পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে উত্তেজনা বোধ করেছেন আবদুহ; বিশেষভাবে কোতে, তলস্তয় ও ব্যক্তিগত বন্ধু হার্বাট স্পেন্সর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি। পুরোপুরি পশ্চিমি জীবনধারা গ্রহণ করলেও বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে নিজেকে সজীব রাখতে নিয়মিত ইউরোপ সফর করতেন আবদুহ। এর মানে এই নয় যে, তিনি ইসলাম পরিত্যাগ করেছেন বরং বিপরীতে যেকোনও সংস্কারকের মতো আবদুহ ধর্মবিশ্বাসের মূলে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। সুতরাং, তিনি পয়গম্বর ও সঠিক পথে পরিচালিত চার খলিফার (রাশিদুন) চেতনায় ফিরে যাবার তাগিদ দিয়েছেন। এতে অবশ্য আধুনিকতা ত্যাগ করার মৌলবাদী প্রত্যাখ্যানের প্রয়োজন হয়নি। আবদুহ্ জোর দিয়ে বলেছেন, আধুনিক বিশ্বে স্থান করে নেওয়ার জন্যে মুসলিমদের অবশ্যই বিজ্ঞান, কারিগরি জ্ঞান ও সেকুলার দর্শন পাঠ করতে হবে। মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি অর্জনে সক্ষম করে তোলার জন্যে শরীয়াহ আইনকে অবশ্যই সংস্কার করতে হবে। আল-আফগানির মতো তিনিও ইসলামকে যুক্তিভিত্তিক ধর্ম হিসাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোরানে যুক্তি ও ধর্ম হাতে হাত রেখে অগ্রসর হয়েছে। পয়গম্বরের আগে প্রত্যাদেশের সঙ্গে অলৌকিক ঘটনা, কিংবদন্তী ও অযৌক্তিক বাগাড়তা যুক্ত ছিল, কিন্তু কোরান এইসব সুপ্রাচীন পদ্ধতির আশ্রয় নেয়নি। এটা তুলে ধরেছে প্রমাণ ও প্রকাশ, অবিশ্বাসীদের দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করে এবং যুক্তির আলোকে সেগুলোকে আক্রমণ করেছে। ফায়সুফদের বিরুদ্ধে পরিচালিত আল-গাযযালির আক্রমণ শোভন ছিল না। এর ফলে ধর্মপরায়ণতা ও যুক্তিবাদের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে, যা উলেমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানকে ক্ষন্ন করেছে। আল-আযহারের পুরোনো পাঠ্যক্রমে এটা স্পষ্ট ছিল। সুতরাং, মুসলিমদের কোরানের অধিকতর গ্রাহী ও যৌক্তিক চেতনায় ফিরে যাওয়া উচিত। তা সত্ত্বেও আবদুহ পুরোপুরি বিড়াকশনিস্ট যুক্তিবাদ হতে দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। তিনি হাদিস উদ্ধৃত করেছেন: রহস্যে ঢাকা ঈশ্বরের অত্যাবশ্যকীয় সত্তা যুক্তির নাগালের বাইরে। আমরা কেবল এটাই প্রতিষ্ঠা করতে পারি যে, ঈশ্বর আর কোনও বস্তুর মতো নন । ধর্মতাত্ত্বিকরা অন্য যেসব প্রশ্ন নিয়ে কাজ করেন সেগুলো একেবারে তুচ্ছ; কোরান এগুলোকে যান্না বলে। নাকচ করে দিয়েছে।
ভারতে স্যার মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮) নেতৃস্থানীয় সংস্কারক ছিলেন; ভারতীয় হিন্দুদের গান্ধীর মতো মুসলিমদের নেতায় পরিণত হয়েছিলেন তিনি। পাশ্চাত্য শিক্ষা ও দর্শন শাস্ত্রে ডক্টরিটও ছিল তাঁর। বার্গসন, নিৎশে এবং এ. এন. হোয়াইটহেডদের প্রতি প্রবলভাবে আগ্রহী ছিলেন তিনি; নিজেকে প্রাচ্য ও প্রতিচ্যের সেতুবন্ধ কল্পনা করে তাদের দর্শনের আলোকে ফালসাফাহকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। তাঁর চোখে ভারতে ইসলামের অবনতি দেখে শঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে ভারতের মুসলিমদের মাঝে এক ধরনের অস্বস্তিকর অনুভূতি কাজ করে আসছিল। ইসলামের উৎসভূমি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ভাইদের মতো আস্থার অভাব ছিল তাদের, এরই পরিণামে ব্রিটিশদের কাছে আরও বেশি হারে আত্মরক্ষামূলক ও অরক্ষিত হয়ে পড়েছিল তারা। কবিতা ও দর্শনের মাধ্যমে ইসলামি নীতিমালার সৃজনশীল পুনর্নির্মাণের ভেতর দিয়ে ইকবাল তার জাতির বিব্রতকর অবস্থা দূর করার প্রয়াস পেয়েছিলেন।
