১৯৬০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ড্যানিয়েল ডে উইলিয়ামস (জন্ম. ১৯১০) প্রসেস থিওলজি নামে পরিচিত ধর্মতত্ত্বের আবিষ্কার করেন। এখানেও জগতের সঙ্গে ঈশ্বরের ঐক্যের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তিনি ঈশ্বরকে জাগতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে দেখা ব্রিটিশ দার্শনিক এ. এ. হোয়াইটহেড (১৮৬১-১৯৪৭) দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। হোয়াইটহেড স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নিরাসক্ত আরেকটি সত্তা হিসাবে ঈশ্বরের অর্থহীনতা প্রমাণে সফল হয়েছিলেন। তবে ঈশ্বরের গুণাবলী সম্পর্কে বিংশ শতাব্দীর ভাষ্য প্রণয়ন করেছিলেন তিনি:
আমি নিশ্চিত যে সত্তার চলমান সমাজে অংশগ্রহণ করার ফলে ঈশ্বর। কষ্টভোগ করেন। জাগতিক ভোগান্তিতে তাঁর অংশ গ্রহণ এই পৃথিবীতে সৃষ্ট দুঃখ কষ্টকে জানা, গ্রহণ করা ও তাকে ভালোবাসায় রূপান্তরিত করার সর্বোত্তম উদাহরণ। আমি ঐশী সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করছি। এটা ছাড়া আমি ঈশ্বরের সত্তার কোনও অর্থ খুঁজে পাই না।
ঈশ্বরকে তিনি মহান সঙ্গী, সতীর্থ কষ্টভোগকারী, যিনি বোঝেন এভাবে বর্ণনা করেছেন। উইলিয়ামস্ হোয়াইটহেডের সংজ্ঞা পছন্দ করেছিলেন; ঈশ্বর সম্পর্কে কথা বলার সময় তাঁকে জগতের ‘আচরণ বা কোনও ঘটনা হিসাবে বর্ণনা করতে চাইতেন তিনি। আমাদের বোধের প্রাকৃতিক জগতের উর্ধ্বে অভিপ্রাকৃত ব্যবস্থাকে স্থাপন করা ভুল। অস্তিত্বের কেবল একটা ব্যবস্থাই ছিল । এটা অবশ্য রিডাকশনিস্ট ধারণা নয়। আমাদের প্রকৃতির ধারণায় এক সময় অলৌকিক বলে মনে হওয়া সকল আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এখানে আমাদের ধর্মীয় অনুভূতি’কে আনতে হবে, বৌদ্ধরা যেমন সবসময় করে এসেছে। তার ভাবনায় ঈশ্বর প্রকৃতি হতে আলাদা কিনা জানতে চাওয়া হলে উইলিয়ামস বলতেন, তিনি নিশ্চিত নন। তিনি অ্যাপাথিয়ার প্রাচীন গ্রিক ধারণাকে ঘৃণা করতেন, একে প্রায় ব্লাসফেমাস মনে করেছেন তিনিঃ এটা ঈশ্বরকে দূরবর্তী, উদাসী ও স্বার্থপর হিসাবে তুলে ধরেছে। সর্বেশ্বরবাদের প্রচারণা করার কথা অস্বীকার করেছেন তিনি। তার ধর্মতত্ত্ব স্রেফ অৎশউইয ও হিরোশিমার ঘটনার পর অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা এক বিচ্ছিন্ন ঈশ্বরের ভারসাম্যহীনতা দূর করার প্রয়াস ছিল।
অন্যরা আধুনিক পৃথিবীর সাফল্যের ব্যাপারে কম আশাবাদী রয়ে গিয়েছে এবং নারী-পুরুষের প্রতি চ্যালেঞ্জ স্বরূপ এক দুৰ্জেয় ঈশ্বরকে বহাল রাখতে চেয়েছে। জেসুইট কার্ল রাহনার অধিকতর দুয়েমূলক ধর্মতত্ত্ব প্রণয়ন করেছেন, যা ঈশ্বরকে চূড়ান্ত রহস্য ও জেসাসকে মানুষের সম্ভাবনার চরম প্রকাশ হিসাবে দেখে। বার্নার্ড লনারগানও অনুভূতির বিপরীতে দুয়েতা ও চিন্তার গুরুত্বের ওপর জের দিয়েছেন। স্বাধীন বুদ্ধি আকাঙ্ক্ষিত দর্শন খুঁজে পায় না; এটা ক্রমাগত আমাদের মনোভাবের পরিবর্তন দাবি করে এমন উপলব্ধির বাধার মুখোমুখি হচ্ছে। সকল সংস্কৃতিতেই মানুষ একই রকম তাগিদে তাড়িত হয়ে আসছে: বুদ্ধিমান, দায়িত্বশীল, যুক্তিবান, প্রেমময় ও প্রয়োজনে পরবর্তিত হতে হবে। সুতরাং মানুষের মৌল চরিত্র নিজেকে এবং আমাদের প্রচলিত ধারণাকে ছড়িয়ে যাবার দাবি করে; এই নীতি মানুষের আন্তরিক অনুসন্ধানী প্রকৃতিতে ঐশী হিসাবে আখ্যায়িত সত্তায় ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু তারপরেও সুইস ধর্মতাত্ত্বিক হান্স উরস ফন বালতাসার বিশ্বাস করেন, যুক্তি ও বিমূর্ততায় ঈশ্বরকে খোঁজার বদলে আমাদের শিল্পকলার দিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত; ক্যাথলিক প্রত্যাদেশ আবশ্যিকভাবে অবতারমূলক। দান্তে ও বোনাভেঞ্চারের ওপর অসাধারণ গবেষণায় বালতাসার দেখিয়েছেন, ক্যাথলিকরা ঈশ্বরকে মানবরূপে দেখেছে’। ধর্মীয় আচার ও নাটকের অঙ্গভঙ্গিতে সৌন্দর্যের ওপর গুরুত্ব দান ও শ্রেষ্ঠ ক্যাথলিক শিল্পীদের সৌন্দর্য চেতনা ইঙ্গিত দেয় ঈশ্বরকে অনুভূতি দিয়ে পাওয়া যাবে, মানুষের অধিকতর বৌদ্ধিক ও বিমূর্ত অংশ দিয়ে নয়।
মুসলিম এবং ইহুদিরাও বর্তমানের সঙ্গে মানানসই ঈশ্বর সম্পর্কিত ধারণা আবিষ্কারের লক্ষ্যে অতীতের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়াস পেয়েছে। উল্লেখযোগ্য পাকিস্তানি ধর্মতাত্ত্বিক আবু আল-কালাম আজাদ (মৃত্যু, ১৯৫৯) এমন এক ঈশ্বরকে পাবার জন্যে কোরানের আশ্রয় নিয়েছেন যিনি এমন দুয়ে নন যে একেবারে অকার্যকর হয়ে গেছেন বা এতটা ব্যক্তিক নন যে মূর্তিতে পরিণত হয়েছেন। তিনি কোরানের আলোচনার প্রতীকী ধরনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, একদিকে রূপক, মূর্ত এবং নরত্বমূলক বর্ণনার ভারসাম্যের কথা উল্লেখ করেছেন, অন্যদিকে আবার ঈশ্বর যে তুলনার অযোগ্য বারবার সেকথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন। অন্যরা জগতের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্কের ধারণা পেতে সুফীদের কাছে ফিরে গেছে। সুইস সুফী ফ্রিসিয়ক শুয়োন পরবর্তীকালে ইবন আল-আরাবীর নামে খ্যাত সত্তার একত্ব মতবাদের (ওয়াহয়দাত আল উজুদ) পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছেন যেখানে বলা হয়েছে যে যেহেতু ঈশ্বরই একমাত্র বাস্তবতা, তিনি ছাড়া আর কোনও কিছুর অস্তিত্ব নেই এবং খোদ এই জগৎ যথার্থভাবেই ঐশ্বরিক। এটা একটা নিগূঢ় সত্যি এবং সুফীদের অতিন্দ্রীয়বাদী অনুশীলনের পটভূমিতেই অনুধাবন করা যেতে পারে, একথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি এর যথার্থতা প্রতিপন্ন করেছেন।
