পশ্চিমে ঈশ্বর সব সময়ই এক সংগ্রামের নাম ছিলেন। তাঁর প্রয়াণও মানসিক চাপ, নৈঃসঙ্গ ও আতঙ্ক দিয়েই মোকাবিলা করা হয়েছে। এভাবে ইন মেমোরিয়াম কবিতায় মহান ভিক্টোরিয়ান সংশয়বাদী কবি আলফ্রেড লর্ড টেনিসন এক উদ্দেশ্যবিহীন, নির্বিকার, তীক্ষ্ম নখ-দাঁতঅলা প্রকৃতির সম্ভাবনায় আতঙ্কে কুকড়ে গিয়েছেন। দ্য অরিজিন অভ স্পিসিস প্রকাশের নয় বছর আগে ১৮৫০ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় দেখা যায়, টেনিসন ইতিমধ্যে অনুভব করেছেন তাঁর বিশ্বাস ভেঙে-চুরে যাচ্ছে আর তিনি স্বয়ং পরিণত হয়েছেন:
রাতে ক্রন্দরত শিশুতে;
আলোর জন্যে ক্রন্দনরত শিশু
কান্না বাদে আর কোনও ভাষা নেই যার।
ডোভার বীচ-এ ম্যাথু আরনল্ড মানব জাতিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন বিস্তারে দিশেহারা অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া বিশ্বাসের সাগরের অপ্রতিরোধ্য প্রত্যাহারে বিলাপ করেছেন। সন্দেহ আর মহাশঙ্কা অর্থোডক্স বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল, যদিও ঈশ্বরের প্রত্যাখ্যান পাশ্চাত্যের সন্দেহের স্পষ্ট চেহারা ধারণ করেনি, বরং আরও বেশি করে চরম অর্থেরই প্রত্যাখ্যান ছিল। ফিয়দর দস্তয়েভস্কি-যার দ্য ব্রাদার্স কারামাযোভ (১৮৮০) কে ঈশ্বরের প্রয়াণের বর্ণনা হিসাবে দেখা যেতে পারে১৮৫৪ সালের মার্চ মাসে এক চিঠিতে বন্ধুর কাছে বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে আপন টানপড়েনের কথা লিখেছেন:
নিজেকে আমি কালের শিশু মনে করি, অবিশ্বাস আর সন্দেহ ভরা শিশু; এমন হতে পারে, উঁহু, আমি নিশ্চিত, মৃত্যুর দিনেও আমি এমনই রয়ে যাব। বিশ্বাস করার আকাঙ্ক্ষায় আমি নির্যাতিত হয়েছি-এমনকি, সত্যি বলতে এখনও হচ্ছি; আর বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যা যত বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে আকাক্ষাও ততই প্রবল রূপ নিচ্ছে।
তাঁর উপন্যাসটিও একইভাবে দোদূল্যমান। ইভান, অন্য চরিত্রগুলো যাকে নাস্তিক হিসাবে বর্ণনা করেছে, (যে বর্তমানে বিখ্যাত: ‘ঈশ্বর না থাকলে সব কিছুই বৈধ প্রবাদটির জনব) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলছে, সে ঈশ্বরে বিশ্বাস করলেও এই ঈশ্বরকে গ্রহণযোগ্য মানতে পারছে না। কেননা তিনি জীবনের ট্র্যাজিডির পরম অর্থের যোগান দিতে ব্যর্থ। বিবর্তন তত্ত্বে উদ্বিগ্ন নয় ইভান, বরং ইতিহাসে মানুষের দুঃখ কষ্ট ও বেদনাই তাকে বিচলিত করে: সবকিছু ঠিক হয়ে যাবার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে একমাত্র সন্তানের মৃত্যু মূল্য হিসাবে অনেক চড়া। এই অধ্যায়ের শেষে আমরা দেখব, ইহুদিরাও একই উপসংহারে পৌঁছাবে। অন্যদিকে সাধু-প্রতীম আলিয়োশা স্বীকার করেছে, সে ঈশ্বর বিশ্বাসী নয়-এই স্বীকারোক্তি যেন অসচেতন অবস্থায় বেরিয়ে এসেছে, যেন তার মনের গভীর অচেনা প্রদেশ থেকে পালিয়ে এসেছে। দোদূল্যমানতা ও বিশ্বাস পরিত্যাগের অস্পষ্ট বোধ বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যকে তাড়া করে বেরিয়েছে এর পরিত্যক্ত ভূমির ইমেজারি আর এক গদোর জন্যে মানুষের প্রতীক্ষা নিয়ে, যিনি কখনও আবির্ভূত হন না।
