যায়নবাদীর আর ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই, সে নিজেই স্রষ্টা।
অন্য যায়নবাদীরা অধিকতর প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসে নিষ্ঠ রয়ে গিয়েছিল। প্যালেস্তাইনী ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রবীন র্যাবাইর দায়িত্ব পালনকারী কাব্বালিস্ট আব্রাহাম ইসাক কুকের (১৮৬৫-১৯৩৫) ইসরায়েলে পা রাখার আগে জেন্টাইল বিশ্বের সঙ্গে তেমন একটা যোগাযোগ ছিল না। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ঈশ্বরের সেবা করার ধারণা যতদিন ধর্মের আদর্শ ও কর্তব্য হতে ভিন্ন একটি নির্দিষ্ট সত্তার সেবা হিসাবে সঙ্গায়িত হবে ততদিন তা বিশেষ বস্তুসমূহে মনোযোগী অপরিণতি দৃষ্টিভঙ্গি হতে মুক্ত হবে না। ঈশ্বর ভিন্ন এক সত্তা নন। ব্যক্তিত্ব জাতীয় সকল মানবীয় ধারণার উধ্বে এন সফ। ঈশ্বরকে সত্তা বিশেষ হিসাবে কল্পনা করতে যাওয়া বহু ঈশ্বরবাদীতা ও আদিম মানসিকতায় লক্ষণ। ইহুদি ট্র্যাডিশনে সিক্ত ছিলেন কুক, কিন্তু তিনি যায়নিস্ট আদর্শে আতঙ্ক বোধ করেননি। একথা সত্য যে, ধর্মকে ঝেড়ে ফেলার কথা বিশ্বাস করত শ্রমবাদীরা, কিন্তু নাস্তিক্যবাদী যায়নবাদ ছিল একটা পর্যায় মাত্র। অগ্রগামীদের মাঝে তৎপর ছিলেন ঈশ্বর: স্বর্গীয় স্ফুলিঙ্গসমূহ’ এসব ‘খোসার’ অন্ধকারে বন্দি হয়ে উদ্ধারের প্রতীক্ষায় ছিল। তারা ভাবুক বা না ভাবুক, ইহুদিরা মূলত ঈশ্বরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত ছিল এবং নিজেদের অজান্তেই ঈশ্বরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছিল। নির্বাসনের সময় পবিত্র আত্মা তার জাতিকে ত্যাগ করে গিয়েছিলেন। শেকিনাহকে সিনাগগ ও পাঠকক্ষে লুকিয়ে রেখেছিল তারা। কিন্তু ইসরায়েল অচিরেই পৃথিবীর আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে পরিণত হবে, জেন্টাইলদের সামনে ঈশ্বরের প্রকৃত ধারণা প্রকাশ করবে।
এ ধরনের আধ্যাত্মিকতা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াতে পারে। পবিত্র ভূমির প্রতি অতিভক্তি আমাদের কালেই ইহুদি মৌলবাদীদের বহুঈশ্বরবাদীতার জন্ম দেবে। ঐতিহাসিক ইসলামের প্রতি ভক্তি মুসলিম বিশ্বে অনুরূপ মৌলবাদ সৃষ্টিতে অবদান রেখেছে। ইহুদি ও মুসলিম উভয়ই এক অন্ধকার জগতে অর্থ খুঁজে পাওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। ইতিহাসের ঈশ্বর যেন তাদের হতাশ করেছেন। যায়নবাদীরা তাদের জনগণের চূড়ান্ত বিনাশের ভয় করে ভুল করেনি। বহু ইহুদির কাছেই ঈশ্বরের প্রচলিত ধারণা এক অসম্ভাব্যতার রূপ নেবে। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এলি ওয়েইসেল হাঙেরিতে ছেলেবেলায় কেবল ঈশ্বরের জন্যে বেঁচেছিলেন; তালমুদের বিধিবিধান অনুযায়ী গড়ে উঠেছিল তার জীবন; একদিন কাব্বালাহর রহস্যে দীক্ষা নেওয়ার আশা ছিল তার। বালক বয়সে তাকে প্রথমে অশওঁই ও পরে বুচেনভন্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। মৃত্যু শিবিরে প্রথম রাতেই ক্রিমাটোরিয়াম থেকে কুত্তলী পাকানো ধোঁয়া উঠতে দেখে-যেখানে তাঁর মা বোনের মৃতদেহ নিক্ষেপ করার কথা ছিল-তিনি বুঝে যান যে অগ্নিশিখা তাঁর বিশ্বাসকে গ্রাস করে নিয়েছে। এমন এক জগতে ছিলেন তিনি যা কল্পিত ঈশ্বরবিহীন জগতেরই বাস্তব রূপ। রাত্রির সেই নৈঃশব্দ্য কোনওদিনই ভোলা উচিত হবে না আমার, যা চিরদিনের জন্যে আমার বাঁচার আকাক্ষা দূর করে দিয়েছিল, বহু বছর পর লিখেছেন তিনি, আমার ঈশ্বর, আমার আত্মা ও আমার স্বপ্নকে চুরমার দেওয়া এই মুহূর্তগুলোর কথাও কখনও ভুলব না আমি।
গেস্টাপো একদিন একটা শিশুকে গলায় দড়ি দিয়ে হত্যা করে। হাজার হাজার দর্শকের সামনে একটা বাচ্চা ছেলেকে ফাঁসিতে ঝোলানোয় এমনকি এসএস পর্যন্ত বিব্রত বোধ করেছে। শিশুটির, স্মৃতিচারণ করেছেন ওয়েইসেল ‘চেহারা ছিল ‘বিষণ্ণ-চোখ দেবদূতের মতো; ফাঁসির মঞ্চে ওঠার সময় চুপচাপ, একেবারে ফ্যাকাশে আর প্রায় শান্ত দেখাচ্ছিল তাকে। ওয়েইসেলের পেছন থেকে বন্দিদের কেউ একজন জানতে চেয়েছে: ‘ঈশ্বর কোথায়? কোথায় তিনি? আধঘণ্টা লেগেছিল শিশুটি মারা যেতে। এই সময় বন্দিরা তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিল। একই লোক আবার জিজ্ঞেস করেছে; ঈশ্বর এখন কোথায়?’ তখন ভিড়ের ভেতর একটা কণ্ঠস্বরকে জবাব দিতে শুনেছেন ওয়েইসেল: ‘কোথায় তিনি? তিনি এখানে-এখানে ফাঁসিতে ঝুলে আছেন।
দস্তয়েভস্কি বলেছিলেন, একটি শিশুর মৃত্যুও ঈশ্বরকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে, কিন্তু এমনকি তিনিও, যার সঙ্গে নিষ্ঠুরতার পরিচয় ছিল, এ রকম অবস্থায় কোনও শিশুর মৃত্যু কথা কল্পনা করেননি। অশউঁইযের বিভীষিকা ঈশ্বরের প্রচলিত ধারণায় বিশ্বাসী আরও অনেকের কাছেই প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছিল। দুৰ্জেয় অ্যাপাথিয়ায় হারিয়ে যাওয়া দার্শনিকদের দূরবর্তী ঈশ্বর অসহনীয় হয়ে উঠেছেন। ইহুদিদের অনেকেই আর ইতিহাসে নিজেকে প্রকাশকারী ঈশ্বরের বাইবেলিয় ধারণায় বিশ্বাস রাখতে পারেনি। যিনি, ওয়েইসেলের সঙ্গে তারাও বলে, অশউইযে প্রাণ হারিয়েছেন। আমাদের বৃহত্নপ ব্যক্তিক ঈশ্বরের ধারণা অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে মোকাবিলা করা হয়েছে। এই ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হলে হলোকাস্ট ঠেকাতে পারতেন। ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে থাকলে তিনি অক্ষম, অপ্রয়োজনীয়; আর থামানোর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও না থামানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে তিনি দানব। হলোকাস্ট যে প্রথাগত ধর্মতত্ত্বের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে, এ বিশ্বাস কেবল ইহুদিদের একার নয়।
