নিঃসঙ্গতা ছিল পয়গম্বরের মূল বৈশিষ্ট্য। আমোসের মতো ব্যক্তিরা ছিলেন একাকী; অতীতের ছন্দ ও কর্তব্যের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটেছিল তাঁর। এটা তার বেছে নেওয়া কিছু ছিল না, তার ওপর আরোপিত হয়েছে। মনে হয় যেন চেতনার স্বাভাবিক প্যাটার্ন থেকে সহসা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল তাঁকে, ফলে স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ আর বজায় রাখতে পারছিলেন না। চান বা না চান জোর করে তাকে পয়গম্বর হতে বাধ্য করা হয়েছে। আমোস যেমন বলেছেন:
সিংহ গর্জন করিল, কে না ভয় করিবে?
প্রভু ইয়াহ্ওয়েহ্ কথা কহিলেন, কে না ভাববাণী বলিবে?[১৬]
বুদ্ধের মতো নির্বাণের সত্তাহীন বিলুপ্তিতে হারিয়ে যাননি আমোস; পরিবর্তে ইয়াহ্ওয়েহ্ তার অহমের স্থান দখল করে তাকে ভিন্ন জগতে টেনে নিয়েছেন। পয়গম্বরদের মাঝে আমোসই প্রথম সামাজিক ন্যায়বিচার ও সহানুভূতির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। বুদ্ধের মতো তিনিও মানুষের দুঃখকষ্ট সম্পর্কে তীব্রভাবে সচেতন ছিলেন। আমোসের ভবিষ্যদ্বাণীর মাঝে নির্যাতিতের পক্ষে কথা বলছিলেন ইয়াহ্ওয়েহ্, দরিদ্রদের, ভাষাহীনদের অক্ষমতাকে ভাষা দিয়েছেন। আমরা যেভাবে পাই, তার ভবিষ্যদ্বাণীর একেবারে প্রথম লাইনেই ইয়াহ্ওয়েহ্ জেরুজালেমে তার মন্দির থেকে জুদাহ্ ও ইসরায়েলসহ নিকট প্রাচ্যের সবগুলো দেশের দুঃখকষ্টের কথা ভেবে তীব্র রোষে গর্জন করছেন। ইসরায়েলের জনগণ গোয়িম (goyim) অর্থাৎ জেন্টাইল (বা অ-ইহুদিদের মতোই খারাপ: তারা হয়তো দরিদ্রের ওপর নিষ্ঠুরতা ও তাদের নির্যাতনকে অগ্রাহ্য করতে পারে, কিন্তু ইয়াহ্ওয়েহ্ তা পারেন না। প্রতিটি প্রতারণা, শোষণ ও বঞ্চনার দারুণ নজীর লক্ষ করছেন তিনিঃ ইয়াহ্ওয়েহ্ যাকবের মহিমাস্থলের নাম লইয়া শপথ করিয়াছেন: ‘নিশ্চয়ই ইহাদের কোনও ক্রিয়া আমি কখনও ভুলিয়া যাইব না।’[১৭] প্রভুর শেষ বিচারের আকাক্ষা করার মতো কী হঠকারী তারা, যেদিন ইয়াহ্ওয়েহ্ ইসরায়েলকে আনন্দিত করবেন আর অপমানিত করবেন গোয়িমদের? ওদের জন্যে একটা বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে: ‘ইয়াহ্ওয়েহ্র দিন তোমাদের কি করিবে? তাহা অন্ধকার, আলোক নহে।’[১৮] ওরা কী নিজেদের ঈশ্বরের মনোনীত জাতি ভেবেছে? আসলে চুক্তির (Covenant) প্রকৃতি উপলব্ধি করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে তারা, যার অর্থ দায়িত্ব, সুবিধা নয়: ‘হে ইসরায়েল-সন্তানগণ, তোমরা এই বাক্য শুন, যাহা তোমাদের বিরুদ্ধে ইয়াহ্ওয়েহ্ বলিয়াছেন। চিৎকার করে বলেছেন আমোস, ‘আমি মিশর দেশ হইতে যাহাকে বাহির করিয়া আনিয়াছি সেই সমস্ত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে [বলিয়াছি] :
‘আমি পৃথিবীস্থ সমস্ত গোষ্ঠীর মধ্যে তোমাদেরই পরিচয় লইয়াছি এইজন্য তোমাদের সমস্ত অপরাধ ধরিয়া তোমাদিগকে প্রতিফল দিব।’[১৯]
চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েলের সকল মানুষ ঈশ্বরের নির্বাচিত এবং সে কারণে ভালো আচরণ পাবার দাবিদার। ঈশ্বর কেবল ইসরায়েলকে মহত্ব দান করার জন্যেই ইতিহাসে হস্তক্ষেপ করেন না, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই তার উদ্দেশ্য। ইতিহাসে এটাই তাঁর স্বার্থ, প্রয়োজনে তিনি আপনভূমিতে ন্যায়বিচার স্থাপন করার জন্যে আসিরিয় সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করবেন।
এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, অধিকাংশ ইসরায়েলি ইয়াহ্ওয়েহ্র সঙ্গে সংলাপে লিপ্ত হতে পয়গম্বরের আহ্বানে সাড়া দিতে রাজি হয়নি। জেরুজালেম মন্দির বা কানানের প্রাচীন উর্বরতার দেবীদের স্বল্প চাহিদাসম্পন্ন ধর্ম পছন্দ ছিল তাদের। এভাবেই চলে আসছে: সংখ্যালঘুরা সহমর্মিতার ধর্ম অনুসরণ করে; অধিকাংশ ধার্মিক ব্যক্তিই সিনাগগ, চার্চ, মন্দির আর মসজিদে জাঁকজমকপূর্ণ উপাসনা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে। প্রাচীন কানানিয় ধর্মগুলো তখনও ইসরায়েলে বিকশিত হচ্ছিল। দশম শতকে রাজা প্রথম জেরোম ডান ও বেথ এলের স্যাঙ্কচুয়ারিতে দুটো কাল্টিক সঁড় স্থাপন করেছিলেন। দুই শত বছর পরও ইসরায়েলিরা সেখানে উর্বরতা বৃদ্ধির আচার ও পবিত্র যৌনতায় অংশ নিয়েছে, আমোসের সমসাময়িক পয়গম্বর হোসেয়ার ভবিষ্যদ্বাণীতে যেমনটি আমরা দেখতে পাই। ইসরায়েলিদের কেউ কেউ অন্যান্য দেবতার মতো ইয়াহ্ওয়েহ্রও স্ত্রী আছে ভেবেছিল মনে হয়: প্রত্নতাত্ত্বিকগণ সম্প্রতি ‘ইয়াহ্ওয়েহ্ ও তার আশেরাহর উদ্দেশে নিবেদিত’ খোদাইলিপি আবিষ্কার করেছেন। বাআলের মতো দেবতাদের উপাসনা করে ইসরায়েল চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করছে দেখে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন হোসেয়া। সকল নতুন পয়গম্বরের মতো তিনিও ধর্মের অন্তর্নিহিত অর্থ নিয়ে ভাবিত ছিলেন। যেমন ইয়াহ্ওয়েহ্কে দিয়ে তিনি বলিয়েছেন: আমি দয়াই (hesed) চাই, বলিদান নয়; এবং হত্যাযজ্ঞ অপেক্ষা ঈশ্বর বিষয়ক জ্ঞান [daath Elohim].[২১]। ধর্মতত্তীয় জ্ঞানের কথা বোঝাননি তিনিঃ daath শব্দটি এসেছে হিব্রু ক্রিয়াপদ yada: জানা থেকে, যার যৌন দ্যোতনা রয়েছে। এভাবে ‘J’ বলেছেন আদম তার স্ত্রী ইভকে জানতেন।[২২] প্রাচীন কানানিয় ধর্মে বাআল মাটিকে বিয়ে করেছিলেন, মানুষ আচরিক যৌনমিলনের মাধ্যমে এর উদযাপন করত; কিন্তু হোসেয়া জোর দিয়ে বললেন যে, চুক্তির পর থেকে ইয়াহ্ওয়েহ্ বাআলের স্থান। গ্রহণ করেছেন এবং ইসরায়েলের জনগণের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। ওদের বুঝতে হবে যে বাআল নন, ইয়াহ্ওয়েহ্ই মাটিতে প্রাণের সঞ্চার করবেন।[২৩] তখনও একজন প্রেমিকের মতো ইসরায়েলকে তোয়াজ করছিলেন তিনি, তাকে কুসংস্কার বাআলের কাছ থেকে ফিরিয়ে আনতে প্রলুব্ধ। করতে বদ্ধপরিকর:
