হে ইস্রায়েল শোন (shema)! ইয়াহ্ওয়েহ্ আমাদের ইলোহিম। একমাত্র ইয়াহ্ওয়েহ্ (ebad) আর তুমি তোমার সমস্ত হৃদয় ও তোমার সমস্ত প্রাণ দিয়া আপন ঈশ্বর ইয়াহ্ওয়েহ্কে প্রেম করিবে আর এই যে সকল কথা ও তোমার সমস্ত শক্তি আমি অদ্য তোমাকে আজ্ঞা করি; তাহা তোমার হৃদয়ে থাকুক।[৩২]
ঈশ্বরের নির্বাচন ইসরায়েলকে গোয়িমদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে। লেখক মোজেসকে দিয়ে বলাচ্ছেন, ওরা প্রতিশ্রুত ভূমিতে পৌঁছানোর পর, স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক থাকবে না। তারা তাহাদের সহিত কোনও নিয়ম করিবে না, বা তাহাদের প্রতি দয়া করিবে না। মিশ্র বিবাহ বা সামাজিক মেলামেশা চলবে না। সর্বোপরি, তাদেরকে কানানিয় ধর্ম উচ্ছেদ করতে হবে। তাহাদের যজ্ঞবেদী সকল উৎপাটন করিবে, তাহাদের স্তম্ভ সকল ভঙ্গিয়া ফেলিবে, তাহাদের আশেরাহ্ মূর্তি সকল ছেদন করিবে এবং তাহাদের খোদিত প্রতিমাসকল অগ্নিতে পোড়াইয়া দিবে। ইসরায়েলিদের নির্দেশ দিয়েছেন মোজেস, ‘কেননা তুমি আপন ঈশ্বর ইয়াহ্ওয়েহ্র পবিত্র প্রজা; ভূতলে যত জাতি আছে সেসকলের মধ্যে আপনার নিজস্ব প্রজা করিবার জন্যে তোমার উপর ঈশ্বর ইয়াহ্ওয়েহ্ তোমাকেই মনোনীত করিয়াছেন।’[৩৯]
আজকের দিনে ইহুদিরা শেমা (Shema) আবৃত্তি করার মাধ্যমে একেশ্বরবাদী ব্যাখ্যা দেয়। আমাদের ঈশ্বর ইয়াহ্ওয়েহ্ এক এবং অদ্বিতীয়। ডিউটেরোনমিস্টরা তখনও এই দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারেননি। ইয়াহ্ওয়েহ্ এবাদ (ebad) মানে ইয়াহ্ওয়েহ্ একক বোঝায়নি, বরং ইয়াহ্ওয়েহ্ই একমাত্র উপাস্য যাকে উপাসনা করার অনুমোদন আছে। অন্য দেবতারা তখনও হুমকি স্বরূপ ছিলেন: ওদের কাল্ট আকর্ষণীয় ছিল ও ঈর্ষাপরায়ণ ঈশ্বর ইয়াহ্ওয়েহ্র কাছে থেকে প্রলুব্ধ করে ইসরায়েলিদের টেনে নিতে পারতেন। তারা ইয়াহ্ওয়েহ্র আইনকানুন মেনে চললে তিনি তাদের আশীর্বাদ করবেন, সমৃদ্ধি দান করবেন, কিন্তু তাকে পরিত্যাগ করলে পরিণাম হবে ধ্বংসাত্মক:
‘এবং তুমি যে দেশ অধিকার করিতে যাইতেছ তথা হইতে তোমরা উনুলিত হইবে। আর ইয়াহ্ওয়েহ্ তোমাকে পৃথিবীর এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সমস্ত জাতির মধ্যে ছিন্নভিন্ন করিবেন; সেই স্থানে তুমি আপনার ও আপন পিতৃপুরুষদের অজ্ঞাত অন্য দেবগণের ধর্ম ও প্রস্তরের সেবা করিবে…আর তোমার জীবন তোমার দৃষ্টিতে সংশয়ে দোলায়মান হইবে…তুমি হৃদয়ে যে শঙ্কা করিবে ও চক্ষুতে যে ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখিবে, ত্যুক্ত প্রাতঃকালে বলিবে, “হায় হায় কখন সন্ধ্যা হইবে?” এবং সন্ধ্যাকালে বলিবে “হায় হায় কখন প্রাতঃকাল হইবে”।[৩৫]
সপ্তম শতাব্দীর শেষ দিকে রাজা জোসিয়াহ এবং তাঁর প্রজারা এই কথাগুলো শোনার সময়ে এক নতুন রাজনৈতিক হুমকির মুখোমুখি হতে যাচ্ছিলেন। আসিরিয়দের ঠেকাতে সক্ষম হওয়ায় উত্তরাঞ্চলীয় দশটি গোত্রের পরিণতি এড়াতে পেরেছিল ওরা। ওই দশ গোত্র মোজেসের বর্ণিত শাস্তি ভোগ করেছিল। কিন্তু বিসিই ৬০৬ সালে বাবিলনের রাজা নেবুপোলাসার আসিরিয়দের ধ্বংস করে নিজস্ব সাম্রাজ্য বিস্তারের কাজ শুরু করেছিলেন।
এমনি চরম নিরাপত্তাহীন পরিবেশে ডিউটেরোনমিস্টদের নীতিমালা ব্যাপক প্রভাব রাখে। ইয়াহ্ওয়েহ্র নির্দেশ মানা দূরে থাক, ইসরায়েলের শেষ দুজন রাজা সেধে বিপদ ডেকে এনেছেন। অবিলম্বে সংস্কারে হাত দিয়েছিলেন জোসিয়াহ, অদম্য উৎসাহে কাজ শুরু করেন তিনি। সমস্ত ইমেজ, মূর্তি ও উর্বরতার প্রতীক মন্দিরের বাইরে এনে পোড়ানো হয়। জোসিয়াহ্ আশেরাহর বিরাট মূর্তি নামিয়ে সেখানে আশেরাহ্র পোশাক তৈরি করা মন্দির পতিতাদের থাকার ঘরগুলো ধ্বংস করে দেন। পৌত্তলিকতাবাদের আশ্রয় দেশের বিভিন্ন প্রাচীন উপাসনাগৃহও ধ্বংস করা হয়। এরপর থেকে পুরোহিতরা কেবল পবিত্ৰকৃত জেরুজালেম মন্দিরে ইয়াহ্ওয়েহ্র উদ্দেশে প্রাণী উৎসর্গ করতে পারতেন। প্রায় ৩০০ বছর পরে জোসিয়াহ্র সংস্কার কর্ম লিপিবদ্ধকারী ভাষ্যকারগণ এই অস্বীকৃতি ও দমনের ধার্মিকতার এক চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন।
[জোসিয়াহর] সাক্ষাতে লোকেরা বাআল দেবগণের যজ্ঞবেদী ভাঙিয়া ফেলিল এবং তিনি তদুপরি স্থাপিত সূৰ্য্য প্রতিমা ছেদন করিলেন আর আশেরা-মূর্তি ক্ষোদিত প্রতিমা ও ছাঁচে ঢালা প্রতিমা সকল ভাঙিয়া ধূলিস্যাৎ করিয়া যাহারা তাহাদের উদ্দেশে যজ্ঞ করিয়াছিল তাহাদের। কবরের উপর সেই ধূলা ছড়াইয়া দিলেন। আর তাহাদের যজ্ঞবেদীর উপরে যাজকদের অস্থি পোড়াইলেন এবং যিহুদা ও যিরূসালেমকে শুচি করিলেন। আর মনঃশির ইফ্রায়িম ও শিমিয়নের নগরে নগরে এবং নপ্তালি পৰ্য্যন্ত সর্বত্র কাঁথড়ার মধ্যে এইরূপ করিলেন।[৩৬]
অন্যান্য উপাস্যদের উর্ধ্বে ওঠার বুদ্ধের বিশ্বাসের পরেও সেগুলোকে নিঃশব্দে মেনে নেওয়ার ধারেকাছেও নেই আমরা। এই পাইকারী ধ্বংস সুপ্ত উদ্বেগ ও অভিযোগ থেকে উদ্ভূত ঘৃণা থেকে সৃষ্টি হয়েছিল।
সংস্কারকরা ইসরায়েলের ইতিহাস নতুন করে লিখেছিলেন। নতুন মতবাদ অনুযায়ী জোশুয়া, জাজেস, স্যামুয়েল এবং রাজাবলীর ঐতিহাসিক গ্রন্থ পরিমার্জনা করা হয়েছে এবং পরবর্তীকালে পেন্টটিউকের সম্পাদকগণ নতুন নতুন অনুচ্ছেদ যোগ করেছেন যা এক্সোডাস মিথের ডিউটেরোনমিস্ট ব্যাখ্যাকে অধিকতর পুরোনো ‘J’ ও ‘E’-এর বর্ণনার রূপ দিয়েছে। ইয়াহ্ওয়েহ্ এখন কানানের ধ্বংসের পবিত্র যুদ্ধের রূপকার। ইসরায়েলিদের বলা হয়েছে স্থানীয় কানানবাসীরা অবশ্যই তাদের দেশে থাকতে পারবে না,[৩৭] জোশুয়া যেন অশুভ সম্পূর্ণতার সঙ্গে এই নীতির বাস্তবায়নে বাধ্য হয়েছিলেন।
