আর সেই সময় জোশুয়া আসিয়া পর্বতময় প্রদেশ হইতে–হিব্রোন, দবির ও আনাব হইতে, যিহুদার সমস্ত পর্বতময় প্রদেশ হইতে আর ইসরায়েলের সমস্ত পৰ্বতময় প্রদেশ হইতে আনাকীয়দিগকে উচ্ছেদ করিলেন; জোশুয়া তাহাদের নগরগুলোর সহিত তাহাদিগকে নিঃশেষে বিনষ্ট করিলেন। ইসরায়েল সন্তানগণের দেশে অনাকীয়দের কেহ অবশিষ্ট থাকিল না; কেবল দেলাতে গাতে ও আসদোদে কতকগুলি অবশিষ্ট থাকিল। [৩৮]
প্রকৃতপক্ষে সন্দেহাতীতভাবেই জোশুয়া ও জাজেস কর্তৃক কানান বিজয় সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না, যদিও নিশ্চিতভাবেই প্রচুর রক্তপাত হয়েছিল । কিন্তু এবার রক্তপাতের ঘটনাকে একটা ধর্মীয় যুক্তির ভিত্তি দেওয়া হলো। নির্বাচনের এই ধরনের ধর্মতত্ত্বের বিপদ এই যে, ধর্মতত্ত্ব একজন ইসায়াহর অতিপ্রাকৃত দৃষ্টিভঙ্গির সমপর্যায়ের নয়। একেশ্বরবাদের গোটা ইতিহাসকে ক্ষতবিক্ষতকারী পবিত্র যুদ্ধগুলোতে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ঈশ্বরকে আমাদের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একটা প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করে নিজের ঘাটতিসমূহ উপলব্ধি করার বদলে এঁকে আমাদের অহমসৃষ্ট ঘৃণা বাড়িয়ে তোলা বা বৈধ করা ও একে চরম পর্যায়ে তোলার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে করে ঈশ্বরের আচরণ একেবারে আমাদের অনুরূপ হয়ে পড়ে, যেন তিনি আরেকজন মানুষ মাত্র। এমন একজন ঈশ্বর আমোস বা ইসায়াহ্র ঈশ্বরের চেয়ে আরও বেশি জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয়ই হওয়ার কথা, যিনি নির্দয় আত্মসমালোচনা দাবি করেন।
নিজেদের মনোনীত জাতি দাবি করার জন্যে ইহুদিদের প্রায়ই সমালোচনা করা হয়, কিন্তু তাদের সমালোচকগণ প্রায়শঃই বাইবেলিয়কালে বহুঈশ্বরবাদীতার বিরুদ্ধে পরিচালিত যুক্তিতর্ককে উস্কে দেওয়া অস্বীকৃতির সমরূপ অপরাধে দায়ী। তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রত্যেকটি যার যার ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মনোনয়নের অনুরূপ ধর্মতত্ত্ব গড়ে তুলেছে, কখনও কখনও যা এমনকি বুক অভ জোশুয়ায় কল্পিত ধ্বংসলীলার চেয়েও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে। পাশ্চাত্যের ক্রিশ্চানরা অদ্ভুতভাবে নিজেদের ঈশ্বরের নির্বাচিত ভেবে আত্মপ্রসাদে ভোগে। একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে ক্রিশ্চানরা নিজেদের নব্য নির্বাচিত জাতি দাবি করে ইহুদি ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ক্রুসেডসমূহকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল–ইহুদিদের হারানো মর্যাদার অধিকারী হয়েছে তারা। নির্বাচনের কালভিনিস্ট ধর্মতত্ত্ব আমেরিকানদের ঈশ্বরের আপন জাতি বলে