কিন্তু তারপরেও একথা সত্যি, এমনকি অশওঁইযেও কিছুসংখ্যক ইহুদি তালমুদ পড়া চালিয়ে গেছে, প্রচলিত উৎসব পালন করেছে, ঈশ্বর তাদের উদ্ধার করবেন এই আশায় নয়, বরং এর একটা অর্থ খুঁজে পাওয়া গেছে বলে । একটা গল্প চালু আছে যে, অশউইযে একদিন একদল ইহুদি ঈশ্বরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। ঈশ্বরের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতা ও বিশ্বাসঘাকতার অভিযোগ আনে তারা। জবের মতো তারাও অশুভের সমস্যা ও বর্তমান অশ্লীলতার মাঝে দুর্ভোগের প্রচলিত জবাবে সান্ত্বনা খুঁজে পায়নি। ঈশ্বরের পক্ষে তারা কোনও অজুহাত পায়নি, অপরাধের গুরুত্ব হ্রাস করতে পারে এমন কোনও পরিস্থিতিও দেখেনি, তো, তারা তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য বলে ঘোষণা দেয়। র্যাব্বাই রায় ঘোষণা করেন। তারপর মুখ তুলে তাকিয়ে বলেন, বিচারের কাজ শেষ; এখন সান্ধ্য প্রার্থনার সময় হয়েছে।
১১. ঈশ্বরের কি ভবিষ্যৎ আছে?
আমরা দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষ দিকে এগিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে এখন ধারণা জন্মাচ্ছে যে, আমাদের চেনা পরিচিত পৃথিবী যেন অতীত হয়ে যাচ্ছে। দশকের পর দশক আমরা এই জ্ঞান নিয়ে বসবাস করে এসেছি যে আমাদের আবিষ্কৃত মারণাস্ত্র পৃথিবীর বুকে থেকে মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার ক্ষমতা রাখে। ঠাণ্ডা লড়াই হয়তো-বা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা পুরোনোটির চেয়ে কম ভীতিকর ঠেকছে না। আমরা এক প্রতিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি। এইডস ভাইরাস এক অকল্পনীয় মাত্রার মহামারী ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি সৃষ্টি করেছে। আগামী দুই কি তিন প্রজন্মের ব্যবধানেই জনসংখ্যা গ্রহটির ধারণ ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। হাজার হাজার মানুষ দুর্ভিক্ষ ও খরায় মারা যাচ্ছে। আমাদের আগের প্রজন্মগুলোও পৃথিবীর ধ্বংস আসন্ন মনে করেছে, কিন্তু তারপরেও যেন মনে হচ্ছে আমরা এক কল্পনাতীত ভবিষ্যতের মোকাবিলা করছি। আসছে বছরগুলোয় ঈশ্বরের ধারণা কীভাবে টিকে থাকবে? বিগত ৪,০০০ বছর ধরে চলমান সময়ের প্রয়োজন মাফিক এই ধারণা অভিযোজিত হয়ে এসেছে, কিন্তু আমাদের শতকে মানুষ ক্রমবর্ধমান হারে লক্ষ করছে যে, এই ধারণটি এখন আর তাদের কাজে আসছে না। ধর্মীয় ধারণাসমূহ যখন আর কার্যকর থাকে না তখন সেগুলো আস্তে আস্তে হারিয়ে যায়। ঈশ্বর হয়তো আসলেই অতীতের ধ্যান-ধারণার অংশ। আমেরিকান পণ্ডিত পিটার বার্জার উল্লেখ করেছেন, আমরা প্রায়শঃ আমাদের সময়ের সঙ্গে অতীতের তুলনা করার সময় দ্বৈতনীতি অনুসরণ করি। অতীতকে যেখানে বিশ্লেষণ করে আপেক্ষিক করে তোলা হয়, বর্তমানকে সেখানে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়; আমাদের বর্তমান অবস্থান পরম এক অবস্থায় পরিণত হয়। এভাবেই ‘নিউ টেস্টামেন্টের রচয়িতাদের তাঁদের সময়ের ভ্রান্ত সচেতনতায় আক্রান্ত হিসাবে দেখা হয়, কিন্তু বিশ্লেষক তাঁর সময়ের সচেতনতাকে অবিমিশ্র বুদ্ধিবৃত্তিক আর্শীবাদ ধরে নেন। ঊনবিংশ ও প্রাক-বিংশ শতাব্দীর সেকুলারিস্টরা নাস্তিক্যবাদকে বিজ্ঞান যুগে মানুষের অপরিবর্তনীয় অবস্থা হিসাবে বিবেচনা করেছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে বহু যুক্তি আছে। ইউরোপে চার্চগুলো শূন্য হয়ে আসছে; নাস্তিক্যবাদ আর মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবী অগ্রপথিকের কষ্টার্জিত আদর্শ নয়, বরং সর্বজনীন এক অনুভূতি। অতীতে এটা সব সময় ঈশ্বর সম্পর্কিত বিশেষ কোনও বিশ্বাস বা ধারণা হতে উদ্ভূত হয়েছে, কিন্তু এখন যেন তা ঈশ্বরবাদের সঙ্গে অন্তর্গত সম্পর্ক হারিয়ে এক সেকুলার সমাজে বাস করার অভিজ্ঞতার সক্রিয় সাড়ায় পরিণত হয়েছে। নিৎশের সেই উন্মাদ ব্যক্তিটিকে ঘিরে রাখা আমোদিত জটলার মতো অনেকেই ঈশ্বরবিহীন জীবনযাপনের সম্ভাবনায় এখন অবিচালিত। অন্যরা তাঁর অনুপস্থিতিকে ইতিবাচক স্বস্তি হিসাবে দেখছে। আমাদের মধ্যে যারা অতীতে ধর্ম নিয়ে সঙ্কটপূর্ণ সময়ের মোকাবিলা করেছে তারা আমাদের ছোটবেলাকে আতঙ্কিতকারী ঈশ্বর হতে মুক্তিলাভকে স্বস্তিকর মনে করছে। এক প্রতিহিংসা পরায়ণ উপাস্যের সামনে আতঙ্কে নত না হওয়াটা সত্যি অসাধারণ সুন্দর, যিনি তাঁর আইন না মেনে চললে অনন্ত নরকবাসের ভয় দেখান। আমাদের এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা এসেছে; আমরা সাহসের সাথে ধর্ম বিশ্বাসের কঠিন বিধি-বিধানের আশপাশে ঘুরঘুর না করে নিজস্ব ধ্যান-ধারণা নিয়ে সামনে এগুতে পারি-অখণ্ডতা হারানোর অবিরাম ভয় নিয়ে থাকতে হয় না। আমরা মনে করি ভীষণ উপাস্যের যে অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে তিনি ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিমদের প্রকৃত ঈশ্বর; আমরা কখনও উপলব্ধি করি না যে, ব্যাপারটা দুর্ভাগ্যজনক বিভ্রান্তি মাত্র।
নিঃসঙ্গতার বিষয়টিও রয়েছে। জঁ-পল সার্ত (১৯০৫-৮০) মানুষের চৈতন্যে ঈশ্বরাকার গহ্বরের কথা বলেছেন, যেখানে ঈশ্বর সব সময় ছিলেন। তা সত্ত্বেও, তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, যদি ঈশ্বর থেকেও থাকেন তবুও তাঁকে প্রত্যাখ্যান করা প্রয়োজন, কেননা ঈশ্বরের ধারণা আমাদের স্বাধীনতাকে অচল করে দেয়। প্রচলিত ধর্মগুলো আমাদের বলে যে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার জন্যে আমাদের অবশ্যই মানুষ সম্পর্কিত ঈশ্বরের ধারণার একরূপ হতে হবে। এর বদলে মানুষকে অবশ্যই আমাদের মুক্তিকে প্রতিরূপ হিসাবে দেখতে হবে । সাত্রের নাস্তিক্যবাদ সান্ত্বনাদায়ক বিশ্বাস ছিল না, তবে অন্য অস্তিত্ববাদীগণ ঈশ্বরের অনুপস্থিতিকে ইতিবাচক মুক্তি হিসাবে দেখেছেন। মরিস মারলঅ-পন্তি (১৯০৮-৬১) যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ঈশ্বর আমাদের বিস্ময়ের বোধ বৃদ্ধি করার বদলে তা নাকচ করে দেন। ঈশ্বর যেহেতু পরম সম্পূর্ণতার প্রতিনিধিত্ব করেন, আমাদের আর কিছু করার বা অর্জনের থাকে না। আলবার্ট কামু (১৯১৩-৬০) এক বীরত্ব সূচক নাস্তিক্যবাদের প্রচার করেছেন। মানুষের সকল প্রেমময় অনুভব মানবজাতির ওপর বর্ষণ করার জন্যে ঈশ্বরকে প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যান করা উচিত। বরাবরের মতো নাস্তিকদের একটা যুক্তি রয়েছে। ঈশ্বরকে প্রকৃতপক্ষেই অতীতে সৃজনশীলতা রোধ করার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি যদি সকল প্রশ্ন ও সমস্যার সামগ্রিক জবাব হয়ে থাকেন তাহলে সত্যিই তিনি আমাদের বিস্ময়ের অনুভূতি বা সাফল্যের বোধকে রুদ্ধ করে দিতে পারেন। এক প্রবল ও অঙ্গিকারবদ্ধ নাস্তিক্যবাদ পরিশ্রান্ত বা অপর্যাপ্ত আস্তিক্যবাদের চেয়েও বেশি ধর্মীয় হয়ে উঠতে পারে।
