বুবের যেখানে বাইবেল ও হাসিবাদের শরণ নিয়েছেন সেখানে আব্রাহাম জোশুয়া হেশেল (১৯০৭-৭২) ফিরে গেছেন র্যাবাই ও তালমুদের চেতনায় । বুবেরের বিপরীতে তার বিশ্বাস ছিল মিতযভোত আধুনিকতর মানুষের মর্যাদা হানিকর দিকগুলোর মোকাবিলায় ইহুদিদের সাহায্য করবে। এসব কর্মকাণ্ড তাদের নয় বরং ঈশ্বরের চাহিদা পূরণ করে। ব্যক্তিত্ব হরণ ও শোষণ আধুনিক জীবনের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে: এমনকি ঈশ্বরকে পর্যন্ত এমন একটা বস্তুর পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে যাকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করা যায়। আমাদের উদ্দেশ্য পূরণের উপায়ে পরিণত হয়েছেন তিনি। পরিণামে ধর্ম একঘেয়ে ও নিরস হয়ে গেছে; উপরিকাঠামোর ভেতরে কাজ করার জন্যে আমাদের দরকার এক গভীর ধর্মতত্ত্ব এবং আদি ভীতি, রহস্য আর বিস্ময় ফিরিয়ে আনা। যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা চালানো অর্থহীন। ঈশ্বরে বিশ্বাস এমন এক প্রত্যক্ষ উপলব্ধি হতে জাগ্রত হয় যার সঙ্গে ধারণা বা যৌক্তিকতার কোনও সম্পর্ক নেই। যদি সেই পবিত্রতার অনুভূতি অনুভব করতে হয় তাহলে কবিতার মতো অবশ্যই রূপকার্থে বাইবেল পাঠ করতে হবে। মিতভোতকে এক প্রতীকী ভঙ্গি হিসাবে দেখতে হবে যা আমাদের ঈশ্বরের সত্তায় বাস করার তালিম দেয়। প্রতিটি মিত্যুভোত জাগতিক জীবনে ছোটখাট পরিসরে সাক্ষাতের একেকটি স্থান; কোনও শিল্পকর্মের মতো মিতযভোত-এর জগতের নিজস্ব যুক্তি ও ছন্দ রয়েছে। সর্বোপরি, আমাদের একটা বিষয়ে সজাগ থাকা প্রয়োজন যে, ঈশ্বরের মানবজাতির প্রয়োজন রয়েছে। তিনি দার্শনিকদের দূরবর্তী ঈশ্বর নন, বরং পয়গম্বরদের বর্ণিত করুণাময় ঈশ্বর।
নাস্তিক্যবাদী দার্শনিকরাও বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধে এসে ঈশ্বরের ধারণায় আকর্ষণ বোধ করেছেন। বিইং অ্যান্ড টাইম (১৯২৭)-এ মার্টিন হেইদেগার (১৮৯৯-১৯৭৬) অনেকটা টিলিচের মতো সত্তাকে দেখেছেন, যদিও তাঁকে ক্রিশ্চান অর্থে ঈশ্বর’ বলে স্বীকার করতে চাননি, এটা সত্তাসমূহ হতে আলাদা ও চিন্তার স্বাভাবিক ধরণ থেকে সম্পূর্ণই ভিন্ন। কোনও কোনও ক্রিশ্চান হেইদেগারের রচনায় অনুপ্রাণিত হয়েছে, যদিও নাৎসি শাসকদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে এই মতবাদের নৈতিক মূল্য প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। ফ্রেইবার্গে দেওয়া উদ্বোধনী ভাষণ হোয়াট ইজ মেটাফিজিকস-এ হেইদেগার বেশ কিছু ধারণার কথা বলেছিলেন যেগুলো আগেই প্রটিনাস, ডেনিস এবং এরিগেনার রচনাবলীতে দেখা গিয়েছিল। ‘সত্তা’ যেহেতু সম্পূর্ণ আলাদা প্রকৃতপক্ষে তা কিছু না কিছুই না, কোনও বস্তু যেমন নয়, তেমনি কোনও নির্দিষ্ট সত্তাও নয়। অথচ এটা অন্য সকল অস্তিত্বকে সম্ভব করে তুলেছে। প্রাচীন মানুষেরা বিশ্বাস করত কিছু না থেকে কিছু আসে না, কিন্তু হেইদেগার এই প্রবচনকে পাল্টে দেন; ভাষণের সমাপ্তি টেনেছিলেন তিনি লেইবনিযের উত্থাপিত একট প্রশ্ন দিয়ে: ‘একেবরে কিছু না থেকে কেনইবা সত্তাসমূহ উপস্থিত?’ এটা এমন একটা প্রশ্ন যা বিস্ময়ের ধাক্কা সৃষ্টি করে, বিস্ময় জাগায়; যা জগতের প্রতি মানুষের এক অব্যাহত প্রতিক্রিয়া হয়ে আছে: কেন কোনও কিছুর অস্তিত্ব থাকবে? হেইদেগার তাঁর ইন্ট্রোডকশন টু মেটাফিজিক্স (১৯৫৩) শুরু করেছিলেন একই জিজ্ঞাসা দিয়ে। ধর্মতত্ত্বের বিশ্বাস ছিল এর জবাব জানা আছে এবং সবকিছু মূল খুঁজে পেয়েছে ভিন্ন কিছু ঈশ্বরে। কিন্তু এই ঈশ্বর আরেকটি সত্তা মাত্র, এমন কিছু নন যিনি একেবারেই আলাদা। ধর্মের ঈশ্বর সম্পর্কে হেইদেগারের কিছুট হীন ধারণা ছিল-যদিও বহু ধার্মিক মানুষ একে মানে কিন্তু প্রায়শঃ অতিন্দ্রীয়বাদী পরিভাষায় সত্তা সম্পর্কে কথা বলেছেন তিনি। তিনি একে এক মহা স্ববিরোধিতা হিসাবে বর্ণনা করেছেন: চিন্তা প্রক্রিয়াকে সত্তার জন্যে অপেক্ষা করা বা তার কথা শোনা হিসাবে তুলে ধরেছেন এবং সত্তার প্রত্যাবর্তন ও প্রত্যাহারের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন বলে মনে হয়, অনেকটা অতিন্দ্রীয়াবাদীরা যেভাবে ঈশ্বরের অনুপস্থিতি বোধ করে থাকে সে রকম। সত্তাকে অস্তিত্ব দেওয়া চিন্তা করার ক্ষমতা নেই মানুষের। গ্রিকদের সময় থেকেই পাশ্চাত্যবাসীরা সত্তাকে বিস্মৃত হয়ে তার বদলে সত্তাসমূহে মনোনিবেশ করেছে, এ প্রক্রিয়া এনে দিয়েছে এর আধুনিক কারিগরি সাফল্য। জীবনের শেষ দিকে রচিত প্রবন্ধ ওনলি আ গড ক্যান সেইভ আস-এ হেইদেগার মত প্রকাশ করেছেন যে, আমাদের সময়ে ঈশ্বরের অনুপস্থিতির বোধ আমাদেরকে ‘সত্তাসমূহের সঙ্গে সম্পর্ক হতে মুক্ত করতে পারে। কিন্তু সত্তাকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনার জন্যে আমাদের কিছুই করার নেই। আমরা কেবল ভবিষ্যতে এক নতুন আবির্ভাবের প্রত্যাশা করতে পারি।
মার্ক্সবাদী দার্শনিক আর্নস্ট ব্লচ (১৮৮৫-১৯৭৭) ঈশ্বরের ধারণাকে মানুষের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বিবেচনা করেছেন। গোটা মানব জীবন ভবিষ্যতের দিকে নির্দেশিত; আমরা আমাদের জীবনকে অসম্পূর্ণ ও অসমাপ্ত হিসাবে অনুভব করি। জন্তু-জানোয়ারের বিপরীতে আমরা কখনও সন্তুষ্ট হই না, বরং সব সময় আরও বেশি কিছু প্রত্যাশা করি। এ ব্যাপারটি আমাদের ভাবতে ও উন্নতি অর্জনে বাধ্য করে, যেহেতু জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে আমাদের অবশ্যই নিজেদের পেরিয়ে যেতে হয়, পৌঁছতে হয় পরবর্তী পর্যায়ে শিশুকে অবশ্যই টডলার হয়ে উঠতে হবে, টডলারকে তার সব অক্ষমতা পেরিয়ে বালক হয়ে উঠতে হবে এবং পর্যায়ক্রমে। আমাদের সকল স্বপ্ন ও আকাক্ষা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকে। এমনকি দর্শনেরও সূচনা ঘটে বিস্ময়ের সঙ্গে, যা অজানার অনুভূতি, এখনও না ঘটার অভিজ্ঞতা। সমাজতন্ত্রও এক ইউটোপিয়া প্রত্যাশী, কিন্তু ধর্মবিশ্বাসের প্রতি মার্ক্সীয় অস্বীকৃতি সত্ত্বেও যেখানে প্রত্যাশা আছে সেখানেই আছে ধর্মও। ফয়েরবাখের মতো ব্লচ ঈশ্বরকে মানবীয় আদর্শ হিসাবে দেখেছেন, এখনও যার বাস্তবায়ন ঘটেনি, কিন্তু একে বিচ্ছিন্নতাকারী হিসাবে না দেখে বরং মানবীয় অবস্থার জন্যে আবশ্যক মনে করেছেন।
