বরের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না।[৬১] মোজেস যখন পাহাড় থেকে নেমে এলেন, তার চেহারায়ও এই প্রতাপ বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, এমন ঔজ্জ্বল্য নিয়ে ঝলমল করছিল যে, ইসরায়েলিরা তার দিকে তাকাতে পারছিল না।[৬২]
ইয়াহ্ওয়েহ্র ‘প্রতাপ’ পৃথিবীতে তাঁর উপস্থিতির একটি প্রতীক, সুতরাং এটা নারী-পুরুষের সৃষ্ট ঈশ্বর সংক্রান্ত ইমেজ ও স্বয়ং ঈশ্বরের পবিত্রতার পার্থক্য বুঝিয়ে দেয়। এভাবে এটা ইসরায়েলি ধর্মের পৌত্তলিক বৈশিষ্ট্যের এক পাল্টা ভারসাম্য ছিল। এক্সোডাসের প্রাচীন কাহিনীগুলো পর্যালোচনা করতে গিয়ে ‘P’ এটা ভাবেননি যে ঘুরে বেড়ানোর দিনগুলোয় স্বয়ং ইয়াহ্ওয়েহ্ ইসরায়েলিদের সঙ্গে ছিলেন সেটা হতো একটা অসম্ভব পার্থিব ব্যাপার। বরং তার বদলে তিনি ইয়াহ্ওয়েহ্ যেখানে মোজেসের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন সেই তাঁবু ইয়াহ্ওয়েহ্র ‘প্রতাপে’ ভরে ওঠা দেখিয়েছেন। একইভাবে মন্দিরে অবস্থানকারীও কেবল ইয়াহ্ওয়েহ্র প্রতাপই হতে পারে।[৬৩]
