ইসায়াহ্ স্থৈর্য ও আনন্দবাহী আলোকনের অভিজ্ঞতা অর্জনকারী বুদ্ধ ছিলেন না। তিনি মানুষের নিখুঁত শিক্ষকে পরিণত হতে পারেননি। উল্টে মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে উঠেছেন, সশব্দে বলে উঠেছেন:
তখন আমি কহিলাম, হায় আমি নষ্ট হইলাম,
কেননা আমি অশুচি-ওষ্ঠাধর মানুষ,
এবং অশুচি-ওষ্ঠাধর জাতির মধ্যে বাস করিতেছি;
আর আমার চক্ষু রাজাকে ইয়াহ্ওয়েহ্ স্যাবোথকে দেখিতে পাইয়াছে।[৩]
ইয়াহ্ওয়েহ্র ছাপিয়ে যাওয়া পবিত্রতায় আক্রান্ত ইসায়াহ কেবল নিজের অসম্পূর্ণতা ও আচরিক অপবিত্রতা সম্পর্কেই সচেতন ছিলেন। বুদ্ধ বা কোনও যোগীর বিপরীতে কিছু সংখ্যক আধ্যাত্মিক অনুশীলনের ভেতর দিয়ে নিজেকে এরকম অভিজ্ঞতার জন্যে প্রস্তুত করেননি তিনি। আচমকা তার কাছে হাজির হয়েছে এটা, এর প্রলয়ঙ্করী প্রভাবে সম্পূর্ণ দিশাহারা হয়ে গেছেন তিনি। জ্বলন্ত কয়লায় টুকরো হাতে এক সেরাফ তাঁর কাছে উড়ে এসে মুখ পবিত্র করে দিল যাতে তিনি তার মুখে ঈশ্বরের বাণী উচ্চারণ করতে পারেন। পয়গম্বরদের অনেকেই ঈশ্বরের পক্ষে কথা বলতে অনিচ্ছুক ছিলেন বা সক্ষম ছিলেন না। ঈশ্বর সকল পয়গম্বরদের আদি সংস্করণ মোজেসকে জ্বলন্ত ঝোঁপ থেকে ডেকে ইসরায়েলের সন্তানের কাছে তার বার্তাবাহক হওয়ার নির্দেশ দিলে মোজেস এই বলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন যে, তিনি ‘জড় মুখ ও জড় বিত্তের। এই অপরাগতার জন্যে ছাড় দিয়েছেন ঈশ্বর, তাঁর ভাই আরনকে মোজেসের পক্ষে কথা বলার অনুমতি দিয়েছেন। পয়গম্বরদের জীবন-কাহিনীর এই সাধারণ মোটিফটি ঈশ্বরের ভাষায় কথা বলার সমস্যাকেই প্রতীকায়িত করে। পয়গম্বরগণ স্বর্গীয় বার্তা ঘোষণায় আগ্রহী ছিলেন না; প্রবল চাপ ও কষ্টের মিশন গ্রহণে অনিচ্ছুক ছিলেন তারা। ইসরায়েলের ঈশ্বরের এক দুৰ্জ্জেয় শক্তিতে রূপান্তর শান্ত, অচঞ্চল প্রক্রিয়া ছিল না, বরং কষ্ট ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তা অর্জন করতে হয়েছে।
হিন্দুরা কখনও তাদের ব্রহ্মাকে মহান রাজা বলে আখ্যায়িত করেনি, কারণ তাদের ঈশ্বরকে এরকম মানবীয় পরিভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। ইসায়াহ্র দিব্যদর্শনের কাহিনীটিকে আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা না করার জন্য আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে: এটা বর্ণনাতীতকে বর্ণনার একটা প্রয়াস মাত্র। ইসায়াহ্ নিজের অজান্তেই মানুষের কাছে আপন অভিজ্ঞতার খানিকটা ধারণা দিতে তাঁর দেশের জনগণের পৌরাণিক ঐতিহ্য ফিরে নিয়েছেন। শ্লোকসমূহে (Psalms) প্রায়শঃই ইয়াহ্ওয়েহ্কে সিংহাসনে আসীন রাজা হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে, ঠিক তাদের প্রতিবেশীদের দেবতা বাআল, মারদুক ও