ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের জার্মান সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স হখেইমার (১৮৯৫-১৯৭৩) ঈশ্বরকে পয়গম্বরদের স্মারক গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ হিসাবে দেখেছেন। তিনি ছিলেন কি ছিলেন না, কিংবা আমরা তাকে বিশ্বাস করি কিনা, এসব বাড়াবাড়ি। ঈশ্বরের ধারণা ছাড়া পরম অর্থ, সত্য বা নৈতিকতা বলে কিছু নেই: নৈতিকতা হয়ে পড়ে রুচি, মনোভাব বা ঝোঁকের একটা ব্যাপার। রাজনীতি ও নৈতিকতা যদি কোনওভাবে ঈশ্বরের ধারণা অন্তর্ভূক্ত না করে, তারা প্রাজ্ঞ হওয়ার বদলে বরং একেবারে বাস্তবনিষ্ঠ ও ধূর্ত রয়ে যাবে । পরম বলে কিছুই na থাকলে আমাদের ঘৃণা করার কোনও কারণ থাকবে না কিংবা আমরা বলব যে যুদ্ধ শান্তির চেয়ে খারাপ। ধর্ম অত্যাবশ্যকভাবে অন্তরের অনুভূতি যে একজন ঈশ্বর আছেন। আমাদের অন্যতম প্রাচীন স্বপ্ন ছিল ন্যায় বিচারের আকাক্ষা (আমরা কতবারই না বাচ্চাদের বলতে শুনিঃ ‘এটা ঠিক নয়!’)। দুঃখ কষ্ট ও অনাচারের মুখে অগণিত মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও অভিযোগ লিপিবদ্ধ করে ধর্ম। এটা আমাদের সীমাবদ্ধ প্রকৃতি সম্পর্কে সজাগ করে তোলে; আমরা সবাই আশা করি পৃথিবীর অন্যায়-অবিচারই শেষ কথা হয়ে থাকবে না।
যাদের প্রচলিত কোনও ধর্মীয় বিশ্বাস নেই তারাও বারবার ঈশ্বরের ইতিহাসে আমাদের আবিস্কৃত মূল সুরের শরণাপন্ন হচ্ছে, এ বিষয়টি দেখায় যে, আমরা অনেকেই যেমন মনে করি আসলে এ ধারণাটি সে রকম বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। তা সত্ত্বেও বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে আমাদের বৃহৎ রূপের মতো ক্রিয়াশীল একজন ব্যক্তিক ঈশ্বরের ধারণা থেকে সরে যাবার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। এখানে নতুন কিছু ছিল না। আমরা যেমন দেখেছি, ইহুদি ঐশীগ্রন্থ, ক্রিশ্চানরা যেটাকে তাদের ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট বলে, অনুরূপ প্রক্রিয়া দেখায়; কোরান শুরু থেকেই আল্লাহকে জুদো-ক্রিশ্চান ঐতিহ্যের তুলনায় কম ব্যক্তিক রূপে দেখেছে। ট্রিনিটির মতো মতবাদসমূহ এবং মিথ ও অতিন্দ্রীয়বাদী ব্যবস্থার প্রতীকীবাদ, এসবই বোঝাতে চেয়েছে ঈশ্বর ব্যক্তিত্বের ঊর্ধ্বে। তবু এটা যেন বিশ্বাসীদের অনেকেই পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেনি। উলউইচের বিশপ জন রবিনসন ১৯৬৩ সালে অনেস্ট টু গড প্রকাশ করেন, এখানে তিনি উল্লেখ করেন, মহাশূন্যের প্রাচীন ব্যক্তিক ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখতে পারছেন না। ব্রিটেনে তখন মহাশোরগোল শুরু হয়ে গিয়েছিল। ডারহামের বিশপ ডেভিড জেনকিন্স-এর বিভিন্ন মন্তব্যও একই রকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, যদিও শিক্ষিত সমাজে এসব ধারণা খুবই সাধারণ ব্যাপার ছিল। ক্যামব্রিজের ইম্যানুয়েল কলেজের ডীন ডন কিউপিট নাস্তিক পুরোহিত’ আখ্যায়িত হয়েছিলেন তিনি আস্তিক্যবাদের প্রথাগত বাস্তববাদী ঈশ্বরকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে এক ধরনের ক্রিশ্চান-বৌদ্ধ মতবাদের প্রস্তাব রেখেছিলেন যা ধর্মীয় অনুভূতিকে ধর্মতত্ত্বের আগে স্থান দেয়। রবিনসনের মতো কিউপিট বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে এমন এক দর্শনে পৌঁছেছিলেন যা তিনটি ধর্ম বিশ্বাসের অতিন্দ্রীয়বাদীরা অধিকতর স্বজ্ঞামূলক উপায়ে অর্জন করেছিল। তবুও প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই, মহাশূন্যে কিছু নেই’ এগুলো নতুন কোনও কথা নয়।
পরম সম্পর্কে অসম্পূর্ণ ইমেজ নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা রয়েছে। এটা স্বাস্থ্যকর প্রতিমা বিদ্বেষ, কেননা ঈশ্বরের ধারণাকে অতীতে ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৭০ এর দশকের পর থেকে পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এক ধরনের ধার্মিকতার উত্থান যাকে আমরা সাধারণভাবে ঈশ্বরের তিনটি ধর্মসহ প্রধান বিশ্ব ধর্মে ‘মৌলবাদ’ বলি। প্রবলভাবে রাজনৈতিক আধ্যাত্মবাদ দর্শনের দিক থেকে আক্ষরিক এবং অসহিষ্ণু। বরাবরই চরমপন্থী ও প্রলয়বাদী উদ্দীপনার শিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিশ্চান মৌলবাদীরা নিজেদের নিউ রাইট-এর সঙ্গে সম্পর্কিত করেছে। মৌলবাদীরা বৈধ গর্ভপাত বাতিল এবং নৈতিক ও সামাজিক শালীনতার ক্ষেত্রে কট্টরপন্থা অনুসরণের প্রচার করছে। রেগানের আমলে জেরি ফলওয়েলের মরাল মেজরিটি বিস্ময়কর রাজনৈতিক, ক্ষমতা অর্জন করেছিল। জেসাসের মন্তব্যকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণকারী মেরিস সেরুলোর মতো অন্য ইভেঞ্জিলিস্টরা বিশ্বাস করে যে, প্রকৃত ধর্ম বিশ্বাসের চিহ্ন অলৌকিক ঘটনাবলী । বিশ্বাসী প্রার্থনায় যা চাইবে ঈশ্বর তাকে তাই দেবেন। ব্রিটেনে কলিন আকহার্টের মতো মৌলবাদীরা অনুরূপ দাবি করেছে। ক্রিশ্চান মৌলবাদীদের যেন ক্রাইস্টের প্রেমময় সহানুভূতির প্রতি তেমন একটা নজর নেই। তারা যাদের ঈশ্বরের শত্রু মনে করে তাদের নিন্দা জানতে দেরি করে। না। অধিকাংশই ইহুদি ও মুসলিমদের নরকবাস অবধারিত মনে করে। আর্কহার্ট যুক্তি দেখিয়েছেন, সকল প্রাচ্য ধর্মই শয়তান-অনুপ্রাণিত।
মুসলিম বিশ্বেও অনুরূপ পরিবর্তন এসেছে। পাশ্চাত্যে তা প্রবল প্রচারণা পেয়েছে। মুসলিম মৌলবাদীরা সরকারের পতন ঘটিয়েছে, ইসলামের শত্রুদের হত্যা করেছে বা মৃত্যুদণ্ডের হুমকি দিয়েছে। অনুরূপভাবে ইহুদি মৌলবাদীরা পশ্চিম তীর ও গাযা স্ট্রিপের অধিকৃত লোকালয়ে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে আরব অধিবাসীদের বঞ্চিত করার শপথ নিয়ে বসতি স্থাপন করেছে। এভাবেই তারা মেসায়াহর অত্যাসন্ন আবির্ভাবের পথ নির্মাণ করছে বলে বিশ্বাস করে। মৌলবাদ এর সকল রূপে ভয়ঙ্করভাবে হানিকর বিশ্বাস। এভাবে ১৯৯০ সালে নিউ ইয়র্কে আততায়ীর হাতে প্রাণ হারানোর আগে পর্যন্ত ইসরায়েলের ফার রাইটের’র সবচেয়ে চরমপন্থী সদস্য র্যাবাই মেয়ার কাহানে বলেছেন:
