অন্যরা ঈশ্বরকে মানুষের আরও নিকটবর্তী ও সময়ের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছিলেন। ইরানি বিপ্লবের পূর্ববর্তী বছরগুলোয় তরুণ দার্শনিক ডক্টর আলি শরিয়তি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী হতে ব্যাপক শ্রোতা টানতে সক্ষম হন। তিনিই মূলত শাহর বিরুদ্ধে তাদের ঐক্যবদ্ধ করায় ভূমিকা রেখেছিলেন, যদিও মোল্লাহরা তার ধর্মীয় বাণীর অনেক কিছুই অনুমোদন করেননি। বিক্ষোভের সময় জনতা আয়াতোল্লাহ খোমিনীর ছবির পাশাপাশি তার ছবিও বহন করত, যদিও এটা পরিষ্কার ছিল না যে খোমিনির ইরানে তাঁর অবস্থান কী হবে। শরিয়তি মনে করেছিলেন, পাশ্চাত্যকরণের ফলে মুসলিমরা তাদের সাংস্কৃতিক শেকড় হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে: এই অসঙ্গতি দূর করার জন্যে তাদের অবশ্যই ধর্ম বিশ্বাসের প্রাচীন প্রতীকসমূহকে নতুন করে ব্যাখ্যা করতে হবে। মুহাম্মদ (স) প্রাচীন পৌত্তলিক আচার হজ্জকে একেশ্বরবাদে প্রাসঙ্গিকতা দেওয়ার সময় ঠিক এ কাজটি করেছিলেন। নিজের লেখা গ্রন্থ হজ্জ-এ শরিয়তি তাঁর পাঠককে তীর্থ যাত্রার মাধ্যমে মক্কায় নিয়ে গেছেন, আস্তে আস্তে ঈশ্বরের এক গতিময় ধারণা তুলে ধরেছেন প্রত্যেক তীর্থযাত্রী নারী ও পুরুষকে কাল্পনিকভাবে যাকে নিজের জন্যে সৃষ্টি করতে হয়। এভাবেই কাবাহয় পৌঁছার পর তীর্থযাত্রীরা উপলব্ধি করতে পারে উপাসনা গৃহ খালি থাকাটা কত মানানসই: ‘এটা তোমার চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; কাবাহ একটি নিদর্শন, এটা কেবল তোমাকে দিক চিনিয়ে দেয় যাতে পথ হারিয়ে না যায়। কাবাহু ঈশ্বর সম্পর্কে সকল মানবীয় প্রকাশকে অতিক্রম করার গুরুত্বের সাক্ষ্য, যেগুলো অবশ্যই শেষ কথায় পরিণত হতে পারবে না। কাবাগৃহ সাজসজ্জা বা জাকজমকহীন একটা সাধারণ বর্গাকৃতি ঘর কেন? কারণ এটা বিশ্ব জগতে ঈশ্বরের রহস্য তুলে ধরে: ঈশ্বর নিরাকার, বর্ণহীন, রূপহীন, মানুষ যে রকম আকার বা অবস্থাই বেছে নিক না কেন, দেখুক বা কল্পনা করুক, তা ঈশ্বর নয়। খোদ হজ্জ উত্তর ঔপনিবিশেক আমলে অসংখ্য ইরানির বিচ্ছিন্নতা বোধে এক অ্যান্টিথিসিস। এটা প্রতিটি মানুষের অস্তিত্ববাদী যাত্রা তুলে ধরে যারা তাদের জীরনকে ঘুরিয়ে নিয়ে অনির্বচনীয় ঈশ্বরের দিকে স্থাপন করছে। শরিয়তির অ্যাকটিভিস্ট বিশ্বাস বিপজ্জনক ছিল: শাহর গুপ্ত পুলিশ নির্যাতন চালানোর পর তাকে দেশ হতে বহিষ্কার করে; ১৯৭৭ সালে লন্ডনে তার মৃত্যুর জন্যে সম্ভবত তারাই দায়ী।
মার্টিন বুবের (১৮৭৮-১৯৬৫) এরও আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া ও মৌল ঐক্যের প্রয়াস হিসাবে অনুরূপ গতিময় দর্শন ছিল। ধর্ম এক ব্যক্তিক ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার একটা ব্যাপার যা প্রায় সব সময় অন্য মানুষের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতের সময় ঘটে। দুটো বলয় রয়েছে; একটি হচ্ছে স্থান ও কালের পরিধি যেখানে আমরা বিষয় ও বস্তু হিসাবে-আমি-এটা-অন্যান্য বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত হই। দ্বিতীয় জগতে আমরা অন্যের সঙ্গে তাদের প্রকৃত সত্তায় সম্পর্কিত হই, তাদেরকে তাদের মাঝেই চূড়ান্তরূপে দেখি। এটা আমি-তুমি’র জগৎ যা ঈশ্বরের সত্তাকে প্রকাশ করে। জীবন ঈশ্বরের সঙ্গে অন্তহীন এক সংলাপ, যা আমাদের মুক্তি বা সৃজনশীলতাকে ব্যাহত করে না, যেহেতু ঈশ্বর কখনও আমাদের কাছে তিনি কী চান বলেন না। আমরা তাকে কেবল একটা সত্তা ও আজ্ঞা হিসাবে অনুভব করি এবং আমাদের নিজেদের স্বার্থেই অর্থ খুঁজে বের করার প্রয়োজন হয়। এর অর্থ ছিল অধিকাংশ ইহুদি ঐতিহ্যের সঙ্গে বিচ্ছেদ। প্রচলিত টেক্সটের বুবেরের ব্যাখ্যা প্রায়শঃই প্রশ্ন সাপেক্ষ। ক্যান্টিয়ান হিসাবে তোরাহ পাঠের অবকাশ ছিল না বুবেরের । একে তিনি বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী হিসাবে দেখেছেন: ঈশ্বর কোনও আইন প্রণয়নকারী নন! “তুমি-আমি’ সাক্ষাতের অর্থ মুক্তি ও স্বতঃস্ফুর্ততা, অতীতের কোনও ঐতিহ্যের ভার নয়। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ ইহুদি আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে মিতযভোত আর এখানেই ইহুদিদের চেয়ে ক্রিশ্চানদের কাছে বুবেরের বেশি জনপ্রিয়তার ব্যাখ্যা মিলতে পারে।
বুবের উপলব্ধি করেছিলেন যে, ঈশ্বর’ শব্দটি কলঙ্কিত, অবনমিত হয়ে গেছে, কিন্তু তাঁকে বাদ দিতে অস্বীকার গেছেন তিনি। এটার সমান একটা শব্দ কোথায় পাব আমি, একই সত্তাকে বর্ণনা করার জন্যে? এর রয়েছে ব্যাপক এবং জটিল অর্থ ও অসংখ্য পবিত্র সম্পর্ক। যারা ঈশ্বর’ শব্দটি প্রত্যাখ্যান। করে, তাদের অবশ্যই সম্মান দেখাতে হবে, কেননা এর নামে ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
‘শেষ বস্তুসমূহ সম্পর্কে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নীরবতা অবলম্বনের প্রস্তাব রাখার কারণ বোঝাটা সহজ, যাতে অপব্যবহৃত শব্দসমূহ উদ্ধার প্রাপ্ত হয়। কিন্তু এটা মুক্তি পাওয়ার উপায় নয়। আমরা ঈশ্বর’ শব্দটিকে পরিষ্কার করতে পারব না, একে সমগ্রতেও পরিণত করতে পারব না। কিন্তু কলঙ্কিত ও ক্ষতবিক্ষত হলেও একে আমরা আবার মাটি থেকে তুলতে পারব এবং একে প্রবল দুঃখের সময় আকাশে স্থাপন করতে পারব।[১২]
অন্যান্য যুক্তিবাদীর বিপরীতে বুবের মিথের বিপক্ষে ছিলেন নাঃ স্বর্গীয় স্ফুলিঙ্গের পৃথিবীতে আটকা পড়ে যাওয়ার লুরিয় মিথ তার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী তাৎপর্যমণ্ডিত মনে হয়েছে। গডহেড হতে স্ফুলিঙ্গের বিচ্ছেদ মানুষের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তুলে ধরে। আমরা যখন অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কিত হই, তখন আদি ঐক্য পুনঃস্থাপিত হয়, জগতে বিচ্ছিন্নতা হ্রাস পায় ।
