অন্য সংস্কারগণও বুঝতে পেরেছিলেন যে, জবরদস্তিমূল অবদমন সমাধান নয়। অন্যান্য সভ্যতার সঙ্গে যোগাযোগে ইসলাম সবসময়ই উদ্দীপ্ত হয়েছে। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, সমাজের ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী সংস্কারের জন্যে ধর্মের আবশ্যকতা রয়েছে। অনেক কিছু পরিবর্তন করার প্রয়োজন ছিল; অনেক কিছুই পশ্চাদপদ চেহারা ধারণ করেছিল; কুসংস্কার ও অজ্ঞতার প্রকোপ ছিল। কিন্তু ইসলাম মানুষের মনে গভীর উপলব্ধি গড়ে তুলতেও সাহায্য করেছিল: একে অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠতে দেওয়া হলে সারা পৃথিবীর মুসলিমদের আধ্যাত্মিক সুস্থতা ভোগান্তির মুখে পড়বে। মুসলিম সংস্কারকরা পশ্চিমের প্রতি বৈরী ছিলেন না। অনেকেই পাশ্চাত্যের সাম্যতা, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের আদর্শকে উপযোগী হিসাবে দেখেছেন, যেহেতু ইসলাম জুদো ক্রিশ্চানিটির মুল্যবোধের অংশীদার, ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যার প্রবল প্রভাব ছিল। পাশ্চাত্য সমাজের আধুনিকায়ন কোনও কোনও ক্ষেত্রে এক নতুন ধরনের সাম্যের জন্ম দিয়েছিল; সংস্কারকগণ তাদের জনগণকে বলেছেন, এই ক্রিশ্চান যেন তাদের চেয়ে ভালোভাবে ইসলামি জীবনযাপন করছে বলে মনে হয়। ইউরোপের সঙ্গে এই নতুন যোগাযোগে ব্যাপক উৎসাহ আর উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। বিত্তশালী মুসলিমরা ইউরোপে শিক্ষা নিয়ে এখানকার দর্শন, সাহিত্য ও আদর্শ আত্মস্থ করে নিজেদের শিক্ষা ভাগ করে নেওয়ার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে যার যার দেশে ফিরে গিয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে বলতে গেলে প্রায় সব মুসলিম বুদ্ধিজীবীই পশ্চিমের গভীর ভক্তও হয়ে উঠেছিলেন।
সংস্কারকদের সবারই বুদ্ধিবৃত্তিক পক্ষপাত ছিল, আবার তাঁরা প্রত্যেকেই ইসলামি অতিন্দ্রীয়বাদের কোনও না কোনও ধরনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। সুফীবাদ ও ইশরাকি অতিন্দ্রীয়বাদের অধিকতর কল্পনা-নির্ভর ও বুদ্ধিদীপ্ত রূপ মুসলিমদের অতীত সঙ্কট মোকাবিলায় সাহায্য করেছিল। তারা আবার এগুলোর শরণাপন্ন হয়েছেন। ঈশ্বরের অনুভূতিকে প্রতিবন্ধক মনে করা হয়নি, বরং আধুনিকতায় পদার্পণকে তরান্বিতকারী গভীর স্তরে পরিবর্তনের শক্তি হিসাবে দেখা হয়েছে একে। এভাবেই ইরানি সংস্কারক জামাল আদ-দিন আল-আফগানি (১৮৩৮-৮৭) সুহরাওয়ার্দির ইশরাকি অতিন্দ্রীয়বাদের ব্রতী হয়েও একই সঙ্গে আধুনিকীকরণেরও প্রবল সমর্থক ছিলেন। ইরান, আফগানিস্তান, মিশর ও ভারত ভ্রমণ করার সময় আল-আফগানি সবার কাছে নিজেকে সবকিছু হিসাবে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছিলেন। নিজেকে সুন্নীর কাছে সুন্নী, শিয়াহর কাছে শিয়াহ্, শহীদ, বিপ্লবী, ধার্মিক, দার্শনিক ও একজন সাংসদ হিসাবে তুলে ধরার ক্ষমতা রাখতেন তিনি। ইশরাকি অতিন্দ্রীয়বাদের অনুশীলন মুসলিমদের চারপাশের জগতের সঙ্গে একাত্মবোধ করতে ও সত্তায় বাধা হয়ে থাকা সীমা রেখা অদৃশ্য হওয়ার এবং মুক্তির অনুভূতির স্বাদ পেতে সাহায্য করে। মনে করা হয় যে, আল-আফগানির বেপরোয়া ভাব ও বিভিন্ন ভূমিকা গ্রহণ সত্তা সম্পর্কে এর বর্ধিত ধারণাসহ অতিন্দ্রীয়বাদী অনুশীলন প্রভাবিত হয়েছিল।