যাদের নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল তাদের ৭২২ সালের উত্তরাঞ্চলীয় দশটি গোত্রের মতো একীভূত হতে বাধ্য করা হয়নি। দুটো গোষ্ঠী হিসাবে বাস। করেছে তারা একটা পোত্র বাবিলনে ও অপরটি নিষ্ঠুর এবং উরের অদূরবর্তী ইউফ্রেতিসের শাখা নদী শেরারের অন্য পারে এক এলাকায় যার নাম তারা। রেখেছিল তেল আবিব (বসন্তকালীন পাহাড়)। ৫৯৭ সালে নির্বাসিত ইহুদিদের প্রথম দলে একজন পুরোহিত ছিলেন, তাঁর নাম ইযেকিয়েল। টানা প্রায় পাঁচ বছর নিজ গৃহে অবস্থান করেন তিনি, এ সময় কারও সঙ্গে কথা বলেননি। এরপর অস্তিত্ব বিদীর্ণকারী ইয়াহ্ওয়েহ্ দর্শনের অভিজ্ঞতা হয় তার যার ফলে আক্ষরিক অর্থেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। তাঁর প্রথম দিব্যদর্শনের ঘটনাটির একটু বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা জরুরি, কারণ বহু শতাব্দী পরে-সপ্তম অধ্যায়ের আমরা যেমন দেখব-ইহুদি অতিন্দ্রীয়বাদীদের কাছে এটা অত্যন্ত গুরুত্ববহ। হয়ে উঠবে। ইযেকিয়েল আলোর ভেতর দিয়ে বস্ত্র নিক্ষিপ্ত আলোর একটি মেঘ দেখেছিলেন। উত্তর দিক থেকে তীব্র হওয়া বইছিল। এই ঝড়ো অস্পষ্টতার মাঝে তিনি যেন দেখতে পেলেন-ইমেজারির সাময়িক প্রকৃতির ওপর জোর দেওয়ার ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন তিনি-চারটি শক্তিশালী পশু টেনে নিয়ে যাচ্ছে একটা বিশাল রথ। এগুলো বাবিলনের রাজপ্রাসাদের তোরণে খোদাই করা কারিবু (Karibu)-র মতো প্রায়, কিন্তু ইযেকিয়েল কল্পনার চোখে এগুলোকে দেখা অসম্ভব করে তুলেছেন: প্রত্যেকটার মানুষ, সিংহ, বঁড় ও ঈগলের চেহারা বিশিষ্ট চারটি করে মাথা, প্রত্যেকটি চাকা একটি অন্যটির উল্টোদিকে ঘুরছে। ইমেজারি কেবল দর্শনের যে অচেনা প্রভাব তিনি বর্ণনা করার চেষ্টা করছিলেন, তার গুরুত্বই তুলে ধরেছে। পশুগুলোর ডানা ঝাঁপটানোর শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছিল। পানির স্রোতের মতো শোনাচ্ছিল ওটার শব্দ, শাদ্দাইয়ের কণ্ঠস্বরের মতো, ঝড়ের মতো কণ্ঠস্বর, শিবিরের শব্দের মতো। রথের ওপর সিংহাসনের মতো একটা কিছু ছিল যেখানে পুরুষ মতো কেউ একজন ছিল, পিতলের মতো চকচক করছিল ওটা, বাহু থেকে অগ্নি বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। ওটাকে আবার ইয়াহ্ওয়েহ্র প্রতাপের (কভোদ) মতো মনে হয়েছে।[৪৯] নিমেষে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন ইযেকিয়েল এবং একটা কণ্ঠস্বরকে তার উদ্দেশে কথা বলতে শুনেছেন।
কণ্ঠস্বরটি ইযেকিয়েলকে ‘মানব সন্তান’ বলে সম্বোধন করেন, ঠিক যেন। মানুষ ও স্বর্গীয় জগতের মধ্যে বর্তমান দূরত্বের ওপর জোর দেওয়ার জন্যই। কিন্তু ইযেকিয়েলের ইয়াহ্ওয়েহ্ দর্শন আবার নির্দিষ্ট কাজের বাস্তব পরিকল্পনার জন্ম দেবে। ইসরায়েলের বিদ্রোহী সন্তানদের কাছে ঈশ্বরের বাণী পৌঁছে দিতে হবে ইযেকিয়েলকে। ঐশ্বরিক বার্তার অমানবীয় রূপটি এক ভয়ঙ্কর ইমেজ দিয়ে বোঝানো হয়েছে: বিলাপ ও গোঙানিতে আবৃত একটা পুঁথি ধরা হাত পয়গম্বরের দিকে এগিয়ে আসে। ঈশ্বরের বাণী হজম করে আপন সত্তার অংশে পরিণত করার জন্যে। যথারীতি Mysterium terrible এর মতোই fascinans : পুঁথির স্বাদ মধুর মতো মনে হলো। শেষ পর্যন্ত ইযেকিয়েল বললেন, ‘আর আত্মা আমাকে তুলিয়া লইয়া গেলে আমি মনস্তাপে দুঃখিত হইয়া গমন করিলাম আর ইয়াহ্ওয়েহ্র হস্ত আমার উপর বলবৎ ছিল।’[৫০] তিনি তেল আবিবে পৌঁছে গোটা সপ্তাহ স্তব্ধ থাকিয়া বসিয়া থাকলেন।
