প্রথম থেকেই ফালসাফাহ বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ওষুধ, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার প্রতি আগ্রহ থেকেই প্রথম দিকে মুসলিম ফায়লাসুরা মেটাফিজিক্যাল পরিভাষায় আল্লাহ সংক্রান্ত আলোচনায় অগ্রসর হয়েছিল। বিজ্ঞান তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল; তারা বুঝতে পেরেছিল, সতীর্থ মুসলিমদের মতো করে তারা আর ঈশ্বর সম্পর্কে ভাবতে পারছে না। ঈশ্বরের দার্শনিক ধারণা কোরানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লক্ষণীয়ভাবে আলাদা ছিল, কিন্তু ফায়লাসুফরা সেই সময়ে উম্মাহর মাঝে বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকা বেশকিছু দর্শন পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল। এভাবেই অন্যান্য ধর্মীয় ট্র্যাডিশনের প্রতি কোরানের অসাধারণ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল: মুহাম্মদ (স) একথা মনে করতেন না যে, তিনি একটি নতুন, বিশেষ ধর্মের প্রতিষ্ঠা করছেন, তিনি বিশ্বাস করতেন সত্য পথে পরিচালিত সকল ধর্ম একজন ঈশ্বর হতে এসেছে। অবশ্য উনবিংশ শতাব্দীতে উলেমারা এই দর্শন বিস্মৃত হতে শুরু করে ইসলামকেই একমাত্র সত্য ধর্ম হিসাবে ঘোষণা দিতে শুরু করেছিলেন। ফায়সুফরা পুরোনো বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গিতে ফিরে গিয়েছিল, যদিও ভিন্ন পথে সেখানে পৌঁছেছে তারা। আজকে অনুরূপ একটা সুযোগ আছে আমাদের হাতে। আমাদের বৈজ্ঞানিক যুগে আমাদের পক্ষে পূর্ব পুরুষের মতো করে ঈশ্বরের কথা ভাবতে পারি না, কিন্তু বিজ্ঞানের চ্যালেঞ্জ আমাদের প্রাচীন কিছু সত্য উপলব্ধিতে সাহায্য করতে পারে।
আমরা দেখেছি, অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের অতিন্দ্রীয়বাদী ধর্মের প্রতি আগ্রহ ছিল। ঈশ্বর পাশা খেলেন না, তাঁর এই বিখ্যাত মন্তব্য সত্ত্বেও তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব ঈশ্বরের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেননি। ১৯২১ সালে ইংল্যান্ড সফরের সময় আর্চ বিশপ অভ ক্যান্টারবারি আইনস্টাইনকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ধর্মতত্ত্বের উপর এর প্রভাব কী হতে পারে। জবাবে তিনি বলেছেন: কিছু না। অপেক্ষিকতা একেবারেই বৈজ্ঞানিক বিষয়, এর সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই![১৫] স্টিফেন হকিংয়ের মতো বৈজ্ঞানিকদের কারণে ক্রিশ্চানরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে, কেননা হকিং তাঁর সৃষ্টিতত্ত্বে ঈশ্বরকে স্থান দেননি। এই ক্রিশ্চানরা সম্ভবত এখনও ঈশ্বরকে মানবীয় পরিভাষায় সত্তা হিসাবে ভাবে, যিনি আমরা যেভাবে করতাম সেভাবেই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আদিতে সৃষ্টিকে একরকম আক্ষরিকভাবে ধরে নেওয়া হয়নি। বাবিলনে নির্বাসনের আগে ইহুদিবাদে স্রষ্টা হিসাবে ইয়াহ্ওয়েহ্র প্রতি আগ্রহ প্রবেশ করেনি। এই ধারণাটি গ্রিক জগতে অপরিচিত ছিল: ৩৪১ সালের নাইসার কাউন্সিলের আগে খৃস্টধর্মের আনুষ্ঠানিক মতবাদ ছিল না। সৃষ্টি কোরানের একটি মৌল শিক্ষা, কিন্তু ঈশ্বর সম্পর্কিত অন্য সকল উচ্চারণের মতো একেও এক অলৌকিক সত্য সম্পর্কিত উদাহরণ বা ‘নিদর্শন’-আয়া-বলা হয়েছে। ইহুদি ও মুসলিম যুক্তিবাদীদের কাছে এটা কঠিন ও সমস্যাসঙ্কুল মতবাদ মনে হয়েছে এবং অনেকেই প্রত্যাখ্যান করেছে। সুফী ও কাব্বালিস্ট সবাই উৎসারণের গ্রিক উপমা পছন্দ করেছে। সে যাই হোক, সৃষ্টিতত্ত্ব পৃথিবীর উৎসের বৈজ্ঞানিক বর্ণনা ছিল না বরং মূলত এটা ছিল আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক সত্যের প্রতীক-নির্ভর প্রকাশ। মুসলিম বিশ্বে নতুন বিজ্ঞানের ব্যাপারে সামান্য বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে: আমরা যেমন দেখেছি, বিজ্ঞানের চেয়ে সাম্প্রতিক ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ ঈশ্বরের প্রচলিত ধারণার প্রতি বেশি রকম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাশ্চাত্যে অবশ্য ঐশীগ্রন্থের অধিকতর আক্ষরিক উপলব্ধি দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে। কোনও কোনও ক্রিশ্চান মনে করে, নতুন বিজ্ঞান তাদের ঈশ্বরে বিশ্বাসকে খাটো করেছে, তারা সম্ভবত ঈশ্বরকে নিউটনের মহাকারিগর হিসাবে কল্পনা করে, ঈশ্বরের ব্যক্তিরূপ ধারণা যেটা ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক উভয় প্রেক্ষিতেই প্রত্যাখ্যাত হওয়া উচিত। বিজ্ঞানের চ্যালেঞ্জ হয়তো বা চার্চগুলোকে ঐশীগ্রন্থের প্রতীকী বর্ণনার ব্যাপারে সজাগ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে নাড়া দিতে যাচ্ছে।
নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক নানাবিধ কারণে বর্তমান যুগে ব্যক্তিক ঈশ্বরের ধারণা যেন অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। নারীবাদীরা ব্যক্তিক উপাস্য-যিনি তার লিঙ্গের কারণে সেই গোত্রীয় পৌত্তলিক আমল থেকেই পুরুষ-তাঁর প্রতি বিকর্ষণ বোধ করছে। কিন্তু তাঁকে নারী হিসাবে উপস্থাপন করাটাও-দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় না হলে-একই রকম সীমাবদ্ধতায় আক্রান্ত হবে, কেননা এটা অসীম ঈশ্বরকে একেবারে মানবীয় মাত্রায় আবদ্ধ করে ফেলে। পাশ্চাত্যে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় পরম সত্তা হিসাবে ঈশ্বর সম্পর্কিত মেটাফিজিক্যাল ধারণাও অসন্তোষজনক বিবেচিত হচ্ছে। দার্শনিকদের ঈশ্বর অধুনা অচল হয়ে যাওয়া এক যুক্তিবাদের ফল, সুতরাং তার অস্তিত্বের প্রচলিত প্রমাণগুলো এখন আর কার্যকর নয়। আলোকন পর্বের ডেইস্টদের ব্যাপক হারে গৃহীত দার্শনিকদের ঈশ্বরকে বর্তমানকালের নাস্তিক্যবাদের দিকে প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে দেখা যেতে পারে। প্রাচীন স্কাই গডের মতো এই উপাস্য মানুষ ও ইহজগৎ হতে এত দূরবর্তী যে অনায়াসে তিনি ডিউস ওতিসৌস-এ পরিণত হয়ে আমাদের চেতনা থেকে হারিয়ে যান।
