অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বরকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসবে দেখা যেতে পারে। অতিন্দ্রীয়বাদীরা বহু আগে থেকেই জোর দিয়ে এসেছে যে, ঈশ্বর আরেকটি ‘সত্তা’ নন, তারা দাবি করেছে, আসলে তার অস্তিত্ব নেই এবং তাকে কিছু না বলে ডাকাই শ্রেয়। এই ঈশ্বর আমাদের সেকুলার সমাজের পরম সত্তার অসম্পূর্ণ ইমেজের প্রতি অবিশ্বাসের প্রেক্ষিতে নাস্তিক্যবাদী মনোভাবের সঙ্গে মানানসই। ঈশ্বরকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রকাশযোগ্য বস্তুগত সত্য হিসাবে দেখার বদলে অতিন্দ্রীয়বাদীরা দাবি করেছে যে, তিনি সত্তার গভীরে রহস্যজনকভাবে অনুভূত অন্তরের অনুভূতি। কল্পনার মাধ্যমে এই ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হতে হবে এবং জীবনের রহস্য, সৌন্দর্য ও মূল্য ধরে শিল্পকলার কোনও ধরণ হিসাবে দেখা যেতে পারে। অতিন্দ্রীয়বাদীরা ধারণাতীত এই সত্তাকে প্রকাশ করার জন্যে সঙ্গীত, নৃত্য, কবিতা, কাহিনী, গল্প, চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যকলার ব্যবহার করেছে। অবশ্য সকল শিল্পকর্মের মতো। অতিন্দ্রীয়বাদে বুদ্ধিমত্তা, শৃঙ্খলা ও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন যা অসংযত আবেগ ও অভিক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রহরা হিসাবে কাজ করে। অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বর নারীবাদীদেরও তুষ্ট করতে পারেন, কেননা সুফী ও কাব্বালিস্ট, উভয়ই দীর্ঘদিন ধরে ঈশ্বরে নারী উপাদানের বৈশিষ্ট্য যোগ করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে।
অবশ্য এর দুর্বলতাও আছে। শ্যাব্বেতাই যেভি বিপর্যয় ও পরবর্তী কালের সুফীবাদের পতনের পর বহু ইহুদি ও মুসলিম অতিন্দ্রীয়বাদকে সন্দেহের চোখে দেখে আসছে। পশ্চিমে অতিন্দ্রীয়বাদ কখনওই ধর্মীয় উদ্দীপনার প্রধান স্রোতধারা হয়ে ওঠেনি। প্রটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক সংস্কারকগণ হয় একে বেআইনী ঘোষণা করেছেন নয়তো প্রান্তিকায়িত করেছেন; বৈজ্ঞানিক যুক্তির কাল এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি উৎসাহিত করেনি। ১৯৬০-এর দশকের পর থেকে যোগ মেডিটেশন ও বৌদ্ধধর্ম মতে আগ্রহের ভেতর দিয়ে অতিন্দ্রীয়বাদের প্রতি নতুন করে উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই পদ্ধতি আমাদের বস্তুনিষ্ঠ গবেষণামূলক মানসিকতার সঙ্গে সহজে খাপ খায় না। অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বর সহজবোধ্য নন। এর জন্যে অভিজ্ঞজনের অধীনে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও যথেষ্ট সময় ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। ঈশ্বর নামে পরিচিত সত্তার (অনেককেই এর কোনও নাম দিতে অস্বীকার করেছে) বোধ লাভের জন্যে অতিন্দ্রীয়বাদীদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। অতিন্দ্রীয়বাদীরা প্রায়শঃই জোর দিয়ে বলেছে, মানুষকে। শিল্পকর্মের অন্যান্য ক্ষেত্র সৃষ্টির জন্যে যেমন মনোনিবেশ প্রয়োজন হয় ঠিক সেরকমভাবে নিজেদের জন্যে ঈশ্বরের অনুভূতি সৃষ্টি করতে হবে। এটা আশুতোষ ফাস্ট ফুড ও চকিত যোগাযোগে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা একটা সমাজের মানুষের মনে আবেদন সৃষ্টি করার মতো নয়। অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বর তৈরি অবস্থায় মোড়কায়িত হয়ে হাজির হন না। কোনও রিভাইভালিস্ট প্রচার সৃষ্ট চকিত আনন্দের মতো তিনি অনুভূত হবেন না, এ ধরনের প্রচারকরা অতি দ্রুত গোটা দর্শকগোষ্ঠীকে হাততালি ও গুঞ্জন শুরু করতে উৎসাহিত করে তোলেন।
কিছু কিছু অতিন্দ্রীয়বাদী প্রবণতা অর্জন সম্ভব। আমরা যদি অতিন্দ্রীয়বাদীর মতো চৈতন্যের উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছতে নাও পারি, অন্তত এটা তো শিখতে পারব যে, ঈশ্বর, উদাহরণস্বরূপ, কোনও সাধারণ অর্থে অস্তি তুমান নন, কিংবা খোদ ‘ঈশ্বর’ শব্দটি স্রেফ এক সত্তার প্রতীক যিনি অনির্বচনীয়ভাবে একে অতিক্রম করে যান। অতিন্দ্রীয়বাদী অজ্ঞাবাদ আমাদের গোঁড়া নিশ্চয়তার সঙ্গে এসব জটিল বিষয়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রবণতা দূর করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে । কিন্তু এসব ধারণা যদি হৃদয়ঙ্গম করা না হয়। এবং ব্যক্তিগতভাবে উপলব্ধি করা না হয় তাহলে এগুলোকে অর্থহীন বিমূর্ত মনে হবে। ধার করা অতিন্দ্রীয়বাদ মূল কবিতা পাঠের বদলে সমালোচকের ব্যাখ্যা পড়ার মতো অসন্তোষজনক ঠেকতে পারে। আমরা দেখেছি, অতিন্দ্রীয়বাদকে প্রায়ই নিগূঢ় শাস্ত্র হিসাবে দেখা হয়েছে, সেটা অতিন্দ্রীয়বাদীরা অশ্লীল গোষ্ঠীকে বাদ দিতে চেয়েছে বলে নয় বরং এসব সত্য কেবল বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর মনের উপলব্ধির অংশ দিয়েই অনুধাবন করা সম্ভব বলে। এই বিশেষ পদ্ধতিতে অগ্রসর হলে এগুলোকে ভিন্ন অর্থবোধক বলে মনে হয় যা মনের যৌক্তিক অংশের কাছে বোধগম্য নয়।
ইসরায়েলের পয়গম্বরগণ তাঁদের ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে ঈশ্বরের প্রতি আরোপ করতে শুরু করার পর থেকেই একেশ্বরবাদীরা এক অর্থে তাদের নিজস্ব ঈশ্বর সৃষ্টি করে নিয়েছিল। ঈশ্বরকে খুব কমই অন্য যেকোনও বস্তুগত অস্তিত্বমানের মতো অনুভবযোগ্য স্ব-প্রতীয়মান সত্য হিসাবে দেখা হয়েছে। আজ বহু মানুষ যেন এই কল্পনানির্ভর প্রয়াস নেওয়ার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেছে। এটা কোনও মহা-বিপর্যয় নয়। ধর্মীয় ধারণাসমূহ যখন বৈধতা হারিয়েছে, সাধারণত অলক্ষে হারিয়ে গেছে সেগুলোে: যদি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে ঈশ্বর সম্পর্কিত মানুষের ধারণা অকার্যকর হয়ে পড়ে, সেটাকে বাদ দিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু অতীতে অধিকাংশ মানুষ আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র হিসাবে কাজ করার জন্যে নতুন নতুন প্রতাঁকের সৃষ্টি করেছে। মানবজতি সবসময় জীবনের প্রতি বিস্ময়বোধ ও অনির্বচনীয় তাৎপর্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিজেই বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। আধুনিক জীবনের বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠা লক্ষ্যহীনতা, বিচ্ছিন্নতা, উম্মুলতা ও সন্ত্রাস ইঙ্গিত করছে যে তারা যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘ঈশ্বর’ বা অন্য কিছুতে বিশ্বাস সৃষ্টি করছে না-কোনওটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়-বহু মানুষ ডুবে যাচ্ছে হতাশায়।
