আমরা দেখেছি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনসংখ্যার নিরানব্বই ভাগই ঈশ্বরে বিশ্বাস করার দাবি করে, তা সত্ত্বেও মৌলবাদ, প্রলয়বাদ ও ধর্মপরায়ণতার চকিত ক্যারিশম্যাটিক ধরণ আমেরিকায় আশ্বাসের সৃষ্টি করতে পারছে না। অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি, মাদকসক্তি ও মৃত্যুদণ্ডের পুনর্বহাল আধ্যাত্মিক দিক থেকে সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়। ইউরোপে মানবীয় চেতনায় এক কালে যেখানে ঈশ্বরের অবস্থান ছিল সেখানে আজ ক্রমবর্ধমান শূন্যতা। এই বিরস নৈঃসঙ্গ যারা প্রকাশ করেছেন তাঁদের মধ্যে প্রধানতম হচ্ছেন-নিৎশের বীরত্বপূর্ণ নাস্তিক্যবাদ হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষায়-টমাস হার্ডি। বিংশ শতাব্দীর সূচনায়, ১৯০০ সালের ৩০ ডিসেম্বর রচিত দ্য ডার্কলিং থ্রাশ-এ তিনি জীবনের অর্থময়তার বিশ্বাস সৃষ্টিতে অক্ষম হয়ে ওঠা চেতনার মৃত্যুর কথা প্রকাশ করেছেন:
তুষার যখন ভূতূড়ে ধূসর
আর শীতের শেষ যখন
দিনের দুর্বল চোখকে
অস্থির করে তোলে,
তখন ঝোঁপের কোণে ঠেস দিই ।
লতাগুল্মের প্যাঁচানো ডাল
ভাঙা তারের মতো উঠে
গেছে আকাশ পানে
এবং মানুষগুলো সব যারা
ভয় পেয়ে গিয়েছিল যার যার
বাড়ির আগুন খুঁজে নিয়েছে।
জমিনের তীক্ষ্ণ চেহারা যেন
শতাব্দীর ঝড়ে থাকা নিঃসর্গ
মেঘলা আকাশ তার
শবাধার, হাওয়া তার
মরণ-বিলাপ।
প্রাচীন ক্রন্দন শুষ্ক
কঠিন, চুপসে গেছে,
আর জগতের প্রতিটি
আত্মা যেন আমারই মতো
অনুকম্পাহীন।
নিমেষে মাথার ওপরের
বিষণ্ণ ডালপালায় জেগে ওঠে কণ্ঠস্বর,
অনেকের মনকাড়া
সীমাহীন প্রার্থনা সঙ্গীতের
এক প্রাচীন ধাক্কা, নাজুক, শুষ্ক, ক্ষুদ্র,
হাওয়ায় আলোড়িত জলে,
এমনি করে আমাকে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে।
এমন পরমানন্দের শব্দের
জন্যে গান গাইবার সামান্যই কারণ
লিখা আছে পার্থিব বস্তুতে,
বহু দূরে বা খুব কাছে,
তার প্রফুল্ল রাতের হাওয়ায়
ভেসে যাওয়ার কথা ভাবতে পারি,
কোনও আশীর্বাদপ্রাপ্ত আশা, যার
কথা সে জানে, কিন্তু
জানি না আমি।
মানুষ শূন্যতা ও নৈঃসঙ্গ সহ্য করতে পারে না; তারা অর্থবহতার নতুন কেন্দ্র সৃষ্টি করে শূন্যতা পূরণ করবে। মৌলবাদের প্রতিমাসমূহ ঈশ্বরের সঠিক বিকল্প নয়; আমরা একবিংশ শতাব্দীর জন্যে নতুন প্রাণবন্ত বিশ্বাস সৃষ্টি করতে চাইলে আমাদের সম্ভবত উচিত হবে শিক্ষা ও সতর্কতার স্বার্থে ঈশ্বরের ইতিহাস নিয়ে ভাবা ।
১২. নির্ঘন্ট / তথ্যসূত্র
আলম আল-মিথাল (আরবী): খাঁটি ইমেজের জগৎ: কল্পনার আদি আদর্শ জগৎ যা মুসলিম অতিন্দ্রীয়বাদী ও ধ্যানবাদী দার্শনিকদের ঈশ্বরের দিকে চালিত করে।
আলেম (আরবী): মুসলিম যাজক।
অ্যাপাথিয়া (গ্রিক): নিস্পৃহতা, অবিচলতা ও অনাক্রান্ত। গ্রিক দার্শনিকদের ঈশ্বরের এসব বৈশিষ্ট্য ক্রিশ্চানদের ঈশ্বর ধারণার মূল বিষয়ে পরিণত হয়েছিল, যাকে কষ্ট ও পরিবর্তনের অতীত মনে করা হতো।
অ্যাপোফ্যাটিক (গ্রিক): নীরব। গ্রিক ক্রিশ্চানরা এই বিশ্বাসে উপনীত হয়েছিল যে, ঈশ্বরের অনিবৰ্চনীয়তার রহস্যের প্রতি জোর দেওয়ার জন্যে সকল ধর্মতত্ত্বে নীরবতা, বৈপরীত্য ও সংযম থাকা প্রয়োজন।
আৰ্চেটাইপ: আমাদের জগতের মূল নকশা বা আদি রূপ, যাকে প্রাচীন দেবতাদের ঐশী জগতের অনুরূপ বলে মনে করা হয়েছে। পৌত্তলিক জগতে পৃথিবীতে দৃশ্যমান সমস্ত কিছুকে ঊর্ধ্বাকাশের কোনও বস্তুর প্রতিরূপ হিসাবে দেখা হয়েছে। আলাম আল-মিথালও দেখুন।
অ্যাশকেনাযিম (Allemague’এর হিব্রু অপভ্রংশ): জার্মানি ও পূর্ব পশ্চিম। ইউরোপের কিছু অংশের ইহুদি।
আত্মা (হিন্দি): ব্রহ্মার পবিত্র শক্তি, যা প্রত্যেকে নিজের মাঝে অনুভব করে।
অবতার: হিন্দু মিথ অনুযায়ী মানবরূপে ঈশ্বরের মর্ত্যে আগমন। সাধারণভাবে। ঈশ্বরের মানব রূপধারী বিবেচিত কোনও ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়।
অ্যাক্সিয়াল এজ: ৮০০-২০০ বিসিই সময়কালকে বোঝাতে ইতিহাসবিদরা এই শব্দ-বন্ধটি ব্যবহার করেন, এক ক্রান্তিকাল যখন সভ্য জগতে বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলো আবির্ভূত হয়েছিল।
আয়াত (বহুবচনে আয়া) (আরবী): নিদর্শন, উদাহরণ। কোরানে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রকাশ।
বানাত-আল্লাহ (আরবী): ঈশ্বরের কন্যাগণ; কোরানে এই শব্দ-বন্ধটি তিন প্যাগান দেবী আল-লাত, আল-উযযা ও মানাতের প্রতি ইঙ্গিত করেছে।
বাকা (আরবী): ভাবাবেশে ঈশ্বরে বিলীন (ফানা) হওয়ার পর সূফী অতিন্দ্রীয়বাদীর পরিবর্ধিত উন্নত সত্তায় প্রত্যাবর্তন।
বাতিন (আরবী): কোরানের অন্তর্গত অর্থ। বাতিনি এমন একজন মুসলিম যিনি ধর্মের নিগূঢ় অতিন্দ্রীয়বাদী উপলব্ধির দিকে নিজেকে নিবেদিত করেন।
ভক্তি (হিন্দী): ব্যক্তি বুদ্ধ কিংবা মানবরূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হিন্দু-দেবতার প্রতি শ্রদ্ধা।
বোধিসত্তা (হিন্দী): হবু বুদ্ধ। যারা দুঃখেকষ্টে নিমজ্জিত অনালোকিত মানুষকে পথ দেখানো ও রক্ষার জন্যে ব্যক্তিগত নির্বাণ বিলম্বিত করে থাকেন।
ব্রহ্মা : হিন্দু মতে, যে পবিত্র শক্তি সকল বস্তুর অস্তিত্ব নিশ্চিত করে, অস্তিত্বের অন্তর্গত অর্থ।
ব্রেকিং অভ দ্য ভেসেলস: ইসাক লুরিয়ার কাব্বালিজমের পরিভাষা, যা আদি বিপর্যয়ের বর্ণনা দেয় যখন স্বর্গীয় আলোর স্ফুলিঙ্গ পৃথিবীতে এসে বস্তুতে আটকা পড়ে গিয়েছিল।