মুসলিম বিশ্বেও একই রকম অস্থিরতা ও অশান্তি ছিল, যদিও তার উৎস ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ ইউরোপের মিশন সিতিলাপ্রাইস অনেকদূর অগ্রসর হয়ে গিয়েছিল। ১৮৩০ সালে ফরাসিরা আলজিয়ার্সে উপনিবেশ স্থাপন করে; ১৮৩৯ সালে ব্রিটিশরা অডেন উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত করে। নিজেদের মধ্যে তিউনিসিয়া (১৮৮১), মিশর (১৮৮২), সুদান। (১৮৯৮) এবং লিবিয়া ও মরক্কো (১৯১২) ভাগ করে নিয়েছিল এরা। ১৯২০ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যকে প্রটেক্টরেট ও ম্যান্ডেট হিসাবে ভাগ করে নেয়। এই উপনিবেশবাদী প্রকল্প পাশ্চাত্যকরণের এক নীরব প্রক্রিয়াকে আনুষ্ঠানিক চেহারা দিয়েছিল, কেননা ইউরোপিয়রা আধুনিকতার নামে ঊনবিংশ শতাব্দীতে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছিল। কারিগরি শক্তিতে বলীয়ান ইউরোপ নেতৃত্বের অবস্থানে এসে গোটা বিশ্ব দখল করে নিচ্ছিল। তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যে ট্রেডিং পোস্ট ও কনসুলার মিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়; প্রকৃত পাশ্চাত্য শাসন শুরু হওয়ার আগেই এসব সমাজের ঐতিহ্যগত কাঠামোর ক্ষতি সাধন করেছিল তা। এটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের উপনিবেশিকরণ। মুঘলরা ভারত অধিকার করে নেওয়ার পর হিন্দু জনগোষ্ঠী তাদের সংস্কৃতিতে বহু মুসলিম উপাদান আত্মস্থ করে নিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বদেশী সংস্কৃতির পুনরুত্থান ঘটেনি । নতুন ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করে শাসনাধীন জাতির জীবনাচারকে চিরদিনের মতো পাল্টে দিয়েছিল ।
উপনিবেশের অধীনস্থ এলাকার পক্ষে তাল মিলিয়ে ওঠা অসম্ভব ছিল। প্রাচীন প্রথাসমূহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল; মুসলিম সমাজই ‘পাশ্চাত্যকৃত’ ও ‘অন্য এই দুভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। মুসলিমদের কেউ কেউ হিন্দু ও চীনাদের সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে তাদের সম্পর্কে পশ্চিমাদের মূল্যায়ন ‘প্রাচ্যবাসী’ তকমা মেনে নিয়েছিল নির্বিচারে। কেউ কেউ প্রথাবদ্ধ আপন জাতভাইদের ছোট করে দেখেছে। ইরানে শহা নাসিরুদ্দিন (১৮৪৮ ৯৬) জোরের সঙ্গে প্রজাদের ঘৃণা করার কথা বলেছেন। একসময় নিজস্ব পরিচয় ও ঐক্য নিয়ে জীবন্ত সভ্যতা ক্রমেই অচেনা এক জগতের অসম্পূর্ণ অনুকরণের ছোট ছোট পরাধীন খণ্ড রাষ্ট্রে পরিণত হয়। উদ্ভাবন ছিল ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার মূল সুর: অনুকরণ দিয়ে এটা অর্জন করা যায় না। আজকের দিনে যেসব নৃতাত্ত্বিক আরব বিশ্বের আধুনিকায়িত দেশ বা নগরী যেমন, কায়রো, নিয়ে গবেষণা করেন, তাঁরা বলেন, নগরীর স্থাপত্য কলা ও পরিকল্পনা প্রগতির চেয়ে প্রভুত্বকেই বেশি করে প্রকাশ করে।[২৩]
