বাবিলনের নদনদীর তীরে বসে নির্বাসিতদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই অনুভব করেছিল যে, প্রতিশ্রুত ভূমির বাইরে তারা ধর্ম পালন করতে পারবে না। পৌত্তলিক দেবতারা সবসময় আঞ্চলিক প্রকৃতির ছিলেন, ফলে কারও কারও কাছে ভিন্ন দেশে ইয়াহ্ওয়েহ্র গান গাওয়া অসম্ভব মনে হয়েছে: বাবিলনের শিশুদের পাথরের ওপর আছড়ে ফেলে মগজ বের করে ফেলার চিন্তা অনেকেই উপভোগ করেছে।[৫২] নতুন একজন পয়গম্বর অবশ্য শান্তির বাণী প্রচার করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কে কিছুই জানি না আমরা, এটা হয়তো তাৎপর্যবহ, কেননা তার ভবিষ্যদ্বাণী ও শ্লোকে পূর্বসূরিদের মতো ব্যক্তিগত সংগ্রামের কোনও চিহ্ন দেখা যায় না। পরবর্তীকালে তাঁর রচনা ইসায়াহর ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ায় সাধারণভাবে তাঁকে দ্বিতীয় ইসায়াহ্ আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। নির্বাসিত অবস্থায় ইহুদিদের কেউ কেউ বাবিলনের দেবতাদের উপাসনায় ফিরে গিয়েছিল, কিন্তু অন্যরা এক নতুন ধর্মীয় সচেতনতার দিকে ধাবিত হয়েছে। ইয়াহ্ওয়েহ্র মন্দির ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছিল, বেথ-এল ও হেবরনের প্রাচীন কাল্টিক উপাসনালয়গুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বাবিলনে তাদের পক্ষে স্বদেশী আচার-অনুষ্ঠান বা শাস্ত্রাচার পালন সম্ভব ছিল না। ওদের একমাত্র সম্বল ছিল ইয়াহ্ওয়েহ্। দ্বিতীয় ইসায়াহ্ একে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে ইয়াহ্ওয়েহ্কেই একমাত্র ঈশ্বর ঘোষণা দেন। তাঁর পুনর্লিখিত ইসরায়েলিদের ইতিহাসে এক্সোডাসের মিথ এমন ইমেজারির আবরণ পায় যা আমাদের আদিম সাগরে তিয়ামাতের বিরুদ্ধে মারদুকের বিজয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়:
আর ইয়াহ্ওয়েহ্ মিশ্ৰীয় সমুদ্রের খাড়ি নিঃশেষে বিনষ্ট করিবেন।
ফরাৎ নদীর উপরে নিজ উত্তপ্ত বায়ু সহকারে হস্ত দোলাইবেন,
তাহাকে প্রচার করিয়া সপ্ত প্রণালী করিবেন,
ও লোকদিগকে পাদুকাঁচরণে পার করিবেন।
আর মিসর দেশ হইতে ইস্রায়েলের বাহির হইয়া আসিবার সময়ে যেমন
তাহার নিমিত্ত পথ হইয়াছিল তেমনি তাহার প্রজাদের
অবশিষ্টাংশের অনূর হইতে অবশিষ্ট লোকদের নিমিত্ত এক রাজপথ
হইবে ।[৫৩]
প্রথম ইসায়াহ্ ইতিহাসকে স্বর্গীয় সতর্কবাণীতে পরিণত করেছিলেন। তাঁর সান্ত্বনা পুস্তকে (Book of Cousolation) বিপর্যয়ের পর দ্বিতীয় ইসায়াহ ইতিহাসকে ভবিষ্যতের নতুন আশা সঞ্চারে ব্যবহার করেছেন। ইয়াহ্ওয়েহ্ অতীতে ইসরায়েলকে একবার উদ্ধার করে থাকলে আবারও তা করতে পারবেন। তিনি স্বয়ং ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর উদগাতা, তার চোখে সকল গোয়িম কোনও পাত্রের এক ফোঁটা পানির চেয়ে বেশি কিছু নয়। প্রকৃতপক্ষে তিনিই একমাত্র ঈশ্বর যার গুরুত্ব আছে। বাবিলনের প্রাচীন উপাস্যদের একটা ঠেলাগাড়িতে তুলে সূর্যাস্তের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে কল্পনা করেছেন দ্বিতীয় ইসায়াহ্।[৫৪] তাদের দিন ফুরিয়ে গেছে: ‘আমি কি ইয়াহ্ওয়েহ্ নই? বারবার জিজ্ঞাসা রেখেছেন তিনি, আমার পাশে আর কোনও দেবতা নেই।[৫৫]
