সুতরাং অ্যাক্সিয়াল যুগের নয়া মতবাদগুলোয় একটা সাধারণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল যে, মানুষের জীবনে অত্যাবশ্যকীয় এক দুয়ে উপাদান রয়েছে। আমাদের আলোচনায় বিভিন্ন পণ্ডিতগণ এই দুয়েকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠার বেলায় নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে একে গুরুত্বপূর্ণ বলে মেনে নিয়েছেন সকলেই। তাঁরা প্রাচীন মিথলজিগুলোকে পুরোপুরি বাতিল করে দেননি, বরং নতুন করে ব্যাখ্যা করেছেন; মানুষকে সেগুলো ছাড়িয়ে যেতে সাহায্য করেছেন। একই সময় এইসব অতি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদসমূহ যখন গড়ে উঠছিল, ইসরায়েলের পয়গম্বরগণ তখন পরিবর্তিত অবস্থার চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য গড়ে তুলছিলেন যার পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত ইয়াহ্ওয়েহ্ একমাত্র ঈশ্বরে পরিণত হন। কিন্তু এই ক্ষেপাটে ইয়াহ্ওয়েহ্ কীভাবে অন্যান্য উচ্চমার্গীয় দর্শনের সঙ্গে মানিয়ে উঠবেন?
০২. এক ঈশ্বর
বিসিই ৭৪২ সালে জুদাইন রাজ পরিবারের একজন সদস্য দিব্যদৃষ্টিতে জেরুজালেমে বাদশাহ সলোমন কর্তৃক নির্মিত মন্দিরে অবস্থানরত ইয়াহ্ওয়েহ্কে দেখতে পান। ইসরায়েলের জনগণের এক উদ্বেগময় সময় ছিল সেটা। সে বছর জুদাহ্র রাজা উযিয়াহ্ মারা যান এবং তার ছেলে আহায় সিংহাসনে আরোহন করেন। প্রজাদের ইয়াহ্ওয়েহ্র পাশাপাশি পৌত্তলিক দেবতাদেরও উপাসনা করার জন্যে উৎসাহিত করেন তিনি। উত্তরাঞ্চলীয় ইসরায়েল রাজ্যে তখন প্রবল অরাজক-প্রায় অবস্থা চলছে: রাজা দ্বিতীয় জেরোবম-এর মৃত্যুর পর ৭৪৬ থেকে ৭৩২ সময় কালে পাঁচ পাঁচজন রাজা সিংহাসনে আরোহন করেছিলেন, এদিকে আসিরিয়ার রাজা তৃতীয় তিগলেদ পিলসার বুভুক্ষের মতো তাদের ভূখণ্ডের দিকে তাকিয়েছিলেন, ওই অঞ্চলটিকে নিজের ক্রমপ্রসারমান সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত করতে উদগ্রীব ছিলেন তিনি। ৭২২ সালে তার উত্তরাধিকারী রাজা দ্বিতীয় সারগন উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য দখল করে অধিবাসীদের বিতাড়িত করেন: ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় দশটি গোত্র একীভূত হতে বাধ্য হয় এবং ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায়। ওদিকে ক্ষুদ্র জুদাহ রাজ্যটি আপন অস্তিত্ব নিয়ে ছিল শঙ্কিত। রাজা উযিয়াহর মৃত্যুর অল্প দিন পরে মন্দিরে প্রার্থনা করার সময় ইসায়াহ্ সম্ভবত প্রবল বিষণ্ণতায় ভুগছিলেন; এবং একই সময় সম্ভবত অস্বস্তির সঙ্গে বিলাসবহুল মন্দিরে আনুষ্ঠানিকতার অসামঞ্জস্যতা সম্পর্কে সজাগ ছিলেন। ইসায়াহ্ হয়তো শাসক শ্রেণীর সদস্য ছিলেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল জনমুখী ও গণতান্ত্রিক, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্দশা নিয়ে দারুণভাবে চিন্তিত ছিলেন তিনি। পবিত্র মন্দিরের সামনের স্যাঙ্কচুয়্যারি যখন সুগন্ধি ধুপের ধোঁয়ায় ভরে উঠত ও উৎসর্গের প্রাণীর রক্তের উৎকট গন্ধে ভরে যেত তিনি হয়তো তখন ইসরায়েলের ধর্ম অখণ্ডতা ও অন্তর্নিহিত অর্থ হারিয়ে ফেলেছে ভেবে শঙ্কিত বোধ করছিলেন।
