ঈশ্বরকে অস্বাস্থ্যকর মূল্যহীন মহৌষধ, জাগতিক জীবনের বিকল্প কষ্টকল্পনার বিষয়বস্তু হিসাবেও ব্যবহার করা হতে পারে। ঈশ্বরের ধারণাকে। প্রায়শঃ মানুষের আফিম হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। যখন তাঁকে ঠিক আমাদের মতো কিন্তু বড় ও উন্নত-আরেকটি সত্তা হিসাবে ধরে নেওয়া হয়, তখন তা বিশেষ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়: যিনি তার স্বর্গে অবস্থান করেন, খোদ যেটাকে জাগতিক আনন্দের স্বর্গ মনে করা হয়। কিন্তু মূলত মানুষকে এই পৃথিবীর প্রতি মনোযোগী হতে ও অপ্রীতিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহায্য করার জন্যে ঈশ্বরকে ব্যবহার করা হতো। এমনকি সকল প্রকাশিত ক্রুটি সত্ত্বেও ইয়াহ্ওয়েহ্র পৌত্তলিক কাল্টও আচার ও পবিত্র কালের বিপরীতে আদি অপবিত্র সময়ের প্রচলিত ঘটনাপ্রবাহে তার অংশগ্রহণের ওপর জোর দিয়েছে। ইসরায়েলের পয়গম্বরগণ তাদের জনগণকে ঈশ্বরের নামে সামাজিক অপরাধ ও আসন্ন রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য করেছিলেন, যিনি এইসব ঐতিহাসিক ঘটনাবলীতে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। ক্রিশ্চান অবতারবাদ রক্ত মাংসের পৃথিবীতে স্বর্গীয় পরিব্যাপ্ততার ওপর জোর দিয়েছে। ইসলামে ইহজগতের প্রতি মনোযোগ বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে: মুহাম্মদের (স) চেয়ে বাস্তবাদী আর কেউ হতে পারেন না, যিনি একাধারে রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিভা ছিলেন। আমরা যেমন দেখেছি, মুসলিমদের পরবর্তীকালের প্রজন্মগুলো ন্যায়বিচার ভিত্তিক ও শোভন সমাজ প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে মানব ইতিহাসের স্বর্গীয় ইচ্ছা বাস্তবায়নের তার উদ্বেগে অংশীদার হয়েছে। একেবারে গোড়া থেকেই ঈশ্বরকে কাজের তাগিদ হিসাবে অনুভব করা হয়েছে। ঠিক যেই মুহূর্তে-এল বা ইয়াহ্ওয়েহ্ হিসাবে-ঈশ্বর আব্রাহামকে হারানে তার পরিবার হতে নিয়ে গেছেন, তখন থেকেই এই কাল্টে পৃথিবীর বুকে নিরেট কর্মকাণ্ডের প্রয়োজন যুক্ত হয়েছে ও প্রায়শঃই প্রাচীন পবিত্রতার কষ্টকর পরিত্যাগও যোগ হয়েছে।
এই স্থানচ্যুতির সঙ্গে বিশাল চাপও জড়িত ছিল। সম্পূর্ণ আলাদা পবিত্র ঈশ্বর পয়গম্বরগণের কাছে গভীর আঘাত হিসাবে অনুভূত হয়েছেন। তিনি তাঁর জাতির পক্ষ হতেও অনুরূপ পবিত্রতা ও বিচ্ছিন্নতা দাবি করেছেন। তিনি সিনাই পর্বতে মোজেসের সঙ্গে কথা বলার সময় ইসরায়েলিদের পাহাড়ের পাদদেশে যাওয়ার অনুমতি মেলেনি। পৌত্তলিকতার হলিস্টিক দর্শনকে বিদীর্ণ করে মানুষ ও ঈশ্বরের মাঝে সম্পূর্ণ নতুন এক ব্যবধান দেখা দিয়েছিল। সুতরাং, পৃথিবীর সঙ্গে বিচ্ছেদের একটা সম্ভাবনা ছিল যা ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য স্বাধীনতার জেগে ওঠা সচেতনতা প্রতিফলিত করেছে। এটা অঘটন নয় যে, একেশ্বরবাদ শেষ পর্যন্ত বাবিলনে নির্বাসনকালে শেকড় বিস্তার করেছিল, যখন ইসরায়েলিরাও ব্যক্তিগত দায়দায়িত্বের আদর্শ গড়ে তোলে যা ইহুদিবাদ ও ইসলাম, উভয় ধর্মেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা দেখেছি, মানুষের ব্যক্তিত্বের পবিত্র অধিকারের বোধ গড়ে তুলতে ইহুদিদের সাহায্য করার লক্ষ্যে র্যাবাইগণ। এক সর্বব্যাপী ঈশ্বরের ধারণা ব্যবহার করেছেন। তবু বিচ্ছিন্নতা তিনটি ধর্ম বিশ্বাসেই বিপদ হিসাবে অব্যাহত রয়ে গিয়েছে পাশ্চাত্যে ঈশ্বরের অনুভূতিতে অব্যাহতভাবে অপরাধবোধ ও এক নৈরাশ্যবাদী নৃতত্ত্ব সঙ্গী হয়েছিল। ইহুদিবাদ ও ইসলামেও, সন্দেহ নেই, তোরাহ ও শরিয়াহ্ অনুসরণকে অনেক সময়ই এক বাহ্যিক আইনের পরিপালন হিসাবে দেখা হয়েছে, যদিও আমরা। দেখেছি, যারা এইসব আইনী বিধিমালা সংকলিত করে ছেন তাদের ইচ্ছার চেয়ে দূরবর্তী আর কিছু হতে পারত না।
যেসব নাস্তিক এরকম দাসত্বমূলক আনুগত্যের দাবিদার একজন ঈশ্বর হতে মুক্তির পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে তারা আসলে এক অসম্পূর্ণ ও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঈশ্বরের চেনা ইমেজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। আবার, এটা অতিমাত্রায় ব্যক্তিরূপী ঈশ্বরের ধারণা ছিল। ঐশীগ্রন্থে বর্ণিত ইমেজকে বড় বেশি আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা করে ধরে নিয়েছে যে, ঈশ্বর আকাশের বুকে ‘বড় ভাই’ জাতীয় কিছু। অনিচ্ছুক দাসদের ওপর অচেনা আইন চালানো স্বর্গীয় স্বৈরাচারীর ইমেজকে বিদায় নিতেই হবে। আতঙ্ক সৃষ্টি করে জনগোষ্ঠীকে নাগরিক আইন মানতে বাধ্য করা এখন আর গ্রহণযোগ্য, এমনকি অনুসরণযোগ্যও নয়: ১৯৮৯ সালে শরৎকালে কমিউনিস্ট শাসনের অবসান অত্যন্ত নাটকীয়ভাবেই তা তুলে ধরেছে। উত্তর-আধুনিকতার মেজাজ মর্জির সঙ্গে আইন প্রণেতা ও শাসক স্বরূপ মানবরূপী ঈশ্বর ইমেজ স্বাভাবিক নয়। কিন্তু তারপরেও যেসব নাস্তিক ঈশ্বরের ধারণা স্বাভাবিক নয় বলে দাবি করেছে তারা পুরোপুরি ঠিক নয়। আমরা দেখেছি, ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিমরা লক্ষণীয়ভাবে অনুরূপ ঈশ্বরের ধারণা গড়ে তুলেছিল, যা পরম সত্তা সম্পর্কিত অন্যান্য ধারণার সঙ্গেও মেলে। মানুষ মানব জীবনের পরম অর্থ ও মূল্য খুঁজে পাওয়ার প্রয়াস পেলে তাদের মনোযোগ যেন একটা নির্দিষ্ট দিকে চালিত হয়। এর জন্যে তাদের বাধ্য করার প্রয়োজন পড়েনিঃ এটা এমন কিছু যা মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়।
তবুও অনুভূতিকে যদি অসংযত আক্রমণাত্মক বা অস্বাস্থ্যকর আবেগে পর্যবসিত হতে না দিতে চাওয়া হয়, তাহলে সেগুলোকে সমালোচনামূলক বুদ্ধিমত্তায় অনুপ্রাণিত হতে হবে। মনের বিভিন্ন প্রবণতাসহ চলতি অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে ঈশ্বর অনুভূতিকে তাল রেখে অগ্রসর হতে হবে। ফালসাফাহ্ গবেষণার প্রয়াস ছিল ঈশ্বরে বিশ্বাসকে মুসলিম, ইহুদি ও পরে পাশ্চাত্য ক্রিশ্চানদের ভেতর জেগে ওঠা নতুন যুক্তিবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত করা। শেষ পর্যন্ত মুসলিম ও ইহুদিরা দর্শন থেকে সরে গেছে। তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে যুক্তিবাদ বিজ্ঞান, ওষুধ ও গণিতের মতো গবেষণামূলক বিষয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, কিন্তু ধারণাতীত একজন ঈশ্বর সংক্রান্ত আলোচনার জন্যে পুরোপুরি জুৎসই নয়। গ্রিকরা আগেই এটা বুঝতে পেরে নিজস্ব মেটাফিজিক্সে গোড়ার দিকেই অবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। ঈশ্বর আলোচনার দার্শনিক পদ্ধতির অন্যতম দুর্বলতা হচ্ছে এতে করে পরম উপাস্যকে একেবারে ভিন্ন মাত্রার একটা সত্তা হয়ে সকল অস্তিত্বমান বস্তুর মাঝে সর্বোচ্চ কিন্তু আরেকটি সত্তা বলে মনে হতে পারে। তা সত্ত্বেও ফালসাফাহর প্রয়াস গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যেহেতু এটা অন্যান্য অভিজ্ঞতার সঙ্গে ঈশ্বরকে সম্পর্কিত করার প্রয়োজনীয়তাটুকু তুলে ধরতে পেরেছিল, সেটা কেবল এর সম্ভাব্য মাত্রাটুকু বোঝানোর জন্যে হয়ে থাকলেও। ঈশ্বরকে এক পবিত্র বন্দিশালায় বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছিন্নতায় ঠেলে দেওয়াটা অস্বাস্থ্যকর ও অস্বাভাবিক। এটা মানুষকে একথা ভাবতে প্ররোচিত করতে পারে যে, ঈশ্বর-অনুপ্রাণিত আচরণে শালীনতা ও যুক্তির সাধারণ মান প্রয়োগের কোনও প্রয়োজন নেই।