আমি ব্যতীত অন্য ঈশ্বর নাই;
আমি ধৰ্ম্মশীল ও ত্রাণকারী ইয়াহ্ওয়েহ্।
আমি ব্যতীত অন্য নাই।[৫৬]
গোয়িমদের দেবনিচয়কে অস্বীকার যেতে দেরি করেননি দ্বিতীয় ইসায়াহ্, বিপর্যয়ের পর যাদের অবশ্য বিজয়ী রূপে দেখা হয়ে থাকতে পারে। নির্বিকার চিত্তে তিনি ধরে নিয়েছেন, ইয়াহ্ওয়েহ্ই-মারদুক বা বাআল নন–সমস্ত মহান ঘটনাবলী ঘটিয়েছেন যা বিশ্বকে অস্তিত্ব দান করেছেন। সম্ভবত বাবিলনের সৃষ্টি সংক্রান্ত মিথগুলোর সঙ্গে নতুন যোগাযোগ ঘটার কারণেই ইসরায়েলিরা প্রথমবারের মতো সৃষ্টির ক্ষেত্রে ইয়াহ্ওয়েহ্র ভূমিকার ব্যাপারে ব্যাপকভাবে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। তারা অবশ্যই বিশ্বজগতের ভৌত বা বাস্তব উৎপত্তি বা। সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের প্রয়াস পায়নি বরং বর্তমান কঠিন বিশ্ব পরিস্থিতিতে সান্ত্বনা পেতে চেয়েছে। ইয়াহ্ওয়েহ্ আদিকালের দানবসদৃশ্য বিশৃঙ্খলাকে দমন করে থাকলে তার পক্ষে নির্বাসিত ইসরায়েলিদের উদ্ধার করা কোনও ব্যাপারই নয়। এক্সোডাস মিথ ও সময়ের সূচনালগ্নে জলীয় বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিজয়ের পৌত্তলিক গল্প গাথার মাঝে মিল লক্ষ করে স্বর্গীয় ক্ষমতা বা শক্তির এক নতুন আবির্ভাবের আশায় আস্থার সঙ্গে বুক বাঁধার আহ্বান জানিয়েছেন দ্বিতীয় ইসয়াহ। উদাহরণ স্বরূপ, এখানে তিনি কানানের সৃষ্টি সংক্রান্ত মিথ, দানব লোতনের বিরুদ্ধে বাআলের বিজয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এই সাগর-দানবকে রাহাব: কুমীর (tannin) ও অতলগহ্বর (tebom) বলেও ডাকা হতো:
ওঠো, জাগিয়া ওঠো! শক্তিতে আবৃত করো,
ইয়াহ্ওয়েহ্র হাত,
জাগিয়া ওঠো, অতীত কালের ন্যায়,
সেই বহু প্রজন্ম অতীতের সময়ের ন্যায়।
তুমি কি রাহাবকে খণ্ড-বিখণ্ড করো নাই;
আর ড্রাগনকে (tannin) বিদ্ধ করো নাই?
তুমি কি সাগরকে শুস্ক করো নাই,
বিশাল গহ্বরের (tehom) পানিকে
সাগতলকে পথে রূপান্তরিত করার জন্যে
যাতে উদ্ধারপ্রাপ্তরা অতিক্রম করিতে পারে? [৫৭]
ইসরায়েলের ধর্মীয় কল্পনায় অবশেষে ইয়াহ্ওয়েহ্ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিদের গ্রাস করে ফেললেন: নির্বাসিত অবস্থায় পৌত্তলিকতাবাদের প্রলোভন আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছিল ও জুদাইজমের ধর্ম জন্ম নিয়েছিল। সে সময় ইয়াহ্ওয়েহ্র কাল্ট সঙ্গত কারণেই বিলুপ্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল ঠিক তখন চরম হতাশাব্যাঞ্জক পরিস্থিতিতে তিনি মানুষের আশাবাদী হয়ে ওঠার উপায়ে পরিণত হয়েছিলেন।
