হে ইয়াহ্ওয়েহ্, তুমি আমাকে প্ররোচনা করিলে। আমি প্ররোচিত হইলাম;
তুমি আমা হইতে বলবান, তুমি প্রবল হইয়াছ।
আমি সমস্ত দিন উপহাসের পাত্র হইয়াছি-সকলেই আমাকে ঠাট্টা করে ।
যদি বলি তাহার বিষয় আর উল্লেখ করিব না, তাহার নামে আর কিছু কহিব না,
তবে আমার হৃদয়ে যেন দাহকারী অগ্নি অস্থিমধ্যে রুদ্ধ হয়;
তাহা সহ্য করিতে করিতে আমি ক্লান্ত হইয়া পড়ি,
আর তিষ্ঠিতে পারি না। [৪৩]
দুটি সম্পূর্ণ ভিন্নদিকে জেরেমিয়াহকে টানছিলেন ঈশ্বর: একদিকে তিনি গভীর আকর্ষণ বোধ করেছেন ইয়াহ্ওয়েহ্র প্রতি যেখানে প্রলোভনের মিষ্টি আত্মসমর্পণের সকল ছোঁয়া রয়েছে, কিন্তু অন্যদিকে আপন ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভেসে যাওয়া এক শক্তির টানে বিধ্বস্ত বোধ করেছেন।
আমোসের আমল হতেই পয়গম্বর একজন নিঃসঙ্গ একাকী মানুষ। এই সময়ে ওইকুমিনের অন্যান্য অঞ্চলের বিরপীতে মধ্যপ্রাচ্য ব্যাপকভাবে ঐক্যবদ্ধ ধর্মীয় আদর্শ গ্রহণ করেনি।[৪৪] পয়গম্বরদের ঈশ্বর ইসরায়েলিদের পৌরাণিক সচেতনতার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে মুলস্রোতের বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে এগোনোর ওপর জোর দিচ্ছিলেন। জেরেমিয়ার যন্ত্রণার মাঝে আমরা দেখতে পাই কি বিরাট টানাপোড়েন ও স্থানচ্যুতি জড়িত ছিল এতে। ইসরায়েল ছিল। পৌত্তলিক এলাকা ঘেরা ইয়াহ্ওয়েহ্ম্বাদের একটা ছোট অনক্লেভ; ইয়াহ্ওয়েহ্ নিজেও বহু ইসরায়েলি দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। এমনকি ডিউটেরোনমিস্টরা, যাঁদের ঈশ্বর অনেক কম ভীতিকর, ইয়াহ্ওয়েহ্র সঙ্গে সাক্ষাৎকে উৎপীড়ক সংঘাত হিসাবে দেখেছেন। তিনি মোজেসকে ইসরায়েলিদের কাছে ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য করেছেন, যারা ইয়াহ্ওয়েহ্র সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সম্ভাবনায় শঙ্কিত ছিল, ঈশ্বর প্রত্যেক প্রজন্মে একজন করে পয়গম্বর পাঠাবেন ঐশী প্রচারের ভার বহন করার জন্যে।
কিন্তু তখনও সর্বব্যাপী স্বর্গীয় শক্তি আত্মার সঙ্গে তুলনীয় কোনও কিছুর আবির্ভাব ঘটেনি ইয়াহ্ওয়েহ্র কাল্টে । বহিস্থঃ দুয়ে সত্তা হিসেবে ইয়াহ্ওয়েহ্কে দেখা হয়েছে। যাকে দূরবর্তী মনে না হওয়ার জন্যে কোনওভাবে মানব-সম করার প্রয়োজন ছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছিল: বাবিলনিয়রা জুদাহয় আগ্রাসন চালিয়ে রাজা ও ইসরায়েলিদের প্রথম দলটিকে দেশান্তরে পাঠিয়ে দিয়েছিল; শেষ পর্যন্ত জেরুজালেমও আক্রান্ত হয়। পরিস্থিতির অবনতি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে জেরেমিয়াহ মানবীয় আবেগসমূহ ইয়াহ্ওয়েহ্র প্রতি আরোপ করা অব্যাহত রাখেন: গৃহহীন বলে দুঃখকষ্ট আর নিঃসঙ্গতার জন্যে ঈশ্বরকে বিলাপ করিয়েছেন তিনি, ইয়াহ্ওয়েহ্ তাঁর জাতির মতোই হতবুদ্ধি, অপমানিত ও পরিত্যক্ত বোধ করেছেন; তাদের মতোই যেন চিন্তিত, বিচ্ছিন্ন এবং বিবশ। জেরেমিয়াহ্ তার বুকে ফুঁসে ওঠা যে ক্রোধ অনুভব করেছেন সেটা তাঁর ক্রোধ নয় বরং ইয়াহ্ওয়েহ্র ক্রোধ।