২৫ ধর্ম আবশ্যক ছিল, যদিও সংস্কার প্রয়োজন ছিল। আল দ্বারা আফগানি বিশ্বাসী, এমনকি প্রবলভাবে আস্তিক ছিলেন, কিন্তু তার একমাত্র গ্রন্থ দ্য রিফিউটেশন অভ দ্য মেটেরিয়ালিস্টস-এ ঈশ্বর সম্পর্কে তেমন আলোচনা স্থান পায়নি। পশ্চিম যুক্তিকে মূল্য দেয় এবং ইসলাম ও প্রাচ্যবাসীদের অযৌক্তিক হিসাবে দেখে জানতেন বলে আল-আফগানি ইসলামকে এর যুক্তির নির্দয় কাল্ট দিয়ে আলাদা ধর্ম বিশ্বাস হিসাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন। আসলে মুতাযিলিদের মতো যুক্তিবাদীরাও তাদের। ধর্মেরই এই ব্যাখ্যাকে অদ্ভূত বলে আবিষ্কার করত। আল-আফগানি যত না দার্শনিক তার চেয়ে বেশি ছিলেন কর্মী। সুতরাং, মাত্র একটি সাহিত্য প্রয়াস দিয়ে তাঁর জীবন ও বিশ্বাসকে বিচার না করাটা গুরুত্বপূর্ণ। তা সত্ত্বেও, পাশ্চাত্য আদর্শ হিসাবে পরিগণিত ব্যবস্থায় মানানসই করার উদ্দেশ্যে ইসলামের এ রকম বর্ণনা মুসলিম বিশ্বের এক নতুন আস্থাহীনতা তুলে ধরেছে অচিরেই যা চরম ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠবে।
আল-আফগানির মিশরিয় অনুসারী মুহাম্মদ আবদুহর (১৮৪৯-১৯০৫) ভিন্ন রকম দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। কেবল মিশরে কার্যক্রম সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে এখানকার মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষার দিকে মনোযোগ দেন তিনি। ঐতিহ্যবাহী ইসলামি পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছিলেন তিনি, যা তাঁকে সুফী শেখ দারবীশ এর প্রভাবে নিয়ে আসে, যিনি তাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, বিজ্ঞান ও দর্শন ঈশ্বরের জ্ঞান লাভের সবচেয়ে নিশ্চিত দুটি পথ। পরিণামে আবদুহু কায়রোর মর্যাদাপূর্ণ আল-আযহার মসজিদে পড়াশোনা শুরু করার সময় এখানকার প্রাচীন পাঠক্রম দেখে মোহমুক্ত হয়ে পড়েন। এর বদলে তিনি আল-আফগানির প্রতি আকৃষ্ট হন, যিনি তাঁকে যুক্তিবিদ্যা, ধর্মতত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থ বিজ্ঞান ও অতিন্দ্রীয়বাদের শিক্ষা দেন। পশ্চিমের কোনও কোনও ক্রিশ্চান মনে করত বিজ্ঞান ধর্ম বিশ্বাসের শত্রু, কিন্তু মুসলিম অতিন্দ্রীয়বাদীরা প্রায়শঃই ধ্যানের সহায়ক হিসাবে গণিত ও বিজ্ঞান ব্যবহার করেছে। বর্তমানকালে শিয়াদের কিছু চরমপন্থী অতিন্দ্রীয়বাদী গোষ্ঠী-যেমন দ্রুজ বা আলা-বিশেষভাবে আধুনিক বিজ্ঞানে আগ্রহী। ইসলামি বিশ্বে পশ্চিমা রাজনীতির ব্যাপারে অনেক সঙ্কোচ রয়েছে। কিন্তু একে পশ্চিমা বিজ্ঞানের সঙ্গে ঈশ্বরে বিশ্বাসের সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে খুব নগণ্য সংখ্যকই সমস্যা হিসাবে আবিষ্কার করেছে।
