মানবীয় কোনও রূপে আমাদের পক্ষে ঈশ্বরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা অসম্ভব। ঈশ্বর অস্তিত্বের মূল, সুতরাং আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছেন তিনি, যে আমাদের পক্ষে তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব নয়, যেন তিনি আমাদের মতোই কোনও ব্যক্তি বিশেষ। ঈশ্বরকে বর্ণনা করার মতো কোনও ধারণা বা ভাষা নেই। বরং মানুষ ও তার মাঝের বিশাল ব্যবধান তোরাহর নির্দেশনাবলীতে দূর হয়। গোয়িম যেমন ভাবে, এগুলো স্রেফ বেআইনী বিধি বিধান নয়। এগুলো পবিত্র মূল্য বিশিষ্ট প্রতীকী কর্মকাণ্ড যা নিজেদের অতীতে কোথাও ইঙ্গিত করে ও ইহুদিদের আমাদের সত্তার গভীরস্থ স্বর্গীয় মাত্রার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। র্যাবাইদের মতো রোজেনভিগ যুক্তি দেখিয়েছেন, নির্দেশনাবলী এত বেশি রকম প্রতীকী যে যেহেতু প্রায়শঃই এগুলোর কোনও নিজস্ব অর্থ থাকে না-এগুলো আমাদের খোদ অনির্বচনীয় সত্তা সম্পর্কে আমাদের সীমিত ভাষা ও ধারণাসমূহের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। এগুলো আমাদের শ্রবণ ও অপেক্ষার মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করে, ফলে আমরা আমাদের অস্তিত্বের মূল-এর দিকে মনোযোগী ও অবিচল থাকতে পারি। সুতরাং, মিতভা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে না। ব্যক্তি বিশেষকে এগুলোকে এমনভাবে উপলব্ধিতে নিতে হবে যাতে প্রতিটি মিতভা বাহ্যিক নির্দেশ হিসাবে পরিচয় হারিয়ে কেবল আমার অন্তরের মনোভাব প্রকাশ করে আমার অন্তরের অবশ্যকরণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু তাসত্ত্বেও তোরাহ্ যদিও বিশেষভাবে ইহুদিদের ধর্মীয় অনুশীলন, কিন্তু প্রত্যাদেশ কেবল ইসরায়েলের জনগণের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি, রোজেনসভিগ, ঐতিহ্যগতভাবে ইহুদি প্রতীকী ভঙ্গিতে ঈশ্বরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন, কিন্তু একজন ক্রিশ্চান অন্যরকম প্রতীক ব্যবহার করবে। ঈশ্বর সম্পর্কিত মতবাদসমূহ প্রাথমিকভাবে স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি ছিল না, বরং সেগুলো ছিল অন্তরের মনোভাবের প্রতীক। যেমন সৃষ্টি ও প্রত্যাদেশের মতবাদসমূহ ঈশ্বরের জীবন ও পৃথিবীর প্রকৃত ঘটনাবলীর আক্ষরিক বিবরণ ছিল না। প্রত্যাদেশের কিংবদন্তীগুলো আমাদের ব্যক্তিগত ঈশ্বর অনুভূতি প্রকাশ করে। সৃষ্টি সংক্রান্ত মিথগুলো আমাদের মানবীয় অস্তিত্বের চরম অনিশ্চয়তাকে প্রতীকায়িত করে, অস্তিত্বের ভিত্তির ওপর আমাদের অসীম নির্ভরতার আলোড়ন সৃষ্টিকারী জ্ঞান যা আমাদের অস্তিত্বকে সম্ভব করে তুলেছে। স্রষ্টা হিসাবে ঈশ্বর যতক্ষণ না প্রতিটি সৃষ্টির কাছে নিজেকে প্রকাশ করেছেন ততক্ষণ তিনি তাঁর সৃষ্টিসমূহ নিয়ে মাথা ঘামান না, কিন্তু তিনি যদি স্রষ্টা অর্থাৎ সকল অস্তিত্বের মূল না হতেন, তাহলে গোটা মানব জাতির জন্যে ধর্মীয় অনুভূতির কোনও মানে থাকত না। এটা কতগুলো আজগুবি ঘটনার ক্রমধারা রয়ে যেত। নব্য অ্যান্টি-সেমিটিজমের বিপক্ষে বিকাশমান নতুন রাজনৈতিক ইহুদিবাদের ব্যাপারে ধর্ম সম্পর্কে বিশ্বজনীনতার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন রোজেনসভিগ সন্দিহান হয়ে উঠেছিলেন। ইসরায়েল, যুক্তি দেখিয়েছেন তিনি, প্রতিশ্রুত ভূমিতে নয়, বরং মিশরেই জাতিতে পরিণত হয়েছিল; এবং চিরন্তন জাতি হিসাবে তখনই এর গন্তব্যে পৌঁছবে যদি সে জাগতিক বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে এবং রাজনীতিতে জড়িত না হয়।
কিন্তু ক্রমবর্ধমান অ্যান্টি-সেমিটিজমের শিকারে পরিণত হওয়া ইহুদিরা এই রাজনীতি-বিচ্ছিন্নতা পোষাতে পারবে মনে করেনি। ঈশ্বর বা মেসায়াহ এসে উদ্ধার করবেন ভেবে বসে থাকতে পারেনি তারা। তাদের নিজেদেরই উদ্ধার পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। ১৮৮২ সালে রাশিয়ায় প্রথম হত্যালীলার এক বছর পর ইহুদিদের একটা দল পূর্ব ইউরোপ ছেড়ে প্যালেস্তাইনে বসতি করতে যায়। তাদের বিশ্বাস ছিল নিজেদের একটা আবাসভূমি না হওয়া পর্যন্ত ইহুদিরা অসম্পূর্ণ, বিচ্ছিন্ন মানুষ রয়ে যাবে। যায়নে (জেরুজালেমের অন্যতম প্রধান পাহাড়) ফিরে যাবার আকাঙ্ক্ষার সূচনা ঘটেছিল এক বিদ্রোহী সেকুলার আন্দোলন হিসাবে, কেননা ইতিহাসের উত্থান-পতন যায়োনিস্টদের মনে দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি করেছিল যে, ধর্ম ও তাদের ঈশ্বর কাজ করেননি। রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে যায়নবাদ ছিল বিপ্লবী সমাজতন্ত্রের একটা শাখা, যার কর্মীরা মার্ক্স এর তত্ত্বকে বাস্তবায়িত করেছিল। ইহুদি বিপ্লবীরা সচেতন হয়ে উঠেছিল যে তাদের কমরেডরা জারের মতোই অ্যান্টি-সেমিটিক কমিউনিস্ট শাসনাধীন; তাদের অবস্থার কোনও উন্নতি হবে না ভেবে শঙ্কিত ছিল ওরা: পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছে তাদের আশঙ্কা ঠিক ছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ডেভিড বেন গুরিয়নের (১৮৮৬-১৯৭৩) মতো উৎসাহী তরুণ সমাজতন্ত্রীরা স্রেফ মালসামান নিয়ে প্যালেস্তাইনে পাড়ি জমিয়েছিলেন এমন একটা আদর্শ সমাজ গঠনের অঙ্গীকারে যা কিনা জেন্টাইলদের জন্যে আলোকবর্তিকা হবে ও সমাজতান্ত্রিক সহস্রাব্দের সূচনা ঘটাবে। অন্যদের এইসব মার্ক্সীয় স্বপ্নে বিভোর হবার অবকাশ ছিল না। ক্যারিশম্যাটিক অস্ট্রিয়ান থিওদর হার্যল (১৮৬০ ১৯০৪) নতুন ইহুদি প্রয়াসকে ঔপনিবেশিক উদ্যোগ হিসাবে দেখেছেন: ইউরোপিয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কোনও একটির আশ্রয়ে ইহুদি রাষ্ট্রটি ইসলামি বর্বরতার মাঝে প্রগতির ভ্যানগার্ডে পরিণত হবে।
