আমরা দেখব, ইয়াহ্ওয়েহ্র বিজয় ছিল কষ্টার্জিত। এখানে চাপ, সহিংসতা ও সংঘাতের প্রয়োজন হয়েছে; এ থেকে বোঝা যায় একজন ঈশ্বরের ধর্ম ইসরায়েলিদের কাছে উপমহাদেশের জনগণের কাছে যেভাবে হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্ম এসেছিল তেমন সহজে আসতে পারছিল না। ইয়াহ্ওয়েহ্ যেন শান্তি পূর্ণ স্বাভাবিক উপায়ে প্রাচীন উপাস্যদের অতিক্রম করতে পারছিলেন না। তাঁকে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়েছিল । এভাবে ৮২ নম্বর শ্লোকে আমরা দেখি স্বর্গীয় সভার (Devine Assembly) নেতৃত্ব অর্জনের জন্যে তিনি একটা নাটক করছেন, যেটা বাবিলনিয় এবং কানানিয় উভয় মিথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে:
দেবতার মাঝে রায় ঘোষণা করার জন্যে
এলের সভায় আপন অবস্থান গ্রহণ করলেন ইয়াহ্ওয়েহ্।[২৯]
‘বিচার নিয়ে আর প্রহসন নয়
দুষ্টদের পালন আর নয়!
দুর্বল ও এতিমদের ন্যায়বিচার পেতে দাও,
দুস্থ ও পীড়িতদের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত আচরণ কর,
দুর্বল ও দরিদ্রকে বাঁচাও,
দুষ্টের কবল হতে ওদের রক্ষা কর!’
মুখ ও নির্বোধ, ওরা অন্ধের মতো চলে,
মানব সমাজের মূল ভিত্তি হানি করে।
আমি একবার বলেছিলাম, “তোমরাও দেবতা,
তোমরা সবাই এল এলিয়নের সন্তান’;
কিন্তু তারপরেও, মানুষের মতোই মারা যাবে তোমরা;
মানুষের মতো, দেবতাগণ, তোমাদের পতন ঘটবে।
স্মরণাতীত কাল থেকে এলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা সভায় মোকাবিলা করার জন্যে উঠে দাঁড়িয়ে অন্যান্য দেবতার বিরুদ্ধে কালের সামাজিক চ্যালেঞ্জ মেটাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ইয়াহ্ওয়েহ্। পয়গম্বরদের আধুনিক সমর্মিতার নীতি তুলে ধরেছেন তিনি, কিন্তু তার স্বর্গীয় সহকর্মীগণ বছরের পর বছর ন্যায়বিচার ও সাম্যের পক্ষে কথা বলার জন্যে কিছুই করেননি। প্রাচীনকালে ইয়াহ্ওয়েহ্ ওঁদের ইলেহিম হিসাবে মেনে নিতে তৈরি ছিলেন, এল এলিয়নের (‘সর্ব শ্রেষ্ঠ ঈশ্বর’, God Most high)[৩০] সন্ত নিগণ, কিন্তু দেবতারা প্রমাণ করেছেন তাঁরা অচল। মরণশীল মানুষের মতো ফুরিয়ে যাবেন তাঁরা। শ্লোক রচয়িতা ইয়াহ্ওয়েহ্কে সহযোগী দেবতাদের মৃত্যুর অভিশাপ দিতেই দেখাননি, বরং একই সঙ্গে তিনি এল’র প্রচলিত অবস্থানও কেড়ে নিয়েছেন, ইসরায়েলে তখনও যার সমর্থক ছিল বলে মনে হয়।
বাইবেলে ক্ষতিকর প্রচারণা সত্ত্বেও বহু-ঈশ্বরবাদীতার মাঝে খারাপ কিছু নেই আসলে এটা তখনই আপত্তিকর বা আনাড়ি হয়ে দাঁড়ায় যখন অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে নির্মিত ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিকে অতিপ্রাকৃত সত্তার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। আমরা দেখব, ঈশ্বরের ইতিহাসের পরবর্তী পর্যায়ে ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিমদের কেউ কেউ পরম সত্তার এই আদি ইমেজের ওপর কাজ করেছে ও এমন এক ধারণার উপনীত হয়েছে যা কিনা হিন্দু বা বৌদ্ধ দর্শনের কাছাকাছি। অন্যরা অবশ্য কখনওই এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করে উঠতে পারেনি, তবে ধরে নিয়েছে যে, ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের ধারণা পরম রহস্যের অনুরূপ। বহুঈশ্বরবাদী ধার্মিকতার বিপদ বিসিই ৬২২ সালে জুদাহ্র বাদশাহ জোসিয়াহর শাসন আমলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। পূর্বসুরি রাজা মানাসেহ (৬৮৭-৪২) এবং রাজা আমন (৬৪২-৪০)-এর সমন্বয়ের নীতিমালা বদল করার জন্যে ব্যার্থ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। উল্লিখিত দুই রাজা জনগণকে ইয়াহ্ওয়েহ্র পাশাপাশি কানানের অন্য দেবতাদের উপাসনা করতে উৎসাহিত করেছিলেন। মানাসেহ প্রকৃতপক্ষে মন্দিরে আশেরাহ্র এক প্রতিমাও স্থাপন করেন, এখানে উর্বরতার কান্ট দ্রুত বিকশিত হচ্ছিল। অধিকাংশ ইসরায়েলি যেহেতু আশেরাহ্র ভক্ত ছিল এবং কেউ কেউ তাকে ইয়াহ্ওয়েহ্র স্ত্রী হিসাবে কল্পনা করত, তাই কেবল গোঁড়া ইয়াহ্ওয়েহ্বাদীরাই একে ব্লাসফেমাস মনে করতে পারত। কিন্তু ইয়াহ্ওয়েহ্র কাল্টকে উৎসাহিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ জোসিয়াহ মন্দিরের ব্যাপক সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেন। শ্রমিকরা যখন প্রত্যেকটা জিনিস ওলট পালট করছিল, প্রধান যাজক হিলকিয়েহ একটা প্রাচীন পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করে বসেন, যেটা কিনা ইসরায়েলের সন্তানদের উদ্দেশে দেওয়া মোজেসের শেষ সারমনের বিবরণ। জোসিয়াহর সচিব শাপানকে ওটা দেন তিনি; রাজার উপস্থিতিতে উচ্চ স্বরে তা পাঠ করেন। এটা শোনার পর তরুণ রাজা আতঙ্কে তার পোশাক ছিঁড়ে ফেলেন: ইয়াহ্ওয়েহ্ তাঁর পূর্বপুরুষদের প্রতি এমন ক্ষুব্ধ হওয়ায় বিস্ময়ের কিছু নেই। তারা মোজেসকে দেওয়া তাঁর কঠিন নির্দেশ পালন করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিলেন।[৩১]
এটা প্রায় নিশ্চিত যে, হিলকিয়াহ্র আবিষ্কৃত ‘বুক অভ দ্য ল’ই বর্তমানে আমাদের কাছে ডিউটেরোনমি নামে পরিচিত গ্রন্থের মূল অংশ ছিল। সংস্কারক দল কর্তৃক এটার সময়োচিত আবিষ্কার নিয়ে নানান মতবাদ রয়েছে। কেউ কেউ এমনও মত প্রকাশ করেছেন যে, পয়গম্বর হুলদার সহায়তায় হিলকিয়াহ ও শাপানই গোপনে এটা লিখেছিলেন। জোসিয়াহ্ অবিলম্বে হুলদাহর সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। আমরা কখনওই নিশ্চিতভাবে জানতে পারব না, তবে গ্রন্থটি নিশ্চিতভাবে ইসরায়েলে এক নতুন পরিবর্তনের আভাস প্রদান করে যা সপ্তম শতকের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছে। মোজেসকে তাঁর শেষ সারমনে চুক্তির প্রতি নতুন কেন্দ্রিকতা আরোপ করতে ও ইসরায়েলের বিশেষ মনোনয়নের ধারণা দিতে দেখানো হয়েছে। ইয়াহ্ওয়েহ্ সকল জাতির মধ্য থেকে নিজ জাতিকে আলাদা করে নিয়েছেন, সেটা তাদের কোনও গুণের কারণে নয় বরং তাদের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসার কারণে। বিনিময়ে তিনি পুর্ণ আনুগত্য ও অন্য সব দেবতার তীব্র প্রত্যাখ্যান দাবি করেছেন। ডিউটেরোনমির মূলে অন্তর্ভুক্ত ঘোষণাটি পরে ইহুদিদের বিশ্বাস প্রকাশের মন্ত্রে পরিণত হবে:
