যদ্যপি তাহার দশমাংশও থাকে,
তথাপি তাহাকে পুনর্বার গ্রাস করা যাইবে;
কিন্তু যেমন এলা ও অলোনে বৃক্ষ ছিন্ন হইলেও তাহার গুঁড়ি থাকে,
তেমনি এই জাতির গুঁড়িস্বরূপ এক পবিত্র বংশ থাকিবে।[৯]
একজন বিচক্ষণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের পক্ষে এসব দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়া অসম্ভব ছিল না। ইসায়াহর বাণীর অসাধারণ মৌলিকত্ব হচ্ছে তার পরিস্থিতির বিশ্লেষণ। মোজেসের প্রাচীন পক্ষপাতদুষ্ট ঈশ্বর আসিরিয়াকে শত্রুর ভূমিকায় নিয়ে আসতেন; ইসায়াহর ঈশ্বর আসিরিয়াহকে নিজ উপায় হিসাবে দেখেছেন: দ্বিতীয় সারগন ও সেন্নাচেরিব ইসরায়েলিদের দেশান্তরী করে দেশকে ধ্বংস করেননি। ইয়াহ্ওয়েহ্ই জনগণকে বিতাড়ন করেছেন।[১০]
অ্যাক্সিয়াল যুগের পয়গম্বরদের বাণীর এটাই ছিল এক সুর। কেবল মিথ ও লিটার্জিতে নয়, ইসরায়েলের ঈশ্বর নিরেট বর্তমান ঘটনাপ্রবাহে নিজেকে প্রকাশের মাধ্যমে মূলত পৌত্তলিক উপাস্য হতে নিজের অনন্যতা প্রকাশ করেছিলেন। এবার নতুন পয়গম্বরগণ জোর দিয়ে বলতে শুরু করলেন যে, রাজনৈতিক দুর্যোগ ও বিজয় উভয়ই ঈশ্বরকে প্রকাশ করে যিনি ইতিহাসের প্রভু ও নিয়ন্তা হয়ে উঠছেন। সকল জাতি তার ভাণ্ডারে ছিল। আসিরিয়াহ দুর্যোগ কবলিত হবে, কারণ এর শাসকগণ উপলব্ধি করতে পারেনি যে তারা আসলে আরও বিশাল এক সত্তার হাতের পুতুল মাত্র।[১১] যেহেতু ইয়াহ্ওয়েহ্ আসিরিয়ার ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করেছেন, সেহেতু ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষীণ একটা আশা ছিল। কিন্তু কোনও ইসরায়েলি এ কথা শুনতে চাইত না যে তার স্বজাতিই অদূরদর্শী রাজনীতি ও শোষণমূলক আচরণের মধ্য দিয়ে মাথার উপর রাজনৈতিক ধ্বংস ডেকে এনেছে। এ কথা শুনে কেউ খুশি হতো না যে, ইয়াহ্ওয়েহ্ই ৭২২ এবং ৭০১ সালে আসিরিয়া যুদ্ধের রূপকার ছিলেন, ঠিক যেভাবে তিনি জোশুয়া, গিদিয়ান ও রাজা ডেভিডের সেনাদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যে জাতির তার মনোনীত জাতি হওয়ার কথা সে জাতিকে নিয়ে কী ছেলেখেলা খেলছিলেন তিনি? ইসায়াহু কর্তৃক ইয়াহ্ওহেয়ের বর্ণনায় স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা পূরণের কিছু ছিল না। মানুষকে কষ্ট হতে মুক্তি দানের বদলে ইয়াহ্ওয়েহ্ যেন অনাকাক্ষিত বাস্তবতার মোকাবিলা করতে বলছিলেন। মানুষকে পৌরাণিক কালে নিক্ষেপকারী প্রাচীন কাল্টিক রীতিনীতির আশ্রয় নেওয়ার বদলে ইসায়াহ্র মতো পয়গম্বরগণ দেশবাসীকে ইতিহাসের প্রকৃত ঘটনাপ্রবাহের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিলেন এবং সেগুলোকে ঈশ্বরের সঙ্গে ভীতিকর সংলাপ হিসাবে মেনে নিতে বলেছিলেন।
মোজেসের ঈশ্বর যেখানে বিজয়ের আনন্দে উল্লাসিত ছিলেন, ইসায়াহর ঈশ্বর সেখানে বিষাদময়। ভবিষ্যদ্বাণী, আমরা যেভাবে পাই, শুরু হয়েছে এক শোকবার্তা দিয়ে যেটা চুক্তির মানুষের জন্য দারুণভাবে হতাশাব্যাঞ্জক: ষাঁড় ও গাধা যার যার মনিবকে চেনে, কিন্তু ইসরায়েল জানে না, আমার প্রজাগণ বিবেচনা করে না।[১২] মন্দিরে পশুর উৎসর্গ নিয়ে ইয়াহ্ওয়েহ্ দারুণ বিক্ষুব্ধ, বাছুরের চর্বি দেখে তিনি অসুস্থ বোধ করেন, ছাগলের রক্ত ও পোড়া পশুর ঝরে পড়া রক্ত বিবমিষা জাগায়। ওদের উৎসব, নববর্ষের অনুষ্ঠান ও তীর্থযাত্রা বরদাশত করতে পারেননি তিনি।[১৩] ইসায়াহর শ্রোতারা এতে হতচকিত হয়ে থাকতে পারে: মধ্যপ্রাচ্যে এইসব কাল্টিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল ধর্মের মূল রূপ । পৌত্তলিক দেবতাগণ তাঁদের হ্রাসমান শক্তির নবায়নের জন্যে আনুষ্ঠানিকতার। ওপর নির্ভরশীল ছিলেন; মন্দিরের জাকজমকের ওপর তাদের মর্যাদার অংশ নির্ভর করত। এখন ইয়াহ্ওয়েহ্ বলছেন তার কাছে এসব কর্মকাণ্ড একেবারে অর্থহীন। ওইকুমিনের অন্যান্য সাধু ও দার্শনিকের মতো ইসায়াহ্ উপলব্ধি করেছিলেন যে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা যথেষ্ট নয়। ইসরায়েলিদের অবশ্যই তাদের ধর্মের অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করতে হবে। ইয়াহ্ওয়েহ্ উৎসর্গ নয় বরং সমবেদনা চেয়েছেন:
যদ্যপি অনেক প্রার্থনা কর,
তথাপি শুনিব না;
তোমাদের হস্ত রক্তে পরিপূর্ণ।
তোমরা আপনাদিগকে ধৌত কর, বিশুদ্ধ কর,
আমার নয়নগোচর হইতে তোমাদের ক্রিয়ার দুষ্টতা দূর কর;
কদাচরণ ত্যাগ কর,
সদাচরণ শিক্ষা কর,
ন্যায় বিচারের অনুশীলন কর,
উপদ্রবী লোককে শাসন কর,
পিতৃহীন লোকের বিচার নিষ্পত্তি কর,
বিধবার পক্ষ সমর্থন কর। [১৪]
স্বয়ং পয়গম্বরগণই সমবেদনার প্রবল দায়িত্ববোধ আবিষ্কার করেছিলেন যা পরবর্তীকালে অ্যাক্সিয়াল যুগে বিকশিত সকল প্রধান ধর্মের মূল বৈশিষ্ট্যে পরিণত হবে। এ সময়কালে ওইকুমিনে বিকাশমান নতুন মতবাদসমূহ এই মর্মে জোর দিয়েছে যে, সত্যের পরীক্ষা হচ্ছে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে সাফল্যের সঙ্গে সমন্বিত করা। মন্দিরের আনুষ্ঠানিকতা ও মিথের অপার্থিব জগতে আবদ্ধ হয়ে থাকা যথেষ্ট ছিল না। আলোকপ্রাপ্তির পর পুরুষ বা নারীকে অবশ্যই বাজার এলাকায় ফিরে গিয়ে সকল জীবিত প্রাণীর প্রতি দরদ প্রদর্শনের অনুশীলন করতে হবে।
সিনাইয়ের আমল থেকেই পয়গম্বরদের সামাজিক মতবাদ ইয়াহ্ওয়েহ্র কাল্টে অন্তর্লীন ছিল: এক্সোডাসের কাহিনীতে ঈশ্বর যে নির্যাতিতের পক্ষেই ছিলেন তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পার্থক্য হচ্ছে এবার ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধেই নির্যাতনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। ইসায়াহ্র পয়গম্বরত্ব প্রাপ্তির সময় আরও দুজন পয়গম্বর অরাজক উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যে একই ধরনের বাণীর শিক্ষা দিচ্ছিলেন। প্রথমজনের নাম আমোস যিনি ইসায়াহ্র মতো অভিজাত শ্রেণীর লোক ছিলেন না, বরং রাখাল হিসাবে দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যে বাস করতেন। আনুমানিক ৭৫২ সালে আমোসও আকস্মিকভাবে আদিষ্ট হয়ে উত্তরের ইসরায়েল রাজ্যে ধেয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। ঝড়ের বেগে বেথ এলের প্রাচীন মন্দিরে প্রবেশ করে প্রলয়ের ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা পণ্ড করে দিয়েছিলেন তিনি। বেথ-এলের যাজক আমাযিয়াহ তাড়ানোর প্রয়াস পেয়েছিলেন তাঁকে। অর্বাচীন রাখালকে ভর্ৎসনা করার সময় আমরা তার কণ্ঠে প্রশাসনের কর্তৃত্বের সুর শুনতে পাই। তিনি যেন তাঁকে ভবিষ্যদ্বক্তাদের কোনও সদস্য ধরে নিয়েছিলেন, যারা দলে দলে ঘুরে ভবিষ্যদ্বাণী করে পেট চালায়। ‘হে দর্শক, যিহুদা দেশে পলায়ন কর।’ বিকৃত কণ্ঠে বলেন তিনি। সেই স্থানে রুটি ভোজন কর আর সেই স্থানে ভাববাণী বল। বেথল-এলে আমরা কিন্তু বৈথেলে আর ভাববাণী বলিও না, কেননা এ রাজার পূণ্যধাম ও রাজপুরী। একটুও দমলেন না আমোস, ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে তীব্র ভর্ৎসনার সুরে জবাব দিলেন, তিনি দলীয় পয়গম্বর নন, বরং ইয়াহ্ওয়েহ্র কাছ থেকে সরাসরি ক্ষমতাপ্রাপ্ত: ‘আমি কোনও পয়গম্বর নই, আমি পয়গম্বরদের ভ্রাতুসঙ্ঘের সদস্যও নই। আমি গোপালক ও ডুমুরফল সংগ্রাহক ছিলাম, কিন্তু ইয়াহ্ওয়েহ্ আমাকে ভেড়ার পাল দেখাশোনা থেকে সরিয়ে এনেছেন, এবং ইয়াহ্ওয়েহ্ বলেছেন: ‘যাও, আমার ইসরায়েল জাতিকে ভবিষ্যৎ জানিয়ে দাও।’[১৫] তবে কি বেথ-এলের জনগণ ইয়াহ্ওয়েহ্র বাণী শুনতে রাজি নয়? খুব ভালো, আবার এক দফা বক্তব্য রাখলেন তিনি: ওদের স্ত্রীরা রাস্তায় বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবে, সন্তানদের হত্যা করা হবে এবং ইসরায়েল থেকে বহু দূরে নির্বাসিত অবস্থায় মৃত্যু ঘটবে ওদের।
