রেডিক্যাল থিওলজি অ্যান্ড দ্য ডেথ অভ গড (১৯৬৬)-এ উইলিয়াম হ্যাঁমিল্টন উল্লেখ করেছেন যে, এ ধরনের ধর্মতত্ত্বের শেকড় রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে সবসময়ই এক ধরনের ইউটোপিয় ঝোঁক ছিল এবং নিজস্ব কোনও ঐতিহ্য ছিল না। ঈশ্বরের মৃত্যুর ইমেজারি প্রযুক্তির যুগের বর্বরতা ও উম্মুল অবস্থাকে তুলে ধরে যা পুরোনো কায়দায় বাইবেলের ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস স্থাপন অসম্ভব করে তুলেছে। এই ধর্মতাত্ত্বিক ভাবনাকে হ্যাঁমিল্টন বিংশ শতাব্দীতে প্রটেস্ট্যান্ট হবার উপায় হিসাবে দেখেছেন। লুথার মঠ ছেড়ে জগতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। একইভাবে তিনি ও অন্য ক্রিশ্চান চরমপন্থীরাও ঘোষিত সেকুলার ছিলেন। তারা ঈশ্বরের আবাস পবিত্র স্থান থেকে দূরে সরে গিয়ে প্রযুক্তি, ক্ষমতা, যৌনতা, অর্থ ও নগরীর পড়শীদের মাঝে মানুষ জেসাসের সন্ধান করেছেন। আধুনিক সেকুলার মানুষের ঈশ্বরের প্রয়োজন ছিল না। হ্যাঁমিল্টনের মনে কোনও ঈশ্বর-আকৃতি গহবর ছিল না। এই পৃথিবীতেই তিনি তার সমাধান খুঁজে পাবেন।
ষাটের দশকের এই প্রাণবন্ত আশাবাদে একটা কিছু কিন্তু রয়েছে। অবশ্যই চরমপন্থীরা ঠিকই বলেছিল যে, অনেকের বেলাতেই অতীতের ভাষায় ঈশ্বর সম্পর্কে আলোচনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে এই মুক্তি ও এক নতুন ভোরের সম্ভাবনা অনুভব দুঃখজনকভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি সময়ে সময়ে ঈশ্বরের মৃত্যুর সমর্থক ধর্মবিদরা সমালোচিত হয়েছেন, কেননা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বচ্ছল, মধ্যবিত্ত শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের। জেমস এইচ, কোনের মতো কৃষ্ণাঙ্গ ধর্মদিরা জানতে চেয়েছেন শ্বেতাঙ্গরা যেখানে নিজেরাই ঈশ্বরের নামে আসলে মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি করে রেখেছে সেখানে কী করে তারা ঈশ্বরের মৃত্যুর ফলে তাদের মুক্তি নিশ্চিত করার অধিকার আছে মনে করে। ইহুদি ধর্মবিদ রিচার্ড রুবেনস্তাইন নাৎসি হলোকাস্টের পর এত তাড়াতাড়ি কীভাবে তারা ঈশ্বরহীন। মানুষ সম্পর্কে এতটা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতে পারছে বুঝতে পারেননি। তিনি স্বয়ং বিশ্বাস করেছেন যে, ইতিহাসের ঈশ্বর হিসাবে গৃহীত উপাস্য অশউইযেই চিরদিনের জন্যে পরলোকগমন করেছেন। কিন্তু তারপরেও রুবেনস্তাইন ভাবতে পারেননি যে ইহুদিরা ধর্মকে বাদ দিতে পারবে। ইউরোপিয় ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রায় বিলুপ্তির পর অবশ্যই তাদের অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। অবশ্য উদারপন্থী। ইহুদিবাদের চমৎকার নীতিবান ঈশ্বর সঠিক ছিলেন না। ইনি বড় বেশি খুঁতহীন, জীবনের দুঃখকষ্টকে অগ্রাহ্য করে করেছেন; ধরে নিয়েছেন জগতের অবস্থার উন্নতি ঘটবে। রুবেনস্তাইন স্বয়ং ইহুদি অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বরকে পছন্দ করতেন। ইসাক লুরিয়ার সিসুম-সৃষ্ট জগতকে অস্তিত্ব দানকারী ঈশ্বরের স্বেচ্ছা-আত্মবিচ্ছিন্নকরণের মতবাদ-এ আলোড়িত হয়েছিলেন তিনি। সকল অতিন্দ্রীয়বাদী ঈশ্বরকে কিছু না হিসাবে দেখেছে, যেখান থেকে আমরা এসেছি এবং আবার যেখানে ফিরে যাব। রুবেনস্তাইন সাত্রর সঙ্গে সায় দিয়েছেন যে, জীবন শূন্য; অতিন্দ্রীয়বাদী ঈশ্বরকে মানুষের এই শূন্যতার অনুভূতিতে প্রকাশ করার কল্পনানির্ভর উপায় হিসাবে দেখেছেন তিনি।
অন্য ইহুদি ধর্মবিদরাও লুরিয়ার কাব্বালায় স্বস্তির সন্ধান লাভ করেছেন। হান্স জোনাস বিশ্বাস করেন যে, অশউইযের পর আমরা আর সর্বশক্তিমান ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে পারি না। ঈশ্বর পৃথিবী সৃষ্টি করার সময় স্বেচ্ছায় নিজেকে সীমিত করেছেন ও মানুষের দুর্বলতার অংশীদার হয়েছেন। এখন আর তাঁর কিছুই করার নেই। মানুষকে অবশ্যই প্রার্থনা ও তোরাহর মাধ্যমে গডহেড ও পৃথিবীর পূর্ণতা ফিরিয়ে দিতে হবে। অবশ্য ব্রিটিশ ধর্মতাত্ত্বিক লুই জ্যাকবস তমিতসুম-এর ইমেজকে কর্কশ ও মানবরূপী বলে ধারণাটিকে অপছন্দ করেন: এটা বড় বেশি আক্ষরিকভাবে ঈশ্বর কীভাবে পৃথিবী সৃষ্টি করলেন সে প্রশ্ন তুলতে উৎসাহিত করে। ঈশ্বর নিজেকে সীমিত করেন না, শ্বাস ত্যাগের আগে, যেমন বলা হয়েছে, শ্বাস বন্ধ করে রাখেন না। একজন অক্ষম ঈশ্বর অকেজো, তিনি মানুষের অস্তিত্বের অর্থ হতে পারেন না। বরং ঈশ্বর মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ; তাঁর চিন্তাধারা ও কৌশল আমাদের মতো নয়–এই ধ্রুপদী ব্যাখ্যায় ফিরে যাওয়াই শ্রেয়। ঈশ্বর বোধের অতীত হতে পারেন, কিন্তু অর্থহীনতার মাঝেও মানুষের সেই অনিবৰ্চনীয় ঈশ্বরকে বিশ্বাস করার এবং একটা অর্থ খুঁজে পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। রোমান ক্যাথলিক ধর্মবিদ হান্স কুঙ জ্যাকবসের সঙ্গে একমত, তমিসতসুম-এর চমকপ্রদ মিথের চেয়ে ট্র্যাজিডির অধিকতর যৌক্তিক ব্যাখ্যা বেছে নিয়েছেন তিনি। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, একজন দুর্বল ঈশ্বরে মানুষ বিশ্বাস রাখতে পারে না, বরং একজন জীবিত ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখে, যিনি অশৎউইযে মানুষকে প্রার্থনা করার শক্তি যুগিয়েছিলেন।
এখনও কিছু মানুষ ঈশ্বরের ধারণার অর্থ খুঁজে পায়। সুইস ধর্মতাত্ত্বিক কার্ল বার্থ (১৮৮৬-১৯৬৮) শ্লেইয়ারম্যাশারের ধর্মীয় অনুভূতির ওপর গুরুত্ব দানসহ উদার প্রটেস্ট্যানিজমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তিনি প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্বেরও অগ্রণী বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করেছেন, যৌক্তিক ভাষায় ঈশ্বরের ব্যাখ্যা চাওয়া মানব মনের সীমাবদ্ধতার কারণে নয়, বরং পতনের ফলে মানুষ অপবিত্র হয়ে গেছে বলে। সুতরাং আমরা ঈশ্বর সম্পর্কে যেকোনও প্রাকৃতিক ধারণাই খুঁজে বের করি না কেন তা ত্রুটিপূর্ণ হতে বাধ্য আর এমন একজন ঈশ্বরের উপাসনা বহু-ঈশ্বরবাদীতারই সামিল। ঈশ্বর-জ্ঞানের একমাত্র বৈধ উৎস হচ্ছে বাইবেল। এটা যেন বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ: অভিজ্ঞতাবাদ, প্রাকৃতিক যুক্তিবাদ; মানুষের মন অপবিত্র ও অবিশ্বস্ত এবং অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাস থেকে শেখার কোনও সম্ভাবনা নেই, কেননা বাইবেল একমাত্র বৈধ প্রত্যাদেশ। বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষমতায় ঐশীগ্রন্থের সত্যতা সম্পর্কে সমালোচনাহীন গ্রহণযোগ্যতাসহ এ রকম চরম সংশয়বাদের সমন্বয় অস্বাস্থ্যকর বলে মনে হয়।