দাগনের মতো, প্রায় একই ধরনের মন্দিরে রাজা হিসাবে যাদের অধিষ্ঠান ছিল। অবশ্য পৌরাণিক ইমেজারির আড়ালে ইসরায়েলে পরম সত্তা সম্পর্কিত এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ধারণা উঠে আসছিল। এই ঈশ্বরের অভিজ্ঞতা হচ্ছে ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ। ভীতিকর ভিন্নতা সত্ত্বেও ইয়াহ্ওয়েহ্ ইসায়াহ্র সঙ্গে কথা বলতে পারেন, ইসায়াহ্ও জবাব দেন। কিন্তু উপনিষদের সাধুদের কাছে এটা অবিশ্বাস্য ঠেকত, কেননা ব্রাহ্মণ আত্মার সঙ্গে কথোপকথন বা সাক্ষাতের ধারণা অসঙ্গতভাবে মানবীয়।
ইয়াহ্ওয়েহ্ জিজ্ঞেস করলেন: ‘আমি কাকে পাঠাব? কে আমাদের বার্তাবাহক হবে?’ অতীতের মোজেসের মতো ইসায়াহ্ ঝটপট জবাব দিলেন: ‘আমি উপস্থিত (হিনেনি), আমাকে পাঠান!’ এই দর্শনের মূল কথা পয়গম্বরকে আলোকিত করা নয় বরং তাকে একটা নির্দিষ্ট কাজের দায়িত্ব দেওয়া। প্রাথমিকভাবে পয়গম্বর তিনি যিনি ঈশ্বরের সান্নিধ্যে যান, কিন্তু দুয়ের এই অভিজ্ঞতা-বোধ বৌদ্ধমতবাদের মতো জ্ঞান দান করে না বরং দায়িত্ব সৃষ্টি করে । পয়গম্বর অতিন্দ্রীয় আলোকনের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হবেন না বরং আনুগত্যের স্বাক্ষর রাখবেন। এটা প্রত্যাশা করাই স্বাভাবিক যে, বার্তা কখনও সহজ নয়। প্রচলিত সেমিটিক প্যারাডক্সের মাধ্যমে ইয়াহ্ওয়েহ্কে ইসায়াহকে বলেছেন যে মানুষ একে গ্রহণ করবে নাঃ তারা ঈশ্বরের বাণীকে প্রত্যাখ্যান করলে তিনি যেন হতাশ না হন: তুমি যাও, ওই জাতিকে বল, তোমরা শুনিতে থাকিও, কিন্তু বুঝিও না; এবং দেখিতে থাকিও, কিন্তু জানিও না।[৬] সাত শত বছর পর মানুষকে একই রকম কঠিন বার্তা প্রত্যাখ্যান করতে দেখে জেসাসও এই কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করেন। খাঁটি সত্যকে মানব জাতি ধারণ করতে পারে না। ইসায়াহর আমলের ইসরায়েলিরা সংঘাত ও বিলুপ্তির উপান্তে অবস্থান করছিল। ইয়াহ্ওয়েহ্ তাদের কোনও সুসংবাদ দেননিঃ তাদের শহরগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে, গ্রামগুলো বিধ্বস্ত হবে, জনশূন্য হয়ে পড়বে ঘরবাড়ি। ৭২২ সালে উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যের ধ্বংস ও দশটি গোত্রের বিতাড়ন প্রত্যক্ষ করার জন্য বেঁচে ছিলেন ইসায়াহ্। ৭০১ সালে সেন্নাচেরি এক বিশাল আসিরিয় সেনাবাহিনী নিয়ে জুদাহয় হামলা চালান, এখানকার ছিচল্লিশটি নগরী ও দুর্গ অবরোধ করেন; শূলে চড়িয়ে হত্যা করেন প্রতিরোধকারী কর্মকর্তাদের, দেশছাড়া করেন : ২০০০ মানুষকে এবং জেরুজালেমে ইহুদি রাজাকে ‘খাঁচায় বন্দি পাখির মতো’[৮] আটক করেন। এসব আসন্ন বিপর্যয় সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক করার পুরস্কারহীন দায়িত্ব পেয়েছিলেন ইসায়াহ্:
