১৯৫০-এর দশকে এ. জে আয়ারের (১৯১০-৯১) মতো লজিক্যাল পজিটিভিস্টগণ প্রশ্ন তুলেছেন ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখার কোনও অর্থ হয় কিনা। প্রকৃতি বিজ্ঞানসমূহ জ্ঞানের একমাত্র বিশ্বাস ও নির্ভরযোগ্য উৎসের যোগান দিয়েছে, কারণ গবেষণাগারে তা পরীক্ষা করা যায়। ঈশ্বর আছেন কি নেই সে প্রশ্ন করতে যাননি আয়ার, বরং তাঁর জিজ্ঞাসা ছিল ঈশ্বরের ধারণার কোনও অর্থ আছে কি না। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, কোনও বক্তব্যের সত্য মিথ্যা প্রতিপন্ন করা না গেলে তা অর্থহীন। মঙ্গলে বুদ্ধিমান প্রাণী আছে’, বলাটা অর্থহীন নয়, কারণ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি আবিষ্কারের পর এর যাচাই করার উপায় মিলবে বলে আমরা জানি। একইভাবে মহাকাশের বুড়ো মানুষে বিশ্বাসী একজন সাধারণ মানুষও অর্থহীন কথা বলে না, যখন সে বলছে, ‘আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি’: যেহেতু মৃত্যুর পর আমরা জানতে পারব কথাটা সত্যি না মিথ্যা। কিন্তু উন্নত ধরনের বিশ্বাসী সমস্যায় পড়ে যায় যখন সে বলে: “আমরা বুঝতে পারব তেমন কোনও অর্থে ঈশ্বর অস্তিত্ববান নন। কিংবা মানুষ যেভাবে মনে করে ঈশ্বর সেই অর্থে ভালো নন।’ এসব বক্তব্য খুবই অস্পষ্ট; এসব পরীক্ষা বা যাচাই করা অসম্ভব, সুতরাং এগুলো অর্থহীন। আয়ার যেমন বলেছেন: ‘আস্তিক্যবাদ খুবই বিভ্রান্তিময়, যেসব বাক্যে “ঈশ্বর” আবির্ভূত হন সেগুলো এত সঙ্গতিহীন এবং সত্য বা মিথ্যা যাচাই করার ক্ষমতাবিহীন যে মানা বা না মানা কিংবা বিশ্বাস করা বা না করার কথা বলা যৌক্তিক দিক থেকে অসম্ভব। নাস্তিক্যবাদ আস্তিক্যবাদের মতোই দুর্বোধ্য ও অর্থহীন। ঈশ্বরের ধারণায় অস্বীকার বা সন্দেহ প্রকাশ করার মতো কিছু নেই।
ফ্রয়েডের মতো পজিটিভিস্টরা বিশ্বাস করেছেন, ধর্মীয় বিশ্বাস এক অপরিণত অবস্থার পরিচায়ক যা বিজ্ঞান অতিক্রম করবে। ১৯৫০-এর দশকের পর থেকে ভাষাবিদ্যাগত দার্শনিকরা লজিক্যাল পজিটিভিজমের সমালোচনা করে আসছেন, তাঁরা বলেছেন, আয়ার যাকে ‘যাচাইয়ের নীতি’ বলছেন সেটার যাচাই অসাধ্য। বর্তমান যুগে কেবল ভৌত জগৎ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দানে সক্ষম বিজ্ঞান সম্পর্কে আমরা অপেক্ষাকৃত কম আশাবাদী হতে পারি। উইলফ্রেড ক্যান্টওয়েল স্মিথ উল্লেখ করেছেন, লজিক্যাল পজিটিভিস্টরা নিজেদের এমন এক সময়ে বিজ্ঞানী হিসাবে তুলে ধরেছিলেন যখন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞান প্রকৃতিকে মানুষ হতে একেবারে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দেখেছে। যেসব বক্তব্যের দিকে আয়ার ইঙ্গিত করেছেনা সেগুলো বিজ্ঞানের বস্তুগত সত্যের বেলায় খুবই কার্যকর, কিন্তু অপেক্ষাকৃত অস্পষ্ট মানবীয় অনুভূতির পক্ষে মানানসই নয়। কবিতা ও সঙ্গীতের মতো ধর্ম এই ধরনের আলোচনা বা যাচাইয়ের উপযুক্ত নয়। অতি সম্প্রতি অ্যান্টনি ফ্লিউর মতো ভাষাবিজ্ঞানীরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ধর্মীয় ব্যাখ্যার চেয়ে প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা খোঁজাই বেশি যুক্তিপুর্ণ। প্রাচীন প্রমাণ’ এখন আর কাজে আসছে নাঃ পরিকল্পনার যুক্তি অচল হয়ে যাচ্ছে, কেননা প্রাকৃতিক ঘটনাবলী তাদের নিজস্ব নিয়মে নাকি বাহ্যিক কিছু দিয়ে অনুপ্রাণিত সেটা জানার জন্যে আমাদের গোটা ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন। আমরা অনিশ্চিত’ বা ত্রুটিপূর্ণ সত্তা, ওই যুক্তি কিছু প্রমাণ করে না, যেহেতু সবসময়ই একটা ব্যাখ্যা থাকতে পারে যেটা পরম কিন্তু অতি প্রাকৃত নয়। ফয়েরবাখ, মার্ক্স বা অস্তিত্ববাদীদের চেয়ে কম আশাবাদী ফ্লিউ। কষ্টকর বা সগর্ব অস্বীকৃতি নয়, সামনে এগোনোর একমাত্র উপায় হচ্ছে যুক্তি ও বিজ্ঞানের প্রতি সহজ বাস্তব অঙ্গীকার।
আমরা অবশ্য দেখেছি যে, সকল ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি বিশ্বজগতের ব্যাখ্যা পাওয়ার জন্যে ঈশ্বরের দিকে তাকিয়ে থাকেনি। অনেকেই প্রমাণকে অবান্তর প্রসঙ্গ হিসাবে দেখেছে। বিজ্ঞান কেবল সেইসব পশ্চিমা ক্রিশ্চানের কাছেই হুমকি হিসাবে অনুভূত হয়েছে যারা ঐশীগ্রন্থকে আক্ষরিক অর্থে পাঠ করার ও বিভিন্ন মতবাদকে বাস্তব সত্য হিসাবে ব্যাখ্যা করায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। যেসব বিজ্ঞানী ও দার্শনিক তাদের ব্যবস্থায় ঈশ্বরের কোনও স্থান খুঁজে পাননি, তারা সাধারণত ঈশ্বরের ধারণাকে আদি কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন, যা। মধ্যযুগে ইহুদি, মুসলিম ও গ্রিক অর্থডক্সরা পরিত্যাগ করেছে। অধিকতর। অন্তস্থঃ ঈশ্বর-এর সন্ধান করেছে তারা, যিনি সবার জন্যে এক রকম, তাকে কোনও বস্তুগত সত্য হিসাবে প্রমাণ করা যাবে না। তাকে বুদ্ধদের নির্বাণের মতোই বিশ্বজগতের ভৌত ব্যবস্থায় চিহ্নিত করা যাবে না ।
ভাষাবিদ্যাগত দার্শনিকদের চেয়ে আরও নাটকীয় হচ্ছে ১৯৬০-এর দশকের চরমপন্থী ধর্মবিদ যারা সোৎসাহে নিৎশেকে অনুসরণ করে ঈশ্বরের প্রয়াণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। দ্য গস্পেল অভ ক্রিশ্চান অ্যাথিজম (১৯৬৬)-এ টমাস জে, অ্যাল্টাইযার দাবি করেন, ঈশ্বরের মৃত্যুর ‘শুভ সুসংবাদ আমাদের এক স্বৈরাচারী দুজ্ঞেয় উপাস্যের দাসত্ব হতে মুক্ত করেছে: ‘একমাত্র আমাদের অনুভূতিতে ঈশ্বরের মৃত্যু মেনে নিয়ে, এমনকি কামনা করার মাধ্যমেই আমরা এক দুজ্ঞেয় অজানা, এক অজানা অচেনা থেকে মুক্তি পেতে পারি যা ক্রাইস্টের মাঝে ঈশ্বরের আত্মবিচ্ছিন্নতার ফলে শূন্য ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। অ্যাল্টাইযার অতিন্দ্রীয় ভাষায় আত্মার অন্ধকার রাত ও পরিত্যাগের বেদনার কথা বলেছেন। ঈশ্বরের মৃত্যু সেই নীরবতার কথা বলে যা ঈশ্বরের আবার অর্থবহ হয়ে ওঠার আগে প্রয়োজন ছিল। ধর্মতত্ত্বের পুনর্জন্মের জন্যে ঈশ্বর সম্পর্কিত আমাদের সকল ধারণার মৃত্যু ঘটতে হবে। আমরা সবাই এমন এক ভাষা ও ভঙ্গির অপেক্ষায় আছি যেখানে ঈশ্বর আরও একবার এক সম্ভাবনা হয়ে উঠবেন। অ্যাল্টাইযারের ধর্মতত্ত্ব অন্ধকার ঈশ্বরহীন পৃথিবীর প্রতি আঘাত সৃষ্টিকারী এক আবেগময় দাম্ভিকতা, যার প্রত্যাশা যে জগৎ তার গোপনীয়তা ত্যাগ করবে। পল ভ্যান বুরেন ছিলেন আরও স্পষ্ট এবং যৌক্তিক। দ্য সেকুলার মীনিং অভ দ্য গস্পেল (১৯৬৩)-এ তিনি দাবি করেন, এখন আর পৃথিবীতে ক্রিয়াশীল ঈশ্বরের কথা বলা সম্ভব নয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রাচীন পুরাণকে অচল করে দিয়েছে। আকাশের বুড়ো মানুষের ওপর সহজ বিশ্বাস একেবারেই অসম্ভব, কিন্তুধর্মবিদদের অধিকতর উন্নত বিশ্বাসও তাই। আমাদের অবশ্যই ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে নাযারেথের জেসাসকে আঁকড়ে ধরতে হবে। গস্পেল এক মুক্তপুরুষের সুসমাচার যিনি অন্যদেরও মুক্তি দিয়েছিলেন। নাযারেথের জেসাসই ছিলেন মুক্তিদাতা, যিনি মানুষ বলতে যা বোঝায় তার সংজ্ঞা দিয়েছেন।
