ঘোষিত সমাজতান্ত্রিক আদর্শ সত্ত্বেও যায়নবাদ নিজেকে উৎপত্তিগতভাবেই প্রচলিত ধর্মীয় পরিভাষায় প্রকাশ করেছে; অত্যাবশ্যকীয়ভাবে এক নিরীশ্বরবাদী ধর্ম ছিল এটা। ভবিষ্যতের জন্যে ভাবাবেশ ও অতিন্দ্রীয়বাদী আশায় ভরপুর ছিল। উদ্ধার লাভ, তীর্থযাত্রা ও পুনর্জন্মের প্রাচীন থিমের ওপর নির্ভরশীল। যায়নবাদীরা এমনকি উদ্ধারপ্রাপ্ত সত্তার চিহ্ন হিসাবে নতুন নাম গ্রহণ করার চর্চাও শুরু করেছিল। এভাবেই প্রথমদিকের প্রচারক অ্যাশার গিনবার্গ নিজেকে আহাদ হা’আম (জনগণের একজন) আখ্যায়িত করেছিলেন। এখন তিনি আপন পরিচয় পেয়েছেন, কারণ নিজেকে তিনি নতুন জাতীয় চেতনার সঙ্গে একীভূত করতে পেরেছেন, যদিও তিনি প্যালেস্তাইনে ইহুদি রাষ্ট্রে সম্ভব বলে ভাবেননি। তিনি কেবল ইসরায়েল জাতির একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে সেখানে একটি ‘আধ্যাত্মিক কেন্দ্র’ চেয়েছিলেন যা ঈশ্বরের স্থান গ্রহণ করবে। এটা জীবনের সকল বিষয়ের একটি নির্দেশনায় পরিণত হবে, হৃদয়ের একেবারে গভীরে প্রবেশ করবে এবং প্রত্যেককে প্রত্যেকের অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত করবে। যায়বাদীরা প্রাচীন ধর্মীয় পরিচয় পাল্টে ফেলেছিল। এক দুয়ে ঈশ্বরের দিকে পরিচালিত হওয়ার বদলে ইহুদিরা পৃথিবীতেই পূর্ণতার খোঁজ করেছে। হিব্রু শব্দ হাগশামাহ, আক্ষরিক অর্থে ‘নিরেট করণ’, মধ্যযুগীয় ইহুদি দর্শনে নেতিবাচক শব্দ ছিল, যা ঈশ্বরে মানবীয় ভৌত গুণ আরোপ করার স্বভাবের কথা বোঝাত। যায়নবাদে হাগশামাহ সম্পূর্ণতা বোঝাল, পার্থিব জগতে ইসরায়েলের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রকাশ। পবিত্রতা আর স্বর্গে অবস্থান করছে নাঃ প্যালেস্ত ইিন একটি পবিত্র ভূমি-শব্দটির পূর্ণাঙ্গ অর্থে।
কতটা পবিত্র সেটা বোঝা যাবে প্রথম দিকের পাইওনিয়ার আরন ডেভিড গর্ডনের (মৃ. ১৯২২) লেখায়, যিনি সাতচল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত প্রথমে অর্থডক্স ইহুদি ও কাব্বালিস্ট ছিলেন, এরপর যায়নবাদে দীক্ষা নেন। শাদা চুল ও শশ্রুমণ্ডিত দুর্বল ও অসুস্থ মানুষ গর্ডন অপেক্ষাকৃত তরুণ বসতি স্থাপনকারীদের পাশাপাশি মাঠে কাজ করতেন, রাতে মোহবিষ্ট অবস্থায় তাদের সঙ্গে দাপিয়ে বেড়াতেন এবং চেঁচিয়ে বলতেন, ‘আনন্দ… আনন্দ। আগেকার দিনে, লিখেছিলেন তিনি, ইসরায়েল ভূমির সঙ্গে পুনর্মিলনের অভিজ্ঞতাকে শেকিনার প্রকাশ হিসাবে আখ্যায়িত করা হতো। পবিত্র ভূমি এক পবিত্র মূল্যে পরিণত হয়েছিল: কেবল ইহুদিদের কাছেই বোধগম্য, এর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ছিল, যা এক অসাধারণ ইহুদি চেতনা জন্ম দিয়েছিল। এই পবিত্রতার বর্ণনা দিতে গিয়ে গর্ডন এক সময় ঈশ্বরের রহস্যময় জগৎ বোঝাতে প্রযুক্ত কাব্বালিস্টিক ভাষা ব্যবহার করেছেন:
ইহুদির আত্মা হচ্ছে ইসরায়েলের ভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশের উত্তরসুরি । স্পষ্টতা এক অসীম পরিষ্কার আকাশের গভীরতা, এক স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, নির্মলতার কুয়াশা। এমনকি স্বর্গীয় অজানাও যেন এই স্পষ্টতায় অদৃশ্য হয়ে যায়, সীমিত প্রকাশিত আলো হতে অসীম গুপ্ত আলোয় হারিয়ে যায়। এই পৃথিবীর মানুষ ইহুদির আত্মার এই স্পষ্ট দৃষ্টিকোণ বা আলোকিত অজানার কোনওটিই উপলব্ধি করতে পারে না।[২৯]
প্রথম দিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই ল্যান্ডস্কেপ তাঁর পিতৃভূমি রাশিয়া থেকে এত আলাদা ছিল যে গর্ডনের কাছে আতঙ্ক জাগানো এবং অচেনা ঠেকেছে। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করেছেন, পরিশ্রমের (আভোদাহ শব্দটি দিয়ে ধর্মীয় আচারও বুঝিয়ে থাকে) ভেতর দিয়ে একে আপন করতে পারবেন। জমিনের উন্নতি করে, আরবরা যার উপেক্ষা করেছে, যায়নিস্টদের দাবি অধিকার করে নিতে পারবে এবং একই সময়ে নিজেদের নির্বাসনের বিচ্ছিন্নতা থেকে উত্তোরণ ঘটাতে পারবে।
সমাজতন্ত্রী যায়নবাদীরা তাদের অগ্রগামী আন্দোলনকে শ্রমের জয় হিসাবে আখ্যায়িত করে তাদের কিঝুতষিম সেকুলার মঠে পরিণত হয়েছিল, সেখানে তারা শাদামাটাভাবে বাস করত ও নিজেদের মুক্তি খুঁজে পেত। জমির আবাদ পুনর্জন্ম ও বিশ্বজনীন ভালোবাসার এক অতিন্দ্রীয়বাদী অনুভূতির দিকে ধাবিত করেছিল তাদের। গর্ডন যেমন ব্যাখ্যা করেছেন:
আমার দুই হাত পরিশ্রমের সাথে যেমন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, আমার চোখ আর কান যা দেখতে ও শুনতে শিখেছে এবং আমার হৃদয় বুঝতে পেরেছে এর মাঝে কী আছে: আমার আত্মাও পাহাড়ে পাহাড়ে লাফিয়ে বেড়াতে শিখেছে, উড়তে শিখেছে, ভাসতে শিখেছে-অচেনা বিস্তারে ছড়িয়ে পড়ার জন্যে চারপাশে সকল জমিনকে আলিঙ্গন করার জন্যে, গোটা জগৎ এবং এতে যা কিছু আছে আর সমগ্র বিশ্বজগতের আলিঙ্গনে নিজেকে আবদ্ধ দেখার জন্যে।
তাদের কাজ ছিল সেকুলার প্রার্থনা। ১৯২৭ সালের দিকে অপেক্ষাকৃত তরুণ অগ্রদূত ও পণ্ডিত আম্রাহাম শ্লোনস্কি (১৯০০-৭৩), সড়ক নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতেন তিনি, ইসরায়েল ভূমির উদ্দেশে নিচের কবিতাটি লিখেছেন:
আমাকে পরিয়ে দাও, লক্ষ্মী মা আমার, বহু রঙা জমকালো পোশাক,
ভোরে নিয়ে যাও ক্ষেতে।
প্রার্থনার চাদরের মতো আলোয় মোড়া আমার জমিন।
কপালের ফিতের মতো দাঁড়িয়ে ঘরগুলো;
হাতে বিছানো পাথরসারি, ঝর্নাধারা যেন ধর্মগ্রন্থের বাক্স বাঁধার ফিতে।
এখানে অনিন্দ্য সুন্দর নগরী স্রষ্টার উদ্দেশে প্রার্থনা করে।
স্রষ্টাদের মাঝে আছে তোমার পুত্র আব্রাহাম,
ইসরায়েলের সড়ক নির্মাতা কবি।[৩১]
