ইসলামে বিশেষ করে ঐতিহাসিক ইসলামে বিশ্বাসী কেউ প্রকৃত মুসলিম নন; বরং যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন ও পয়গম্বরের মাধ্যমে তাঁর প্রত্যাদেশের প্রতি যিনি অঙ্গীকারবদ্ধ তিনিই মুসলিম। শেষাক্তটি আছে। এবং যথার্থভাবে শ্রদ্ধা পাচ্ছে, কিন্তু অঙ্গীকার অদৃশ্য হয়েছে। এই পৃষ্ঠাগুলোয় ঈশ্বর লক্ষণীয়ভাবে কদাচিৎ আবির্ভূত হয়েছেন।[২৮]
বরং তার জায়গায় অস্থিতিশীলতা ও আত্মমর্যাদাবোধের অভাব রয়েছে: পশ্চিমের মতামত বড় বেশি গুরুত্বহ হয়ে উঠেছে। হুসেইনের মতো ব্যক্তিরা ধর্ম ও ঈশ্বরের কেন্দ্রীকতা উপলব্ধি করলেও আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল না। আধুনিকতার সংস্পর্শে আসা মানুষ ঈশ্বর বোধ হারিয়ে ফেলেছিল। এই অস্থিতিশীলতা থেকেই জন্ম নেবে আধুনিক মৌলবাদের বৈশিষ্ট্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, যা আবার ঈশ্বর হতে পিছু হটা।
ইউরোপের ইহুদিরাও তাদের ধর্ম বিশ্বাসের বৈরী সমালোচনায় ক্ষতিগস্ত হয়েছিল। জার্মানিতে ইহুদি দার্শনিকগণ তাদের ভাষায় ইহুদিবাদের বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছিলেন, যেখানে দাসত্বমূলক দূরত্ব সৃষ্টিকারী বিশ্বাস নয় প্রমাণ করার জন্যে হেগেলিয় পরিভাষায় ইহুদিদের ইতিহাস পুনঃলিখিত হয়েছিল । ইসরায়েলের ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যার এই প্রয়াসের প্রথম ব্যক্তি ছিলেন সলোমন ফর্মস্তেচার (১৮০৮-৮৯)। দ্য রিলিজিয়ন অভ দ্য স্পিরিট (১৮৪১)-এ ঈশ্বরকে তিনি সকল বস্তুতে বিরাজমান বিশ্বাত্ম হিসাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই আত্মা পৃথিবীর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না, যেমন হেগেল যুক্তি দেখিয়েছেন। ফর্মস্তেচার জোর দিয়ে বলেছেন, এটা যুক্তির নাগালের বাইরে অবস্থান করে। ঈশ্বরের সত্তা ও তার কর্মকাণ্ডের প্রাচীন পার্থক্যে ফিরে গেছেন তিনি। হেগেল সেখানে প্রতিনিধিত্বমূলক ভাষা ব্যবহারের বিরোধিতা করেছেন, ফর্মস্তেচার সেখানে যুক্তি দিয়েছেন যে, প্রতীকীবাদ ঈশ্বর আলোচনার যথার্থ বাহন, কেননা তিনি দার্শনিক ধ্যান ধারণার নাগালের বাইরে অবস্থান করেন। এসব সত্ত্বেও ইহুদিবাদই প্রথম ধর্ম যা ঈশ্বরের এক অগ্রসর ধারণায় পৌঁছেছিল এবং অচিরেই গোটা পৃথিবীকে দেখিয়ে দেবে একটি প্রকৃত আধ্যাত্মিক ধর্ম কেমন হতে পারে।
আদিম পৌত্তলিক ধর্ম ঈশ্বরকে প্রকৃতির সঙ্গে একীভূত করেছিল, যুক্তি দেখিয়েছেন ফর্মস্তেচার। এই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবনা রহিত কালটি মানব জাতির শিশুকাল তুলে ধরে। মানব জাতি আরও উঁচু মাত্রায় আত্ম সচেতন হয়ে উঠলে তারা ঈশ্বরের আরও মার্জিত ধারণার দিকে অগ্রসর হতে তৈরি হয়। তারা উপলব্ধি করতে শুরু করে যে ‘ঈশ্বর’ বা ‘আত্মা’ প্রকৃতিতে মিশে নেই, বরং এর ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। এই নতুন ধারণা অর্জন করার পয়গম্বরগণ এক নীতি ধর্ম প্রচার করেছেন। প্রথম দিকে তারা বিশ্বাস করেছেন যে প্রত্যাদেশসমূহ দেহাতীত কোনও শক্তি থেকে আসছে, কিন্তু আস্তে আস্তে তারা বুঝতে পারেন, কোনও বহিস্থঃ ঈশ্বরের ওপর পুরোপুরি তারা নির্ভরশীল নন, বরং তাঁদের নিজস্ব আত্মায় পরিপুর্ণ স্বভাবে অনুপ্রাণিত। ইহুদিরাই সবার আগে ঈশ্বরের এই নৈতিক ধারণা অর্জন করতে পেরেছিল। দীর্ঘ নির্বাসন ও মন্দির ধ্বংস বাহ্যিক বিষয়াদি ও কর্তৃত্বের ওপর নির্ভরশীলতা হতে তাদের মুক্ত করেছিল। ফলে এক উন্নতর ধর্মীয় সচেতনতার দিকে অগ্রসর হয়েছিল তারা যা স্বাধীনভাবে ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হবার সুযোগ করে দিয়েছে। হেগেল এবং কান্ট যেমন যুক্তি দেখিয়েছেন, তারা মধ্যস্থতাকারী পুরোহিতের উপর নির্ভরশীল বা কোন বিদেশী আইনের ভয়ে ভীতও ছিল না। তার বদলে মন এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র দিয়ে ঈশ্বরকে খুঁজে পেতে শিখেছে। খৃস্টধর্ম ও ইসলাম অনুকরণের প্রয়াস পেয়েছে, কিন্তু তেমন সফল হয়নি। যেমন, খৃস্টধর্মের ঈশ্বর বর্ণনায় বহু পৌত্তলিক উপাদান রয়ে গিয়েছিল। ইহুদিরা যেহেতু শৃঙ্খল মুক্ত হয়েছে, অচিরেই তারা সম্পূর্ণ মুক্তি লাভ করবে; উন্নতির এই চূড়ান্ত পর্বের জন্যে তৈরি হতে তাদের অতীত ইতিহাসের অনুন্নত এক পর্যায়ের এক অবশেষ আনুষ্ঠানিক আইন পরিত্যাগ করতে হবে।
মুসলিম সংস্কারবাদের মতো ইহুদিবাদের বিজ্ঞানের উদ্যোক্তরা তাঁদের ধর্মকে পুরোপুরি যৌক্তিক বিশ্বাস হিসাবে উপস্থাপনে উদগ্রীব ছিলেন। তাঁরা বিশেষভাবে কাব্বালাহ ত্যাগ করতে চেয়েছেন, শ্যাব্বেতাই যেভি বিপর্যয় ও। হাসিবাদ-এর আবির্ভাবের সময় থেকে যা বিব্রতকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এরই পরিণতিতে ১৮৪২ সালে দ্য রিলিজিয়াস ফিলোসফি অভ দ্য জুজ-এর। প্রকাশক স্যামুয়েল হার্শ ইসরায়েলের একটি ইতিহাস রচনা করেছিলেন যেখানে অতিন্দ্রীয়বাদী দিক উপেক্ষা করে স্বাধীনতার ধারণার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে ঈশ্বরের একটি নৈতিক ও যৌক্তিক ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। একজন মানুষ তার ‘আমি’ বলার ক্ষমতায় আলাদাভাবে পরিচিত হয়। এই আত্ম-সচেতনতা অবিচ্ছেদ্য ব্যক্তি স্বাধীনতা তুলে ধরে। পৌত্তলিক ধর্ম এই স্বাধীন মনোভাবের বিকাশ ঘটাতে পারেনি, কেননা মানুষের উন্নতি বা বিকাশের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়গুলোতে আত্ম-সচেতনতার বোধটি স্বর্গ হতে প্রাপ্ত বলে মনে করা হতো। প্যাগানরা প্রকৃতিতে তাদের ব্যক্তিগত মুক্তির উৎস স্থাপন করেছিল, তারা বিশ্বাস। করত যে, তাদের কিছু কিছু দোষ বা অপরাধ অনিবার্য। আব্রাহাম অবশ্য এই পৌত্তলিক অদৃষ্টবাদ ও নির্ভরতা অস্বীকার করেছিলেন। ঈশ্বরের সামনে নিজের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একা দাঁড়িয়েছেন তিনি। এমন একজন মানুষ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঈশ্বরের দেখা পাবে। বিশ্ব জগতের প্রভু ঈশ্বর এই অন্তস্থঃ স্বাধীনতা অর্জনে আমাদের সাহায্য করার জন্যেই পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন; স্বয়ং ঈশ্বরই প্রতিটি মানুষকে এই লক্ষ্যে শিক্ষা দান করেছেন। জেন্টাইলরা যেমন মনে করে, ইহুদিবাদ দাসত্বমূলক ধর্ম নয়। এটা সব সময়ই, উদাহরণ হিসাব বলা যায়, খৃস্টধর্মের তুলনায় অগ্রসর ধর্ম ছিল; ইহুদি উৎস ভুলে গিয়ে খৃস্টধর্ম পৌত্তলিকতার যুক্তিহীনতা ও কুসংস্কারে ফিরে গিয়েছিল।