সহসা তিনি যেন দেখতে পেলেন, স্বর্গীয় প্রাসাদের প্রতিরূপ মন্দিরের ঠিক ছাদ বরাবর স্বর্গীয় সিংহাসনে বসে আছেন ইয়াহ্ওয়েহ্। ইয়াহ্ওয়েহ্র আলখেল্লাহ স্যাঙ্কচুয়ারি পরিপূর্ণ করে ফেলেছে, দুজন সেরাফ তার সেবা করছিল, ইয়াহ্ওয়েহ্ মুখের দিকে যেন না তাকাতে হয় তাই ডানা দিয়ে মুখ আড়াল করে রেখেছে তারা। সমবেত কণ্ঠে পরস্পরের উদ্দেশে চেঁচাচ্ছে তারা: ‘পবিত্র! পবিত্র! ইয়াহ্ওয়েহ্ স্যাবোথ পবিত্র। তার প্রতাপ গোটা পৃথিবীকে পূর্ণ করেছে।’[১] ওদের কণ্ঠস্বরে গোটা মন্দির যেন ভিত্তিমূলসহ কাঁপছে বলে মনে হতে লাগল, ধোঁয়ায় ভরে গেল পুরো জায়গা, নিশ্চিদ্র মেঘের মতো ঢেকে ফেলল ইয়াহ্ওয়েহ্কে, সিনাই পর্বতে যেমন মেঘ আর ধোঁয়া মোজেসের কাছ থেকে আড়াল করেছিল তাঁকে। বর্তমানে আমরা ‘পবিত্র’ শব্দটি ব্যবহার করার সময় সাধারণভাবে নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের কথা বুঝিয়ে থাকি। কিন্তু হিব্রু কাদ্দোশ এর সঙ্গে নৈতিকতার কোনও সম্পর্ক নেই, এটা ‘ভিন্নতা’ (otherness), চরম ভিন্নতা বোঝায়। সিনাই পর্বতে ইয়াহ্ওয়েহ্র আবির্ভাব মানুষ ও স্বর্গীয় জগতের মাঝে আকস্মিক সৃষ্ট বিশাল দূরত্ব তুলে ধরেছিল। এযাত্রা সেরাফরা চিৎকার করে বলেছিল: ইয়াহ্ওয়েহ্ আলাদা আলাদা! আলাদা!’ সময়ে সময়ে নারী-পুরুষকে বিস্ময় ও আতঙ্কে ভরিয়ে তোলা ঐশ্বরিক অনুভূতির (numinous) অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন ইসায়াহ্। রুডল্ফ অটো তার ক্লাসিক গ্রন্থ দ্য আইডিয়া অভ হোলিতে দুয়ে সত্তার আতঙ্কময় উপলব্ধিকে মিস্টেরিয়াম টেরিবল এত ফ্যাসিনান্স বলে বর্ণনা করেছেন: এটা ভয়ঙ্কর, কেননা এমন গভীর ধাক্কার মতো আমাদের কাছে আসে যার ফলে আমরা স্বাভাবিক অবস্থার সান্ত্বনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি; এবং ফ্যাসিন্যান্স, কারণ বিপরীতে এটা এক ধরনের অদম্য আকর্ষণের সৃষ্টি করে। এই সর্বগ্রাসী অভিজ্ঞতার কোনও যুক্তি নেই, যার সঙ্গে অটো সঙ্গীত বা যৌনতার তুলনা করেছেন: এর সৃষ্ট আবেগ ভাষা বা ধারণা দিয়ে পুরোপুরিভাবে প্রকাশ করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে ‘সম্পূর্ণ’ ভিন্ন-এর অনুভূতির ‘অস্তিত্ব’ আছে, এটাও বলা যাবে না, কারণ আমাদের স্বাভাবিক বাস্তবতার জগতে এর কোনও স্থান নেই।[২] অ্যাক্সিয়াল যুগের নতুন ইয়াহ্ওয়েহ্ তখনও যোদ্ধাদের দেবতা স্যাবোথ ছিলেন, কিন্তু স্রেফ একজন যুদ্ধ দেবতা ছিলেন না; আবার কোনও গোত্রীয় উপাস্যও ছিলেন না তিনি, যিনি চরমভাবে ইসরায়েলের পক্ষে তার প্রতাপ ও প্রতিশ্রুত ভূমির সীমানায় আবদ্ধ ছিলেন না, বরং গোটা পৃথিবীকে পূর্ণ করে তুলেছিলেন।
