পল টিলিচ (১৮৬৮-১৯৬৫) বিশ্বাস করতেন যে, পাশ্চাত্যের আস্তিক্যবাদের ব্যক্তিক ঈশ্বরকে অবশ্যই বিদায় নিতে হবে, আবার তার বিশ্বাস ছিল যে মানবজাতির জন্যে ধর্মের প্রয়োজন। গভীর উদ্বেগ মানবীয় অবস্থার অংশ: এটা মানসিক বৈকল্য নয়, কেননা এটা অনেপনীয় ও কোনও চিকিৎসাতেই নিরাময়যোগ্য নয়। আমরা আমাদের দেহকে ক্রমান্বয়ে অথচ অপ্রতিরোধ্যভাবে ক্ষয়ে যেতে দেখে অবিরাম নিশ্চিহ্ন হওয়ার আতঙ্ক আর শঙ্কায় থাকি। টিলিচ নিৎশের সঙ্গে একমত হয়েছেন যে, ব্যক্তিক ঈশ্বর একটি ক্ষতিকর ধারণা এবং মরণই তাঁর প্রাপ্য:
স্বাভাবিক ঘটনাপ্রবাহে হস্তক্ষেপকারী ব্যক্তিক ঈশ্বরের ধারণা, কিংবা ‘স্বাভাবিক ঘটনাবলীর স্বাধীন কারণ হিসাবে ঈশ্বরের ধারণা ঈশ্বরকে অন্যান্য বস্তুর পাশাপাশি আরেকটি বস্তুতে, সত্তাসমূহের মাঝে একটা সত্তায় পরিণত করে, হতে পারে সর্বোত্তম, কিন্তু তারপরেও একটি সত্তা। এটা প্রকৃতপক্ষে কেবল ভৌত ব্যবস্থারই বিনাশ নয় বরং ঈশ্বরের কোনও অর্থপূর্ণ ধারণারও বিনাশ।
সারাক্ষণ বিশ্বকে মেরামতে ব্যস্ত একজন ঈশ্বর অসম্ভব; মানুষের স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতায় হস্তক্ষেপকারী একজন ঈশ্বর স্বেচ্ছাচারী। ঈশ্বরকে যদি তার আপন জগতে একটি সত্তা হিসাবে, একটি সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত অহম, কাজের সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি কারণ হিসাবে দেখা হয়, তিনি তাহলে খোদ সত্তা নন। একজন সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞাত স্বৈরাচারী পার্থিব স্বৈরশাসকদের চেয়ে ভিন্ন কিছু নন তিনি, যারা সমস্ত কিছুকে, সবাইকে তাদের নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের পরিণতি করে থাকেন। এ রকম একজন ঈশ্বরকে প্রত্যাখ্যানকারী নাস্তিক্যবাদ যথার্থই যুক্তিসঙ্গত।
এর বদলে আমাদের এই ব্যক্তিক ঈশ্বরের ঊর্ধ্বে এক ঈশ্বরের সন্ধান করা উচিত। এখানে নতুন কিছু নেই। বাইবেলের কাল থেকেই আস্তিকরা তাদের উপাস্য ঈশ্বরের বৈপরীত্যমূলক রূপ সম্পর্কে সচেতন ছিল, তারা জানত অত্যাবশ্যকীয় আন্তব্যক্তিক ঐশ্বরিকতা ব্যক্তি ঈশ্বরের ভারসাম্য বজায় রেখেছে। প্রতিটি প্রার্থনাই একেকটি স্ববিরোধিতা, কেননা তা এমন কারও সঙ্গে কথা বলার প্রয়াস যার সঙ্গে কথা বলা অসম্ভব; এর মাধ্যমে এমন কারও আনুকুল্য চাওয়া হয় যিনি প্রার্থনার আগেই হয় তা দান করেছেন বা করেননি; এটা এমন এক ঈশ্বরকে ‘তুমি’ বলে, যিনি খোদ সত্তা হিসাবে আমাদের অহমের চেয়েও ‘আমি’র অনেক কাছাকাছি। টিলিচ অস্তিত্বের মূল হিসাবে ঈশ্বরের সংজ্ঞাকে বেছে নিয়েছেন। ঈশ্বরের উর্ধ্বে এমন ঈশ্বরে অংশগ্রহণ। জগৎ থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে না, বরং বাস্তবতায় নিমজ্জিত করে। এটা। আমাদেরকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়। খোদ-সত্তা সম্পর্কে কথা বলার সময় মানুষকে প্রতাঁকের আশ্রয় নিতে হয়; এর সম্পর্কে আক্ষরিক বা। বাস্তবভিত্তিক কথা বলা ভুল ও অসত্য। শত শত বছর ধরে ‘ঈশ্বর, কর্তৃত্ব ‘অমরত্ব’ প্রতীকগুলো মানুষকে জীবনের আতঙ্ক ও মৃত্যুর ভয়াবহতা বহনে সক্ষম করে তুলেছে, কিন্তু এসব প্রতীক যখন তাদের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখন দেখা দেয় ভয় আর সন্দেহ। যারা এই শঙ্কা ও উদ্বেগের মুখোমুখি হয়েছে তাদের উচিত প্রতীকী শক্তি হারিয়ে ফেলা আস্তিক্যবাদের মর্যাদারহিত ‘ঈশ্বরের ঊর্ধ্বের ঈশ্বরের সন্ধান করা।
সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বক্তব্য রাখার সময় টিলিচ কৌশলগত পরিভাষা ‘অস্তিত্বের মূলকে পরম বিষয়’ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করতে পছন্দ করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এই ‘ঈশ্বরের ঊর্ধ্বে ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখার মানবীয় অনুভূতি আমাদের আবেগ বা বুদ্ধিবৃত্তিক বোধের অন্যান্য অবস্থা থেকে পৃথকযোগ্য কোনও বিশেষ অবস্থা নয়। আপনি বলতে পারবেন না যে, আমি এখন এক বিশেষ ধর্মীয় অভিজ্ঞতা লাভ করছি, কেননা ঈশ্বর, যিনি সত্তা ও আমাদের সকল সাহস, আশা ও নিরাশার পূর্বগামী ও মূল ভিত্তি। এটা কোনও নাম বিশিষ্ট সুস্পষ্ট কোনও অবস্থা নয় বরং তা আমাদের স্বাভাবিক মানবীয় অনুভূতিকে আচ্ছন্ন করে রাখে। শত বৎসর আগে ঈশ্বর স্বাভাবিক মানবীয় মনস্তত্ত্ব হতে অবিচ্ছেদ্য বলে অনুরূপ দাবি করেছিলেন ফয়েরবাখ। এবার এই নাস্তিক্যবাদ এক নতুন আস্তিক্যবাদে পরিণত হয়েছে।
উদারপন্থী ধর্মতাত্ত্বিকরা একাধারে বিশ্বাস রাখা ও আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক পৃথিবীতে বাস সম্ভব কি না আবিষ্কার করার প্রয়াস পাচ্ছিলেন। ঈশ্বর সম্পর্কে নতুন ধারণা সৃষ্টি করতে গিয়ে তারা অপরাপর শাস্ত্রের শরণাপন্ন হয়েছেন; বিজ্ঞান, মনস্তত্ব, সমাজ বিজ্ঞান ও অন্যান্য ধর্ম। আবার, এই প্রচেষ্টায় নতুন কিছু ছিল না। আলেকজান্দ্রিয়ার অরিগেন এবং ক্লিমেন্ট এই অর্থে তৃতীয় শতাব্দীর উদারপন্থী ক্রিশ্চান ছিলেন, যখন তারা ইয়াইওয়েহ্র সেমিটিক ধর্মে প্লেটোনিজম প্রয়োগ করেছেন। এবার জেসুইট পিয়েরে তিলহার্দ (১৮৮১-১৯৫১) ঈশ্বরে তার বিশ্বাসের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানকে মেশালেন। তিনি প্রগৈতিহাসিক জীবনে বিশেষভাবে আগ্রহী প্যালিওন্টোলজিস্ট ছিলেন; নিজ বিবর্তনবাদের উপলব্ধিকে এক নতুন ধর্মতত্ত্ব প্রণয়নে ব্যবহার করেছেন। গোটা বিবর্তন প্রক্রিয়াকে তিনি এক ঐশীশক্তি হিসাবে দেখেছেন যা বিশ্বজগতকে বস্তু থেকে আত্মা, তারপর ব্যক্তি ও সবশেষে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে ঈশ্বরের দিকে ধাবিত করেছে। ঈশ্বর পৃথিবীতে সর্বব্যাপী এবং অবতার, যা তার সত্তার স্যাক্রামেন্টে পরিণত হয়েছে। দে শার্দিন মত প্রকাশ করেছেন যে, মানুষ জেসাসের প্রতি মনোনিবেশ করার বদলে ক্রিশ্চানদের উচিত কলোসিয় ও এফিসিয়দের উদ্দেশে লেখা পলের চিঠির ক্রাইস্টের কসমিক পোর্ট্রেট গড়ে তোলা: এই দৃষ্টিকোণে ক্রাইস্ট ছিলেন বিশ্বজগতের ‘ওমেগা পয়েন্ট, বিবর্তন প্রক্রিয়ার ক্লাইমেক্স, যখন সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন ঈশ্বর। ঐশীগ্রন্থ আমাদের বলে যে, ঈশ্বরই ভালোবাসা আর বিজ্ঞান দেখায় যে, প্রাকৃতিক জগৎ বৃহৎ জটিলতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং এই বৈচিত্র্যের মাঝেই বৃহৎ ঐক্যের অভিসারী। পার্থক্যের মাঝে এই ঐক্য সমগ্র সৃষ্টিকে সচল করে ভোলা ভালোবাসা প্রত্যক্ষ করার আরেকটি উপায়। ঈশ্বরকে জগতের সঙ্গে পরিপূর্ণভাবে মিলিয়ে ফেলায় এর সকল দুয়েতার অনুভূতি হারিয়ে যাওয়ায় দে শার্দিনের সমালোচনা করা হয়েছে, কিন্তু তার এই জাগতিক ধর্মতত্ত্ব ছিল প্রায়শঃ ক্যাথলিক আধ্যাত্মিকতাকে বৈশিষ্ট্যয়িতকারী contemptus mundi হতে এক কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন।