নিৎশের মতো পশ্চিমা দার্শনিকদের কাছ থেকে ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদের গুরুত্ব আত্মস্থ করেন ইকবাল। গোটা বিশ্বজগৎ এক পরম সত্তার প্রতিনিধিত্ব করে যা ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের সর্বোচ্চ রূপ, মানুষ যাকে ঈশ্বর’ আখ্যায়িত করেছে। নিজস্ব অনন্য স্বভাব অর্জন করার লক্ষ্যে সকল মানুষকে আরও বেশি করে ঈশ্বরের অনুরূপ হয়ে উঠতে হবে। তার মানে প্রত্যেককে অবশ্যই আরও স্বতন্ত্র, আরও সৃজনশীল হয়ে উঠতে হবে; আবার এই সৃজনশীলতার বাস্তব প্রয়োগ ঘটাতে হবে। ভারতীয় মুসলিমদের নিষ্ক্রিয়তা ও কাপুরুষোচিত আত্ম-বিলীনতা (ইকবাল যাকে পারস্যের প্রভাব হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন) ত্যাগ করতেই হবে। মুসলিমদের ইজতিহাদ (স্বাধীন বিবেচনা) তাদের নতুন নতুন ধ্যান ধারণা গ্রহণে উপযোগী করে তোলার কথা: খোদ কোরানে অব্যাহত পরিমার্জনা ও আত্মনীরিক্ষার দাবি জানিয়েছে। আল-আফগানি ও আবদুর মতো ইকবাল দেখতে চেয়েছিলেন যে প্রগতির চাবিকাঠি গবেষণামূলক মনোভাব ইসলামেই জন্ম নিয়েছিল এবং মধ্যযুগে মুসলিম বিজ্ঞান গণিতের মাধ্যমে পশ্চিমে গেছে। অ্যাক্সিয়াল যুগের মহান স্বীকারোক্তিমূলক ধর্মগুলোর আবির্ভাবের আগে মানবজাতির উন্নতি ছিল অগোছাল, সামঞ্জস্যহীন, বিশেষভাবে মেধাবী ও অনুপ্রাণিত ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরশীল। মুহাম্মদের (স) পয়গম্বরত্ব ছিল যা পরবর্তী প্রত্যাদেশ অপ্রয়োজনীয় করে দেওয়া এইসব স্বজ্ঞাজাত প্রয়াসাদির সম্মিলন। এরপর থেকে মানুষ বিজ্ঞান ও যুক্তির ওপর নির্ভর করতে পারে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ নিজেই লক্ষ্যে পরিণত হওয়ায় পশ্চিমে তা বহুঈশ্বরবাদীতার এক নতুন ধরনের রূপ নিয়েছিল। মানুষ ভুলে গিয়েছিল যে, সব রকম স্বাতন্ত্র্য এসেছে ঈশ্বরের কাছ থেকে। লাগামহীনভাবে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পেলে ব্যক্তির মেধা বিপজ্জনক কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। নিজেদের ঈশ্বর বিবেচনাকারী নিৎশের কল্পিত অতিমানবের প্রজন্ম এক ভীতিকর সম্ভাবনাঃ মানুষের মুহূর্ত বিশেষের খেয়াল ও মর্জির অতীত এক রীতি যে নিয়মের চ্যালেঞ্জ থাকার প্রয়োজন রয়েছে। পশ্চিমের দূষণের বিরুদ্ধে ব্যক্তিস্বতন্ত্রবাদের প্রকৃত রূপকে রক্ষা করা ইসলামের দায়িত্ব। তাদের সম্পূর্ণ মানুষ সম্পর্কিত সুফী আদর্শ, সৃষ্টির পরিণতি ও এর অস্তিত্বের উদ্দেশ্য ছিল। নিজেকে পরম বিবেচনাকারী অতিমানব সাধারণ মানুষকে অবজ্ঞা করে; তার বিপরীতে পূর্ণাঙ্গ মানুষের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি পরম সত্তার প্রতি সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল থাকবেন এবং সাধারণ মানুষকে চালিত করবেন। বিশ্বের বর্তমান অবস্থা বোঝায় যে প্রগতি বা উন্নতি এক অভিজাত গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল, যারা বর্তমান ছাড়িয়ে দেখতে পান ও মানুষকে ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারেন। শেষ পর্যন্ত সবাই ঈশ্বরের মাঝে প্রকৃত ব্যক্তি স্বাতন্ত্রকে অর্জন করতে পারবে । ইকবালের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইসলামের ভূমিকা আংশিক ছিল, কিন্তু খৃস্টধর্মকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে ইসলামকে অসম্মানকে করার চলমান পশ্চাত্য প্রয়াসের চেয়ে ঢের বেশি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল এটা। অতিমানবের আদর্শের ব্যাপারে তাঁর আশঙ্কা বা সংশয় জীবনের শেষ বছরগুলোয় জার্মানির ঘটনা প্রবাহে চমৎকারভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
