এটা অবশ্যই কানানিয় ধর্মের অত্যন্ত অবিবেচনাপ্রসূত ও অবমূল্যায়িত বর্ণনা। কানান ও বাবিলনের মানুষ কখনও ভাবেনি যে, তাদের দেবতাদের প্রতিমাসমূহও স্বর্গীয়, ওরা কখনও কোনও মূর্তির উপাসনা করতে মাথা নোয়ায়নি। প্রতিমাগুলো ছিল স্বর্গ বা আলৌকিকের প্রতীক। উপাসকদের মনোযোগকে আরও ঊর্ধ্বে আকৃষ্ট করার জন্যে তাদের কল্পনাতীত আদি ঘটনাবলীর মিথের মতো এসব নির্মাণ করা হয়েছিল। এসালিগার মন্দিরে মারদুকের মূর্তি বা কানে আশেরাহর শিলাস্তম্ভকে কখনও দেবতাদের সঙ্গে একীভূত করা হয়নি, বরং এগুলো মানুষকে মানবজীবনে অতিপ্রাকৃত উপাদানের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু তারপরেও পয়গম্বরগণ অত্যন্ত অনাকর্ষণীয় অসন্তোষের সঙ্গে পৌত্তলিক প্রতিবেশীদের উপাস্য বা দেবতাদের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রকাশ করেছেন। ওদের দৃষ্টিতে ঘরে তৈরি এইসব দেবতা সোনা ও রূপা ছাড়া আর কিছুই নয়; মাত্র কয়েক ঘণ্টায় একজন কারিগর এগুলো তৈরি করেছে; ওদের চোখ আছে কিন্তু ওরা দেখতে পায় না, কান দিয়ে শোনে না, ওরা হাঁটতে পারে না; উপাসকদেরই এদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যেতে হয়; ওরা বুদ্ধিহীন, জড় পদার্থ, মানবেতর বস্তু; তরমুজ খেতের কাগভাড়ুয়ার চেয়ে উন্নত কিছু নয়। ইসরায়েলের ইলোহিম ইয়াহ্ওয়েহ্র তুলনা ওরা এলিহিম (elihim), কিছু না। যেসব গোয়িম ওদের উপাসনা করে তারা নির্বোধ; ইয়াহ্ওয়েহ্ ওদের ঘৃণা করেন।[২৮]
বর্তমান কালে একেশ্বরবাদের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হওয়া দুর্ভাগ্যজনক অসহিষ্ণুতার সঙ্গে আমরা এত পরিচিত হয়ে উঠেছি যে আমরা হয়তো অন্য দেবতাদের প্রতি এই বৈরিতা যে নতুন ধর্মীয় প্রবণতা ছিল সেটা অনুধাবণ করতে পারব না। পৌত্তলিকতাবাদ আবশ্যকীয়ভাবে সহিষ্ণু ধর্মবিশ্বাস ছিল: নতুন দেবতার আবির্ভাবে পুরোনো কাল্টগুলো হুমকির সম্মুখীন না হলে প্রচলিত দেবনিচয়ের পাশে অনায়াসে আরেকজন দেবতার স্থান হতো। এমনকি অ্যাক্সিয়াল যুগের নতুন মতবাদসমূহ যেখানে দেবতাদের প্রতি প্রাচীন শ্রদ্ধার স্থান দখল করছিল তখনও প্রাচীন দেবতাদের প্রতি এমন তীব্র বিতৃষ্ণা দেখা যায়নি। হিন্দু ও বৌদ্ধমতবাদে আমরা দেখেছি, মানুষকে দেবতার ওপর সক্ষোভে চড়াও হওয়ার পরিবর্তে তাদের অতিক্রম করে যাওয়ার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। অথচ ইসরায়েলের পয়গম্বরগণ ইয়াহ্ওয়েহ্র প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখা দেবতাদের প্রতি এরকম শান্ত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারেননি। ইহুদি ধর্মগ্রন্থে ‘বহুঈশ্বরবাদীতা’র নতুন পাপ, মিথ্যা দেবতার উপাসনা বিবমিষার অনুভূতির সৃষ্টি করে। এটা এমন এক প্রতিক্রিয়া যা সম্ভবত চার্চের কোনও পোপ ও ফাদার যৌনতা সম্পর্কে যেমনটি বোধ করেন সেরকম। সুতরাং এটা যৌক্তিক বিবেচনাসূত্র কোনও প্রতিক্রিয়া নয় বরং গভীর উদ্বেগ ও অবদমনের পরিচায়ক। পয়গম্বরগণ কী তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় আচরণের কোনও সুপ্ত উদ্বেগ লালন করছিলেন? এমন কি হতে পারে, যে তারা অস্বস্তির সঙ্গে সচেতন ছিলেন যে ইয়াহ্ওয়েহ্ সম্পর্কিত তাঁদের ধারণাও পৌত্তলিকদের বহুঈশ্বরবাদীতার সমরূপ, কারণ তাঁরাও নিজস্ব ভাবমূর্তি অনুযায়ী একজন দেবতার সৃষ্টি করছিলেন?
যৌনতার প্রতি ক্রিশ্চানদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তুলনা অন্য দিক দিয়েও আলোক নিক্ষেপকারী। এই পর্যায়ে অধিকাংশ ইসরায়েলি অবচেতনভাবে পৌত্তলিক উপাস্যদের অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিল। এটা সত্যি যে, ইয়াহ্ওয়েহ্ ক্রমশঃ নির্দিষ্ট কিছু বলয়ে কানানিয়দের ইলোহিমের ভূমিকা গ্রহণ করছিলেন: যেমন হোসেয়া যুক্তি দেখাতে চাইছিলেন যে, ইয়াহ্ওয়েহ্ বাআলের চেয়ে ভালো উর্বরতার দেবতা। কিন্তু অপরিবর্তনীয় পুরুষ দেবতা ইয়াহ্ওয়েহ্র পক্ষে আশেরাহ, ইশতার বা আনাতের ভূমিকা দখল নিশ্চয়ই কঠিন ছিল, ইসরায়েলিদের মাঝে যাঁদের বহু অনুসারী তখনও ছিল-বিশেষ করে নারীদের মাঝে। যদিও একেশ্বরবাদীরা জোর দিয়ে বলবে, তাদের ঈশ্বর লিঙ্গের ঊর্ধ্বে; তবু তিনি আবশ্যকীয়ভাবে পুরুষ রয়ে যাবেন; যদিও আমরা লক্ষ করব, কেউ কেউ এই অসাম্য দূর করার প্রয়াস পাচ্ছে। এটা অংশতঃ তাঁর গোত্রীয় যুদ্ধ দেবতা হিসাবে আবির্ভাবের কারণে। কিন্তু দেবীদের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম বা যুদ্ধ অ্যাক্সিয়াল যুগের অধিকতর কম ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন দেখায়, এই সময় ক্রমশঃ মেয়েরা সামাজিক মর্যাদা হারাতে শুরু করেছিল। এটা মনে হয় যে, অধিকতর আদিম সমাজে নারীদের পুরুষদের চেয়ে অধিক মর্যাদা দেওয়া হয়ে থাকে। প্রথাগত ধর্মে মহান দেবীদের সম্মান নারীদের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতিফলন। অবশ্য নারীর উত্থান বোঝায় যে সামরিক ও শারীরিক শক্তির পুরুষালি বৈশিষ্ট্য নারীসুলভ বৈশিষ্ট্যকে পিছু হটিয়ে দিয়েছিল। এরপর থেকে ওইকুমিনে নারীদের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়, সভ্যতায় দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয় তারা। যেমন, গ্রিসে তাদের অবস্থান ছিল বিশেষভাবে খারাপ-পশ্চিমের লোকেরা প্রাচ্যের পুরুষতান্ত্রিক আচরণের সমালোচনা করার সময় এ সত্যটা তাদের মনে রাখা উচিত। এথেন্সের নারীদের জন্যে গণতান্ত্রিক আদর্শ সম্প্রসারিত হয়নি, তাদের পৃথক স্থানে রাখা হতো, নিম্নস্তরের প্রাণী হিসাবে ঘৃণা করা হতো। ইসরায়েলি সমাজও আরও পুরুষতান্ত্রিক হয়ে উঠছিল। অতীতকালে নারীরা ছিল শক্তিমতী, নিজেদের তারা তাদের স্বামীদের সমকক্ষ ভাবত। ডেবোরাহর মতো কেউ কেউ যুদ্ধে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বও দিয়েছে। এরকম বীরাঙ্গনাদের ইসরায়েলিরা জুথি ও এশতার হিসাবে শ্রদ্ধা করে যাবে, কিন্তু ইয়াহ্ওয়েহ্ সাফল্যের সঙ্গে কানান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেবদেবীদের হারিয়ে দিয়ে একমাত্র ঈশ্বরে পরিণত হওয়ার পর তাঁর ধর্ম প্রায় পুরোপুরিভাবে পুরুষরা পরিচর্যা করবে। দেবীদের কাল্টগুলো বাদ পড়ে যাবে আর এটাই হবে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের একটা লক্ষণ, যা ছিল নতুন সভ্য জগতের বৈশিষ্ট্য।
