এ সময় মধ্যপ্রাচ্যের আরব মুসলিমরা পাশ্চাত্যের হুমকি মোকাবিলার ব্যাপারে আর আগের মতো আস্থাশীল ছিল না। ১৯২০ সাল, যে বছর ব্রিটেন ও ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্য অধিকার করে নেয়, আম-আল-নাখবাহ বা বিপর্যয়ের বছর হিসবে পরিচিত হয়ে ওঠে: শব্দটি মহাজাগতিক বিপর্যয়ের সমার্থক। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর আরবরা স্বাধীনতার আশা করেছিল, কিন্তু এই নতুন দখলদারির ফলে মনে হয়েছে, তারা বুঝি আর কখনওই আপন নিয়তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না; এমনকি এমন গুজবও ছড়িয়ে পড়েছিল যে, ব্রিটিশরা যায়নিস্টদেও হাতে প্যালেস্তাইনকে তুলে দিতে যাচ্ছে: যেন এর আরব অধিবাসীদের অস্তিত্বই নেই। লজ্জা আর অপমানের অনুভূতি প্রবল হয়ে উঠেছিল। কানাডিয় পণ্ডিত উইলফ্রেড ক্যান্টয়েল স্মিথ বলেছেন, অতীতের স্বর্ণালি সাফল্যের স্মৃতি তাদের এই বোধ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল; আধুনিক আরব) এবং, ধরা যাক, আধুনিক আমেরিকানের পার্থক্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয় যা অতীতের সাফল্যের স্মৃতিবাহী এক সমাজের সঙ্গে বর্তমান সাফল্যের অনুভূতির গভীর পার্থক্য। এর একটা গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় তাৎপর্য ছিল। খৃস্টধর্ম প্রধানত দুঃখকষ্ট ও বৈরিতার ধর্ম এবং অন্তত পশ্চিমে, তর্কসাপেক্ষে দুর্যোগকালেই সর্বাধিক সত্য প্রমাণিত হয়ে এসেছে: ক্রুশবিদ্ধ ক্রাইস্টের ইমেজের সঙ্গে জাগতিক সাফল্য বা মহিমাকে মেলানো সহজ হয়। কিন্তু ইসলাম এক সাফল্যের ধর্ম। কোরান শিক্ষা দিয়েছে, যে সমাজ ঈশ্বরের ইচ্ছানুযায়ী (ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করে, সামঞ্জস্য আনে, সম্পদের সুষ্ঠু বিতরণ। করে) পরিচালিত সেটি ব্যর্থ হতে পারে না। মুসলিম ইতিহাস যেন এরই। সত্যতা নিশ্চিত করে। ক্রাইস্টের বিপরীতে মুহাম্মদ (স) আপাত ব্যর্থ ছিলেন না বরং বিস্ময়করভাবে সফল। সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে মুসলিম সাম্রাজ্যের অবিশ্বাস্য অগ্রযাত্রায় তাঁর সাফল্য স্বাভাবিকভাইে ঈশ্বরের মুসলিম বিশ্বাস প্রমাণিত বলে মনে হয়েছে: ইতিহাসের পরিমণ্ডলে নিজের ওয়াদা রক্ষা করে আল্লাহ চুড়ান্তভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছেন। মুসলিমদের সাফল্য অব্যাহত ছিল। এমনকি মঙ্গোল আগ্রাসনের মতো বিপর্যয়ও কাটিয়ে ওঠা গেছে। শত শত বছরের পরিক্রমায় উম্মাহ প্রায় পবিত্র গুরুত্ব অর্জন করেছিল এবং ঈশ্বরের উপস্থিতি তুলে ধরেছে। কিন্তু এখন মুসলিম ইতিহাসে কি যেন ভয়ানক ওলটপালট হয়ে গেছে আর তা অনিবার্যভাবে ঈশ্বরের ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন থেকে বহু মুসলিম ইসলামি ইতিহাসকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনার ও জগতে কোরানের দর্শনকে কার্যকর করে তোলার দিকে মন দেবে ।
ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের ফলে পয়গম্বর এবং তাঁর ধর্মের প্রতি পশ্চিমা অসন্তোষ কতটা গভীর প্রকাশ পেলে লজ্জার অনুভূতি আরও প্রবল। হয়ে উঠেছিল। মুসলিম পণ্ডিতগণ ক্রমবর্ধমান হারে অ্যাপোলোজিটিক্স বা অতীতের বিজয় গাথার স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠেছিলেন। এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি। ঈশ্বর আর মধ্যমঞ্চে ছিলেন না। মিশরিয় পত্রিকা আল-আযহার-এ ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত সংখ্যার নিবিড় নিরীক্ষায় এই প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেছেন ক্যান্টওয়েল স্মিথ। এই সময়কালে পত্রিকার দুজন সম্পাদক ছিলেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত এটা পরিচালিত হয় সর্বান্ত করণে ট্রাডিশনিস্ট আল-খিজর হুসেইন এর হাতে, ধর্মকে তিনি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সত্তা নয় বরং ধারণা হিসাবে দেখেছেন। ইসলাম ছিল এক নির্দেশনা, ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের আহ্বান; সম্পূর্ণ অর্জিত বাস্তবতা নয়। মানবীয় জীবনে স্বর্গীয় আদর্শের বাস্তবায়ন সবসময়ই কঠিন, এমনকি অসম্ভবও-হুঁসেইন তাই উন্মাহর অতীত বা বর্তমান ব্যর্থতায় হতাশ ছিলেন না। তিনি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মুসলিমদের আচরণের সমালোচনা করেছেন, তাঁর কার্যকালে সাময়িকীটি সবগুলোর সংখ্যা করতে হবে’ ও ‘করা উচিত’ শব্দে আকীর্ণ ছিল। কিন্তু বিশ্বাস করতে আগ্রহী হলেও বিশ্বাস করতে পারছে না, এমন একজন ব্যক্তির সমস্যা কল্পনা করতে পারেননি হুসেইন: আল্লাহর অস্তিত্ব সন্দেহাতীত বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। পুরোনো এক সংখ্যায় ইউসুফ আল দিনি রচিত প্রবন্ধে ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তিসমূহের রূপরেখা বর্ণিত হয়েছিল। স্মিথ উল্লেখ করেছেন, লেখার ধরণ আবশ্যিকভাবে ভক্তিমূলক এবং এখনও প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মহিমার গভীর, উচ্ছল প্রশংসা প্রকাশ পেয়েছে যা স্বর্গীয় সত্তার প্রকাশ করে। ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাপারে আল-দিনির কোনও সন্দেহ ছিল না। তাঁর প্রবন্ধ যতটা না ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ তার চেয়ে বেশি ধ্যান। একথা তার জানা ছিল না যে, পশ্চিমের বিজ্ঞানীরা বহু। আগেই এই ‘প্রমাণ’ উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই মনোভাব ছিল পুরোনো । সাময়িকীটির প্রচার সংখ্যায় ধস নেমেছিল।
১৯৩৩ সালে ফরিদ ওয়াজদি দায়িত্ব নেওয়ার পর পর পাঠকসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। ওয়াজদির প্রাথমিক বিবেচনা ছিল পাঠকদের আশ্বস্ত করা যে, ইসলাম ঠিক আছে। হুসেইনের একথা মনে আসার কথা নয় যে ঈশ্বরের মনের দুজ্ঞেয় ধারণা ইসলামের সময়ে সময়ে সাহায্যের হাত প্রয়োজন হতে পারে; কিন্তু ওয়াজদি ইসলামকে হুমকির সম্মুখীন একটি মানবীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখেছেন। প্রধান প্রয়োজন হচ্ছে যাচাই, শ্রদ্ধা ও প্রশংসা করা । উইলফ্রেড ক্যান্টওয়েল স্মিথ যেমন উল্লেখ করেছেন, এক গভীর ধর্মহীনতা ওয়াজদির রচনাবলীকে ঘিরে রেখেছে। পূর্বসুরিদের মতো তিনিও অব্যাহতভাবে যুক্তি দেখিয়েছেন শত শত বছর আগের ইসলামের আবিষ্কারসমূহই এখন পশ্চিম আবার শিক্ষা দিচ্ছে; কিন্তু তাদের মতো খুব কমই ঈশ্বরের প্রসঙ্গ এনেছেন তিনি। ইসলামের মানবিক দিকটাই ছিল তাঁর। মনোযোগের প্রধান বিষয়; এই পার্থিব মূল্যবোধ এক অর্থে দুয়ে ঈশ্বরকে প্রতিস্থাপিত করেছিল । স্মিথ উপসংহার টানছেন:
