নাখমান ক্ৰচমাল (১৭৮৫-১৮৪০), যার মৃত্যুর পর ১৮৪১ সালে গাইড ফর দ্য পিরপ্লেক্সড অভ আওয়ার টাইম প্রকাশিত হয়েছিল, সতীর্থদের মতো অতিন্দ্রীয়বাদ থেকে সরে যাননি। তিনি ঈশ্বর’ বা ‘আত্মা’কে কাব্বালিস্টদের মতো কিছু না বলতে ভালোবাসতেন; ঈশ্বরের আপন সত্তার ক্রমপ্রকাশ বর্ণনা করার জন্যে উৎসারণের কাব্বালিস্ট রূপকল্প ব্যবহার করতে ভালোবাসতেন। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ইহুদিদের সাফল্য ঈশ্বরের ওপর শোচনীয়। নির্ভরতার নয় বরং সম্মিলিত সচেতনতার কর্মকাণ্ডের ফল। শত শত বছর ধরে ইহুদিরা ক্রমশঃ ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের ধারণা পরিশুদ্ধ করেছে। এভাবে । নির্বাসনের সময় ঈশ্বরকে অলৌকিক ঘটনা সংগঠনের মাধ্যমে নিজের উপস্থিতিতে প্রকাশ করতে হয়েছিল । কিন্তু বাবিলন থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় নাগাদ ইহুদিরা ঈশ্বর সম্পর্কে আরও অগ্রসর ধারণা অর্জন করে, ফলে নিদর্শন ও বিস্ময়ের প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছিল। গোয়িম যেমনটি কল্পনা করে, ঈশ্বর উপাসনার ইহুদি ধারণা মোটেই সে রকম দাসত্বমূলক নির্ভরতা নয়, বরং তা প্রায় হুবহু দার্শনিক আদর্শের অনুরূপ। ধর্ম ও দর্শনের একমাত্র পার্থক্য হচ্ছে শেষোক্তটি নিজেকে ধারণা দিয়ে প্রকাশ করে, আর ধর্ম ব্যবহার করে প্রতীকী ভাষা। তা সত্ত্বেও প্রতীকী ভাষা যথার্থ, কেননা ঈশ্বর তাঁর সম্পর্কে আমাদের। সকল ধারণা অতিক্রম করে যান। প্রকৃতপক্ষে আমরা এমনকি এও বলতে পারি না যে তার অস্তিত্ব আছে, কারণ অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা একেবারেই আংশিক এবং সীমাবদ্ধ ।
১৮৮১ সালে তৃতীয় জার আলেকজান্দারের অধীন রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে ভয়ানক অ্যান্টি-সেমিটিজমের জোয়ারে মুক্তির মাধ্যমে আগত নতুন আত্মবিশ্বাস কঠিন আঘাত লাভ করে। পশ্চিম ইউরোপেও এটা ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৯৪ সালে ইহুদিদের মুক্তি দানকারী প্রথম দেশ ফ্রান্সে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে ভুলবশতঃ ইহুদি কর্মকর্তা আলফ্রেড ভ্ৰেয়ফুস অভিযুক্ত হলে অ্যান্টিসেমিটিজমের এক উন্মাদনাময় স্রোত বয়ে গিয়েছিল। একই বছর উল্লেখযোগ্য অ্যান্টি-সেমাইট কার্ল লুগার ভিয়েনার মেয়র নির্বাচিত হলেও জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলার ক্ষমতায় আসার আগে পর্যন্ত ইহুদিদের ধারণা ছিল যে তারা নিরাপদ। এভাবে হারমান কোহেন (১৮৪২-১৯১৮) যেন কান্ট এবং হেগেলের মেটাফিজিক্যাল অ্যান্টি-সেমিটিজমে আবিষ্ট ছিলেন। সবার উপরে ইহুদিবাদ একটি দাসত্বমূলক ধর্মবিশ্বাস, এই অভিযোগ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন কোহেন ঈশ্বরকে বাহ্যিক সত্তা হিসাবে মানতে অস্বীকার করেন। মহাশূন্যে । অবস্থান করে আনুগত্য আরোপকারী ঈশ্বর মানুষের মনে সৃষ্টি হওয়া একটা ধারণা মাত্র, নৈতিক আদর্শের একটা প্রতীক। মোজেসের সামনে স্বয়ং ঈশ্বর কর্তৃক নিজেকে ‘আমি যা আমি তাই বলে পরিচয় দেওয়ার সময় জ্বলন্ত ঝোঁপের বাইবেলিয় কাহিনীর আলোচনা প্রসঙ্গে কোহেন যুক্তি দেখিয়েছেন, এটা আমরা যাকে ‘ঈশ্বর’ বলি তা যে কেবল সত্তা স্বয়ং সেই সত্য প্রকাশেরই আদিম অভিব্যক্তি। এটা আমাদের বোধের সাধারণ সত্তাসমূহ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা কেবল এই আবশ্যক অস্তিত্বে অংশগ্রহণ করতে পারে। দ্য রিলিজিন অভ রিজন ড্রন ফ্রম দ্য সোর্সের্স অভ জুদাইজম এও (১৯১৯ সালে মৃত্যুর পর প্রকাশিত) কোহেন জোরের সঙ্গে বলেছেন, ঈশ্বর স্রেফ মানুষের একটা ধারণা। তারপরও তিনি মানুষের জীবনে ধর্মের আবেগগত ভূমিকা স্বীকার করেছেন। তুচ্ছ নৈতিক ধারণা আমাদের সান্ত্বনা দিতে পারে না। ধর্ম আমাদের প্রতিবেশীকে ভালোবাসতে শিক্ষা দেয়, সুতরাং এটা বলা যেতে পারে যে ধর্মের ঈশ্বরই-নীতি ও দর্শনের ঈশ্বরের বিপরীতে-সেই আবেগময় ভালোবাসা।
এসব ধারণা ফ্ৰান্য রোজেনভিগের (১৮৮৬-১৯২৯) হাতে সকল শনাক্তের অতীত বিকাশ লাভ করে; ইহুদিবাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধারণার সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন তিনি, যা তাকে তার সমসাময়িকদের তুলনায় আলাদা স্থান দিয়েছে। তিনি কেবল প্রথম যুগের অস্তিত্ববাদীদের অন্যতম ছিলেন না, এমন সব ধারণাও প্রণয়ন করেছিলেন যা প্রাচ্য ধর্মসমূহের অনেক কাছাকাছি। তার স্বাধীনতাকে সম্ভবত এভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, তরুণ বয়সে তিনি ইহুদিবাদ ত্যাগ করে পরিণত হয়েছিলেন অজ্ঞাবাদীতে, তারপর খৃস্টধর্ম গ্রহণের কথা ভেবে শেষে আবার অর্থডক্স ইহুদিবাদে ফিরে এসেছিলেন। স্বেচ্ছাচারী ঈশ্বরের ওপর দাসত্বমূলক কারণ নির্ভরতাকে উৎসাহিতকারী তোরাহ অনুসরণের অস্বীকৃতি জানিয়েছেন রোজেসভিগ। ধর্ম কেবলা নৈতিকতার একটা ব্যাপার নয় বরং অত্যাবশ্যকীয়ভাবে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলন। সাধারণ মানুষের পক্ষে দুয়ে ঈশ্বরের মুখোমুখি হওয়া কীভাবে সম্ভব? এই মিলন কেমন ছিল, আমাদের কখনও বলেননি রোজেনসভিগ। এটা তাঁর। দর্শনের একটি ত্রুটি। তিনি মানুষ ও প্রকৃতির সঙ্গে আত্মাকে মিলিয়ে ফেলার হেগেলিয় প্রয়াসকে অবিশ্বাস করেছেন। আমাদের মানবীয় চেতনাকে ‘বিশ্বাত্মার একটা বৈশিষ্ট্য ভাবতে গেলে আমরা আর প্রকৃত স্বতন্ত্র ব্যক্তি থাকি না। একজন খাঁটি অস্তিত্ববাদী রোজেনভিগ প্রতিটি মানুষের চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতার ওপর জোর দিয়েছেন। আমরা প্রত্যেকেই মানুষের বিশাল সমুদ্রে দিশাহারা, আতঙ্কিত। কেবল ঈশ্বর আমাদের দিকে প্রসন্ন হয়ে দৃষ্টি ফেরালেই এই অজ্ঞাতনামা অবস্থা ও আতঙ্ক হতে উদ্ধার লাভ করি। সুতরাং, ঈশ্বর আমাদের স্বাতন্ত্রকে খর্ব করেন না, বরং আমাদের পরিপূর্ণ আত্মসচেতনতা অর্জনে সক্ষম করে তোলেন।