[৪৫] পয়গম্বরগণ যখনই মানুষের কথা ভেবেছেন তখনই আপনাআপনি ঈশ্বরের কথাও ভেবেছেন-জগতে যার উপস্থিতি যেন তাঁর জাতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রকৃতপক্ষেই, পৃথিবীতে কার্যকর হতে চাইলে ঈশ্বরকে মানুষের ওপর নির্ভর করতে হয়-এ ধারণাটি ঈশ্বর সম্পর্কে ইহুদি ধারণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এমনও ইঙ্গিত রয়েছে যে, মানুষ তার আপন আবেগ ও অভিজ্ঞতার মাঝে ঈশ্বরের ভূমিকা উপলব্ধি করতে সক্ষম, অর্থাৎ ইয়াহ্ওয়েহ্ মানবীয় অবস্থারই একটা অংশ।
শত্রু যতক্ষণ সদর দরজায় অবস্থান করেছে, জেরেমিয়াহ্ ততক্ষণ ঈশ্বরের নামে তাঁর জাতিকে বকাবাদ্যি করেছেন (যদিও ঈশ্বর সকাশে তিনি তাদের পক্ষেই কথা বলেছেন)। ৫৮৭ সালে বাবিলনিয়দের হাতে জেরুজালেমের পতন হওয়ার পর, ইয়াহ্ওয়েহ্র কাছ থেকে আগত ভবিষ্যদ্বাণী আরও স্বস্তি দায়ক হয়ে উঠল: তিনি তাঁর জাতিকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এখন যেহেতু তাদের শিক্ষা হয়ে গেছে, ওদের দেশে ফিরিয়ে আনবেন। বাবিলনের কর্তৃপক্ষ জেরেমিয়াকে জুদাহ্য় থেকে যাবার অনুমতি দিয়েছিলেন, ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা প্রকাশের পক্ষে তিনি কিছু ভূসম্পত্তি কিনেছিলেন: ‘কেননা ইয়াহ্ওয়েহ্ স্যারেথ এই কথা কহেন: বাটীর, ক্ষেত্রের ও দ্রাক্ষাক্ষেত্রের ক্রয় বিক্রয় এই দেশে আবার চলিবে।’[৪৬] এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, কেউ কেউ বিপর্যয়ের জন্যে ইয়াহ্ওয়েহ্কে দোষারোপ করেছে। মিশর ভ্রমণকালে জেরেমিয়াহ্ ডেল্টা অঞ্চলে পলায়নকারী ইহুদিদের একটা দলের দেখা পান যারা ইয়াহ্ওয়েহ্ বিশ্বাসী ছিল না। ওই দলের মহিলারা দাবি করল যে, যতদিন তারা স্বর্গের রানি ইশতারের সম্মানে প্রচলিত আচার-অনুষ্ঠান পালন করেছে। ততদিন সব কিছু চমৎকার চলছিল; কিন্তু জেরেমিয়াদের মতো লোকদের প্ররোচনায় সেসব বাদ দেওয়ার পরই বিপর্যয়, পরাজয় ও শাস্তি নেমে এসেছে। কিন্তু ট্র্যাজিডি যেন জেরেমিয়ার নিজস্ব অন্তদৃষ্টিকে আরও গভীর করে তুলেছিল।[৪৭] জেরুজালেমের পতন ও মন্দির ধ্বংসের পর তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেছিলেন যে, ধর্মের এসব বাহ্যিক আবরণ স্রেফ এক অভ্যন্তরীণ মানসিক অবস্থার প্রতীক। ভবিষ্যতে ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তিটি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন: ‘আমি তাহাদের অন্তরে আমার ব্যবস্থা দিব, ও তাহাদের হৃদয়ে তাহা লিখিব।’[৪৮]
