অন্যদিকে ইউরোপিয়দের ভেতর কেবল আজকের দিনেই উন্নত নয়, বরং আগাগোড়াই তাদের সংস্কৃতি প্রগতির বাহন থাকার বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে উঠেছিল। প্রায়শঃই ইতিহাস সম্পর্কে ব্যাপক অজ্ঞতার প্রকাশ ঘটায় তারা। নিজেদের মঙ্গলের জন্যেই ভারতীয়, মিশরিয় ও সিরিয়দের পশ্চিমাকরণের প্রয়োজন হয়েছিল। এই ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি ১৮৮৩ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত মিশরে নিয়োজিত কনসাল জেনারেল ইভলিন ব্যারিং, লর্ড ক্রোমারের ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে:
স্যার আলফ্রেড লায়াল আমাকে একবার বলেছিলেন: “প্রাচ্য মননে সঠিকতা খাপ খায় না। প্রতিটি অ্যাঙলো-ইন্ডিয়ানের সব সময় একথা মনে রাখা উচিত’: সঠিকতার ঘাটতি, যা সহজেই অবিশ্বাস্যতায় পরিণত হয়, আসলে প্রাচ্য মননের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ইউরোপিয় কঠোর যুক্তিবাদী: কোনও কিছু সম্পর্কে তার বক্তব্যে কোনওরকম দ্ব্যর্থবোধকতা থাকে না; সে স্বভাব যুক্তিবাদী, যুক্তি বিজ্ঞান পড়াশোনা নাও করে থাকে, জন্মগতভাবেই সে সংশয়বাদী, যে কোনও প্রস্তাবনা সত্য হিসাবে মেনে নেওয়ার আগে প্রমাণ খোঁজে। তাঁর প্রশিক্ষিত বুদ্ধিমত্তা যন্ত্রের মতো কাজ করে। অন্যদিকে প্রাচ্যবাসীর মন তার চিত্রবৎ রাস্তার মতোই সর্বক্ষণ সামঞ্জস্যতার অভাবে ভুগছে। তাঁর যুক্তি প্রয়োগ অগোছালো। যদিও প্রাচীন আরবরা দ্বাম্বিকতার জ্ঞানে কিছুটা উচ্চ যোগ্যতা অর্জন করেছিল, কিন্তু তাদের উত্তরসুরিদের ভেতর যৌক্তিক জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। প্রায়শঃই তারা কোনও সহজ প্রস্তাবনার ক্ষেত্রেও সবচেয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারে না যা থেকে তারা সত্য স্বীকার করতে পারে।[২৪]
যেসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে হয়েছিল সেগুলোর অন্যতম হচ্ছে ইসলাম। ক্রুসেডের সময় খৃস্ট জগতে পয়গম্বর মুহাম্মদ (স) ও তাঁর ধর্ম সম্পর্কে এক নেতিবাচক ইমেজ গড়ে উঠেছিল যা ইউরোপের অ্যান্টি-সেমিটিজমের সঙ্গে অব্যাহত রয়ে গিয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে ইসলামকে প্রগতির প্রত্যক্ষ অন্তরায় অদৃষ্টবাসী ধর্ম হিসাবে দেখা হয়েছে। যেমন, লর্ড ক্রোমার মিশরিয় সংস্কারক মুহাম্মদ আবদুহর সংস্কার প্রয়াসকে তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, ইসলাম নিজেকে সংস্কারের অযোগ্য।
প্রচলিত উপায়ে ঈশ্বরের উপলব্ধির বিকাশ ঘটানোর সময় বা শক্তি কোনওটাই মুসলিমদের ছিল না। পশ্চিমের সঙ্গে তাল মেলানোর সংগ্রামে নিয়োজিত ছিল তারা। কেউ কেউ পশ্চিমের সেকুলারিজমকে সমাধান হিসাবে দেখেছে, কিন্তু ইউরোপে যা ইতিবাচক ও উদ্দীপক হিসাবে কাজ করেছে ইসলামি বিশ্বের কাছে স্রেফ অচেনা ও বিদেশী ঠেকেছে, কেননা এর উৎপত্তি তাদের নিজস্ব ট্র্যাডিশন ও কালে ঘটেনি। পশ্চিমে ঈশ্বরকে দূরত্ব সৃষ্টিকারী স্বর হিসাবে দেখা হয়েছিল; মুসলিম বিশ্বের পক্ষে এটা ছিল ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়া। সংস্কৃতির শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ দিশাহারা ও নিখোঁজ বোধ করেছে। কোনও কোনও মুসলিম সংস্কারক ইসলামের ভুমিকাকে জোরপূর্বক খাটো করে প্রগতির গতিকে ত্বরান্বিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। এর ফল মোটেই তাঁদের আশানুরূপ হয়নি। নতুন জাতি-রাষ্ট্র তুরস্কে ১৯১৭ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর পর পরবর্তীকালে কামাল আতার্তুক নামে পরিচিত হয়ে ওঠা মুস্তাফা কামাল (১৮৮১-১৯৩৮) নিজ দেশকে পশ্চিমা জাতিতে পরিবর্তিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন; ধর্মকে তিনি নেহাতই ব্যক্তিগত বিষয়ে পরিণত করে ইসলামকে হটিয়ে দেন। সুফী বৃত্তি ধ্বংস করা হয়, আত্মগোপনে চলে যায় তা: মাদ্রাসাগুলো বন্ধ ঘোষিত হয়; রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে উলেমাদের প্রশিক্ষণের অবসান ঘটে। সেকুলারকরণের এই প্রক্রিয়া ধর্মীয় শ্রেণীগুলোর দর্শনযোগ্যতা কমিয়ে দেওয়া ফেয নিষিদ্ধ করার মাঝে প্রতীকায়িত হয়েছে, মানুষকে পাশ্চাত্যের অনুরূপ পোশাক পরতে বাধ্য করার একটা মনস্তাত্ত্বিক প্রয়াসও ছিল এটা: ফেযের বদলে মাথায় হ্যাট চাপানোর মানে ছিল ইউরোপায়িত হওয়া। ১৯২৫-১৯৪১ মেয়াদে ইরানের শাহ্ রেযা খান আতাতুর্ককে সম্মান করতেন; তিনিও একইরকম নীতি গ্রহণ করার চেষ্টার চালান; বোরখা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়, মোল্লাদের দাড়ি কামাতে বাধ্য করে ঐতিহ্যবাহী পাগড়ীর বদলে কেপি পরতে বাধ্য করা হয়; শিয়াহ্ ইমাম ও শহীদ হুসেইনের উদ্দেশে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের প্রচলিত অনুষ্ঠানও বাতিল করে দেওয়া হয়।
ফ্রয়েড প্রাজ্ঞভাবেই অনুভব করেছিলেন, ধর্মের যে কোনও জবরদস্তিমূলক অবদমন ধ্বংসাত্মক হয়ে দাঁড়াতে পারে। যৌনতার মতো ধর্মও জীবনকে সর্বস্তরে প্রভাবিতকারী একটি মানবিক চাহিদা। অবদমান করা হলে যে কোনও মারাত্মক যৌন অবদমনের মতো বিস্ফোরক ও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে । মুসলিমরা নব্য তুরস্ক ও ইরানকে সন্দেহ ও বিস্ময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছে। ইরানে আগে থেকেই মোল্লাহদের জনগণের নামে শাহদের বিরোধিতা করার একটা ঐতিহ্য ছিল। অনেক সময় অসাধারণ সাফল্যও অর্জন করেছেন তারা। ১৮৭২ সালে শাহ তামাকের উৎপাদন, বিক্রি ও রপ্তানির একচেটিয়া অধিকার ব্রিটিশদের কাছে বিক্রি করে ইরানি উৎপাদক প্রতিষ্ঠাগুলোকে ব্যবসাচ্যুত করলে মোল্লাহরা ইরানি জনগণের জন্যে ধূমপান নিষিদ্ধ করে ফতোয়া জারি করেছিলেন। প্রদত্ত সুবিধা তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন শাহ। পবিত্র নগরী কুম তেহরানের স্বৈরাচারী ও ক্রমশঃ নির্মম হয়ে ওঠা শাসকের বিরুদ্ধে এক বিকল্প হয়ে ওঠে। ধর্মের অবদমন মৌলবাদের জন্ম দিতে পারে, যেমন ঈশ্বর বিশ্বাসের অপূর্ণাঙ্গ রূপ নিতে পারে ঈশ্বরের প্রত্যাখ্যানের রূপ। তুরস্কে মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় অনিবার্যভাবে উলেমাদের কর্তৃত্ব খর্ব হয়ে পড়েছিল। এর মানে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে অধিকতর শিক্ষিত, পরিমার্জিত ও দায়িত্বশীল উপাদান কমে গিয়েছে, অন্যদিকে আগ্রাউন্ডের সুফীবাদের অধিকতর জাঁকাল রূপ ধর্মের একমাত্র ধরণ রয়ে গিয়েছিল।