ভাবতে বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। জোশুয়ার জুদাহ্ রাজ্যের মতো এমন একটা বিশ্বাসের তখনই ব্যাপক সাড়া পাওয়ার কথা যখন রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার ফলে জাতি আপন অবলুপ্তির আতঙ্কে তাড়িত। সম্ভবত এ কারণেই বর্তমানে ইহুদি, ক্রিশ্বান ও মুসলিমদের মাঝে প্রকট বিভিন্ন ধরনের মৌলবাদে এ ব্যাপারটা নতুন করে প্রাণ খুঁজে পেয়েছে। ইয়াহ্ওয়েহ্র মতো একজন ব্যক্তি-ঈশ্বরকে এভাবে ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্ন সত্তাকে বাঁচানোর কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে; ব্রাহ্মণের মতো নৈব্যক্তিক উপাস্যের বেলায় যা সম্ভব নয়। আমাদের মনে রাখা দরকার, বিসিই ৫৮৭ সালে নেবুচাদনেযারের জেরুজালেম ধ্বংসের ঘটনা ও বাবিলনের ইহুদিদের বিতাড়নের পেছনে ক্রিয়াশীল ডিউটেরোনিজমে সকল ইসরায়েলি জড়িত ছিল না। নেবুচাদনেযারের অভিষেকের বছর ৬০৪ সালে পয়গম্বর জেরেমিয়াহ্ ইসায়াহ্র প্রতিমা-বিরোধী মতবাদের পুনর্জন্ম দেন যা মনোনীত জাতির বিজয়বাদী মতবাদ উল্টে দিয়েছিল: ঈশ্বর ইসরায়েলকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে বাবিলনকে ব্যবহার করছেন এবার ‘ইসরায়েলের পালা নিষিদ্ধ হবার’। সত্তর বছরের জন্যে নির্বাসনে যেতে হবে তাদের। এই ভবিষ্যদ্বাণী শোনার পর যাজকের হাত থেকে লিপি কেড়ে নিয়ে কুটিকুটি করে ছিঁড়ে আগুনে নিক্ষেপ করেন রাজা জোহায়াকিম। প্রাণভয়ে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন জেরেমিয়াহ্।
জেরেমিয়ার জীবন দেখায়, ঈশ্বরের এই অধিকতর চ্যালেঞ্জিং ইমেজ গড়ে তোলার পেছনে কী বিশাল কষ্ট ও প্রয়াসের প্রয়োজন হয়েছিল। পয়গম্বর হতে চাননি তিনি, ভালোবাসার জাতিকে নিন্দা করতে গিয়ে গভীরভাবে বেদনার্ত হয়ে পড়েছিলেন।[৪০] জন্মগতভাবে ঝামেলাবাজ ব্যক্তি ছিলেন না তিনি, তার হৃদয় ছিল অত্যন্ত কোমল। যখন তার কাছে আহ্বান আসে, প্রতিবাদে কেঁদে উঠেছিলন তিনি: ‘হায়, হায়, হে প্রভু ইয়াহ্ওয়েহ্, দেখ, আমি কথা কহিতে জানি না, কেননা আমি বালক!’ আর ইয়াহ্ওয়েহ্ তখন ‘হস্ত প্রসারিত করিয়া’ তার ঠোঁট স্পশ করলেন এবং আপন বাণী তাঁর মুখে স্থাপন করলেন। যে বাণী তাঁকে উচচারণ করতে হয়েছিল সেটা ছিল দ্ব্যর্থবোধক ও স্ববিরোধী: ‘দেখ, উৎপাটন, ভঙ্গ, বিনাশ ও নিপাত করিবার নিমিত্ত, পত্তন ও রোপন করিবার নিমিত্ত…তোমাকে নিযুক্ত করিলাম।’[৪১] সমম্বয়ের অতীত চরম অবস্থার মাঝে যন্ত্রণাদায়ক টানাপোড়েন দাবি করেছে এটা। জেরেমিয়াহ্র ঈশ্বরের অনুভূতি ছিল যন্ত্রণাময়, যার ফলে হাত-পায়ে খিচুনি সৃষ্টি হয়েছে, ভেঙে গেছে হৃদয়, মাতালের মতো টলতে হয়েছে তাঁকে।[৪২] mysterium terrible et fascinans-এর অভিজ্ঞতা যুগপৎ ধর্ষণ ও চরিত্র খোয়ানোর মতো:
