ইহুদিবাদে অসংখ্য বাণী নেই। বাণী একটিই। সেটা হচ্ছে ঈশ্বর যা চান সেটা করা। অনেক সময় ঈশ্বর চান আমরা যেন যুদ্ধে যাই, আবার কখনও চান আমরা যেন শান্তিতে বাস করি…কিন্তু বাণী মাত্র একটি…ঈশ্বর চেয়েছেন আমরা যেন এদেশে আসি একটি ইহুদি রাষ্ট্র করার জন্যে।১৩
এটা শত শত বছর ধরে অর্জিত ইহুদি অগ্রগতিকে মুছে দেয়, ফিরিয়ে নিয়ে যায় বুক অভ জোশুয়ার ডিউটেরোনমিয় দৃষ্টিভঙ্গিতে। এটা বিস্ময়কর নয় যে, মানুষ যখন এ জাতীয় অশালীন বাক্য শোনে, যেখানে ঈশ্বরকে দিয়ে অন্যদের মানবিক অধিকার অস্বীকার করানো হচ্ছে, তখন তারা যত শিগগির এই ঈশ্বরকে বাদ দেওয়া যায় ততই মঙ্গল মনে করে।
তা সত্ত্বেও, আগের অধ্যায়ে আমরা যেমন দেখেছি, এ ধরনের ধর্মপরায়ণতা আসলে ঈশ্বর হতে সরে আসা। ক্রিশ্চান ‘পারিবারিক মূল্যবোধ, ইসলাম’ বা ‘পবিত্র ভূমির মতো এ জাতীয় মানবীয়, ঐতিহাসিক ঘটনাকে ধর্মীয় কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা বহু-ঈশ্বরবাদীতার নতুন ধরণ। ঈশ্বরের দীর্ঘ ইতিহাস জুড়ে এ ধরনের যুদ্ধংদেহী ন্যায়পরায়ণতা একেশ্বরবাদীদের কাছে অব্যাহত প্রলোভন হয়েছিল। একে অবশ্যই ভ্রান্ত বলে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিমদের ঈশ্বরের সূচনা ছিল দুর্ভাগ্যজনক, কেননা গোত্রীয় উপাস্য ইয়াহ্ওয়েহ্ তার আপন জাতির প্রতি ভয়ঙ্করভাবে পক্ষপাতপূর্ণ ছিলেন। পরবর্তীকালের ক্রুসেডাররা যারা এই আদিম বৈশিষ্ট্যে ফিরে গেছে, তারা গোত্রের মূল্যবোধসমূহকে অগ্রহণযোগ্যভাবে মর্যাদায় স্থাপন করেছে ও মানব সৃষ্ট আদর্শের দুয়ে সত্তায় প্রতিস্থাপিত করেছে যা আমাদের সংস্কারকে চ্যালেঞ্জ করারই কথা। তারা এক গুরুত্বপূর্ণ একশ্বরবাদী থিমও অস্বীকার করছে। ইসরায়েলের পয়গম্বরগণ ইয়াহ্ওয়েহ্র পৌত্তলিক কাল্ট সংস্কার করার পর থেকে একেশ্বরবাদীদের ঈশ্বর সহানুভূতির আদর্শকে উর্ধ্বে তুলে ধরেছেন।
আমরা দেখেছি, অ্যাক্সিয়াল যুগে বিকশিত অধিকাংশ আদর্শের ক্ষেত্রে সহানুভূতি একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। সমবেদনার আদর্শের কারণে বৌদ্ধরা বুদ্ধ ও বোধিসত্তাদের প্রতি ভক্তির সূচনা করে ধর্মীয় দিক নির্দেশনায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছিল। পয়গম্বরগণ জোর দিয়ে গেছেন যে, সমাজ সামগ্রিকভাবে এক অধিকতর ন্যায়বিচার ভিত্তিক ও সমবেদনামূলক নীতিমালা গ্রহণ না করলে কাল্ট ও উপাসনার কোনও অর্থ থাকে না। জেসাস, পল এবং র্যাবইদের হাতে এই দর্শনসমূহের বিকাশ ঘটেছে, যাদের সবাই একই ইহুদি আদর্শ অনুসরণ করেছেন ও এগুলোর প্রয়োগ ঘটানোর জন্যে ইহুদিবাদের গুরুতর পরিবর্তন সাধনের পরামর্শ রেখেছেন। কোরান সহানুভূতিপুর্ণ ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাকে আল্লাহর পরিমার্জিত ধর্মের মূল সুরে পরিণত করেছে। সহানুভূতি বিশেষভাবে কঠিন একটা গুণ। এটা দাবি করে, আমরা যেন আমাদের অহমবোধ, নিরাপত্তাহীনতা ও সহজাত কুসংস্কারের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে যাই। এটা বিস্ময়কর নয় যে, ঈশ্বরের তিনটি ধর্মই কোনও না কোনও সময় এই উঁচু মান অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ডেইস্টরা প্রচলিত পাশ্চাত্যে খৃস্টধর্মমত প্রত্যাখ্যান করেছিলেন প্রধানত তা প্রকটভাবে নিষ্ঠুর ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল বলে। একই কথা আজও প্রযোজ্য। বেশ ঘন ঘন প্রথাগত বিশ্বাসীগণ, যারা মৌলবাদী নয়, তাদের আক্রমণাত্মক ন্যায়পরায়ণতার অংশীদার হয়ে পড়ে। তারা তাদের নিজেদের ভালোবাসা ও ঘৃণাকে তুলে ধরার জন্যে ঈশ্বরকে ব্যবহার করে, স্বয়ং ঈশ্বরের ওপর তা আরোপ করে। কিন্তু যেসব ইহুদি, ক্রিশ্চন এবং মুসলিম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে স্বর্গীয় উপাসনায় অংশ নেয় এবং বিভিন্ন জাতিগত ও আদর্শগত শিবিরে বিভক্ত মানুষকে অসম্মান করে থাকে, তারা তাদের ধর্মের অন্যতম মৌল সত্যেরই বিরোধিতা করে। যারা নিজেদের ইহুদি, ক্রিস্টান ও মুসলিম দাবি করে তাদের পক্ষে এক অসম সমাজ ব্যবস্থাকে মেনে নেওয়াটা সমানভাবে অসঙ্গত। ঐতিহাসিক একেশ্বরবাদের ঈশ্বর উৎসর্গ চান না, চান করুণা; জাঁকজমকপূর্ণ আচারের বদলে চান সহানুভূতি।
যারা ধর্মের কান্টিক ধরণ অনুশীলন করে ও যারা সহানুভূতিময় ঈশ্বরের একটি অনুভূতি গড়ে তুলেছে তাদের মাঝে প্রায়ই পার্থক্য লক্ষ করা যায়। পয়গম্বরগণ তাদের সেসব সমসাময়িকদের ভৎর্সনা করেছেন যারা মন্দিরের উপাসনাই যথেষ্ট ভেবেছে। জেসাস ও সেইন্ট পল, দুজনেই পরিষ্কার করে দিয়েছেন, দানবিহীন বাহ্যিক অনুসরণের কোনও অর্থ নেই: এটা ঘন্টা-ধ্বনি বা করতালের চেয়ে খুব বেশি ভালো নয়। আরবরা ঈশ্বরের দাবি অনুযায়ী সত্য ধর্মের শর্ত হিসাবে সহানুভূতির গুণাবলী অর্জন ছাড়াই আল্লাহর পাশাপাশি প্রাচীন আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাচীন পৌত্তলিক দেবীদেরও উপসানা করতে চেয়েছিল, তাদের সঙ্গে মুহাম্মদের (স) সংঘাত সৃষ্টি হয়েছিল। রোমের প্যাগান সম্প্রদায়ের মাঝেও অনুরূপ বিভক্তি দেখা দিয়েছিল। প্রাচীন কাল্টিক ধর্ম স্থিতাবস্থার পক্ষে ছিল, অন্যদিকে দার্শনিকরা এমন এক বাণী প্রচার করেছেন যা পৃথিবীকে বদলে দেবে। এমন হতে পারে, এক ঈশ্বরের সহানুভূতির ধর্ম হয়তো সংখ্যালঘু একটি দলই অনুসরণ করছে; অধিকাংশ মানুষই আপোসহীন নৈতিক চাহিদাসম্পন্ন ঈশ্বর অনুভূতির চরম অবস্থার মুখোমুখি হওয়া কঠিন মনে করেছে। সিনাই পবর্ত হতে মোজেস আইনের ফলকসমূহ বয়ে আনার পর হতে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নিজেদের সৃষ্ট প্রাচীন হুমকিহীন উপাস্যের মূর্তি সোনালি বাছুরের পূজা করতে পছন্দ করেছে। প্রধান পুরোহিত আরন সোনালি বাছুরের সোনালি মূর্তির নির্মাণ কাজে নেতৃত্বে দিয়েছেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রায়শঃই পয়গম্বর ও অতিন্দ্রীয়বাদী অনুপ্রেরণার প্রতি বধির হয়ে থাকে, যারা কিনা আরও বেশি চাহিদাসম্পন্ন ঈশ্বরের সংবাদ নিয়ে আসেন।