ইযেকিয়েলের অদ্ভুত অভিজ্ঞতা দেখায় যে, স্বর্গীয় জগৎ মানব জাতির কাছে কতখানি অচেনা ও দূরবর্তী হয়ে উঠেছিল। তিনি স্বয়ং এই দূরত্বের প্রতাঁকে পরিণত হয়েছিলেন। ইয়াহ্ওয়েহ্ বারবার বিভিন্ন অদ্ভুত কর্মকাণ্ড সম্পাদনের নির্দেশ দিয়েছেন তাঁকে, যেগুলো স্বাভাবিক সত্তা থেকে ইযেকিয়েলকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। ওসব আচরণ এই সংকটকালে ইসরায়েলের দুর্ভোগ তুলে ধরার জন্যেও প্রণয়ন করা হয়েছিল এবং এক গভীরতরে স্তরে দেখিয়েছে যে, খোদ ইসরায়েল পৌত্তলিক জগতে অনাহুত হয়ে উঠছে। এই কারণে স্ত্রীর মৃত্যুর পর ইযেকিয়েলের ওপর শোক প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আরেপিত হয়েছে: একপাশে কাত হয়ে ৩৯০ দিন এবং অন্য পাশ ফিরে ৪০ দিন শুয়ে থাকতে হয়েছিল তাকে। একবার অবশ্য কোনও বাসযোগ্য নগর ছাড়া তল্পিতল্পাসই শরণার্থীর মতো তেল আবিবের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেও হয়েছিল তাকে। ইয়াহ্ওয়েহ্ এমন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় ভরে দিয়েছিলেন তাকে যে কম্পন আর অস্থিরভাবে ঘুরে বেড়ানো থেকে বিরত থাকতে পারেননি তিনি। অন্য এক ঘটনায় পশুর বিষ্ঠা খেতেও বাধ্য করা হয়েছে তাকে, জেরুজালেম অবরোধকালে স্বদেশবাসীর অদৃষ্ট দুর্ভিক্ষের আগাম নিদর্শন ছিল সেটা। ইযেকিয়েল ইয়াহ্ওয়েহ্র কাল্টের প্রকট ধারাবাহিকতাহীনের (radical discontinuti)-এর প্রতাঁকে পরিণত হয়েছিলেন: কোনও কিছুই নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়ার উপায় ছিল না, স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।
অন্যদিকে পৌত্তলিক দর্শন দেবতা ও সাধারণ জগতের মাঝে অনুভূত ধারাবাহিকতা উপভোগ করে যাচ্ছিল। প্রাচীন ধর্মে সান্ত্বনাদায়ক কিছুই পাননি ইযেকিয়েল, যেটাকে স্বভাবক্রমে তিনি আবর্জনা’ আখ্যায়িত করতেন। এক দিব্যদর্শনের সময় জেরুজালেমের মন্দির দেখানো হয় তাকে। আতঙ্কের সঙ্গে তিনি দেখাতে পান, বিনাশের দোরগোড়ায় পৌঁছেও জুদাহ্র জনগণ ইয়াহ্ওয়েহ্র মন্দিরে স্থাপিত পৌত্তলিক দেবতাদের উপাসনা করছে। খোদ মন্দির এক দুঃস্বপ্নময় জায়গায় পরিণত হয়েছে: এর কক্ষগুলোর দেয়াল কিলবিলে সাপ আর বিশ্রী সব জানোয়ারের ছবিতে ঢাকা; অশ্লীল আলোয় পুরোহিতরা ‘অশ্লীল আচরণে লিপ্ত, ঠিক যেন ব্ল্যাকরুমে যৌন ক্রিয়ায় জড়িয়ে আছে। হে মনুষ্যসন্তান, ইস্রায়েল জলের প্রাচীন-বর্গ অন্ধকারে, প্রত্যেকে আপন আপন ঠাকুর ঘরে কি কি কাৰ্য্য করে তাহা কি তুমি দেখিলে?[৫১] আরেকটা ঘরে দেবতা তামমুযের (Tammuz) দুর্ভোগের জন্যে বসে বসে কাঁদছিল মহিলারা; অন্যরা স্যাঙ্কচুয়্যারির দিকে পেছন ফিরে সূর্যের উপাসনা করছিল। সবশেষে পয়গম্বর তার প্রথম দিব্যদর্শনে দেখা ইয়াহ্ওয়েহ্র প্রতাপ চলে যাওয়া রথ দেখতে পান। কিন্তু তখনও পুরোপুরি দূরবর্তী উপাস্যে পরিণত হননি ইয়াহ্ওয়েহ্। জেরুজালেম ধ্বংসের পূর্ববর্তী শেষ দিনগুলোতে ইযেকিয়েল ইসরায়েল জাতির মনোযোগ আকর্ষণ ও তাঁকে মেনে নিতে বাধ্য করার ব্যর্থ প্রয়াসে ইয়াহ্ওয়েহ্ও চিৎকার করার কথা বলে গেছেন। আসন্ন বিপর্যয়ের জন্যে খোদ ইসরায়েলই দায়ী। ইয়াহ্ওয়েহ্কে বারবার দূরবর্তী মনে হলেও তিনি ইযেকিয়েলের মতো ইসরায়েলিদের বুঝতে উৎসাহ যুগিয়েছেন। যে, ঐতিহাসিক অমোঘ আঘাত দৈবচয়িত ও খেয়ালি নয় বরং এর নিগূঢ় যুক্তি ও সুষ্ঠুতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিষ্ঠুর জগতে প্রকট একটা অর্থ খুঁজে পাবার প্রয়াস পাচ্ছিলেন তিনি।
