নিৎশে শিক্ষা দিয়েছেন, ক্রিশ্চান ঈশ্বর ছিলেন করুণার যোগ্য, অবাস্তব এবং জীবনের বিরুদ্ধে এক অপরাধ। মানুষকে তিনি আপন দেহ, আবেগ ও যৌনতাকে ভয় করার উৎসাহ দিয়েছেন ও সমবেদনার এক করুণ নৈতিকতার পক্ষে কথা বলেছেন যা আমাদের দুর্বল করে দিয়েছে। পরম অর্থ বা মূল্য বলে কিছু ছিল না এবং ঈশ্বরের কোনও রকম পরিশ্রম সাপেক্ষ বিকল্প দান করার কোনও প্রয়োজন ছিল না; আবার একথা বলা দরকার যে, পশ্চিমের ঈশ্বর এই সমালোচনার কাছে নাজুক ছিলেন। জীবন অস্বীকারকারী সংযমের মাধ্যমে মানুষকে মনুষ্যত্ব ও যৌন কামনা থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার জন্যে তাকে ব্যবহার করা হচ্ছিল। পৃথিবীর এই জীবনের বিকল্প ও সহজ রোগ নিরাময়কারীতেও পরিণত করা হয়েছিল।
সিগমান্ড ফ্রয়েড (১৮৫৬-১৯৩৯) নিঃসন্দেহে ঈশ্বরের বিশ্বাসকে ভ্রান্তি হিসাবে বিবেচনা করেছেন, পরিণত নারী-পুরুষের যা একপাশে সরিয়ে রাখা উচিত। ঈশ্বরের ধারণা মিথ্যা, বরং অবচেতন মনের কৌশল, যাকে মনস্তত্ত্ব দিয়ে উৎপাটন করা প্রয়োজন ছিল । একজন ব্যক্তিক ঈশ্বর এক মহিমান্বিত পিতৃপুরুষ ছাড়া আর কিছুই নন; এমন একজন উপাস্যের আকাঙ্ক্ষা ছোটবেলার শক্তিমান ও যত্নবান পিতার জন্যে কামনা এবং বিচার, নিরপেক্ষতা ও বাধাহীন জীবনযাপনের ইচ্ছা থেকে জেগে ওঠে। ঈশ্বর এসব আকাক্ষার অভিক্ষেপ মাত্র, অসহায়ত্বের অনুভূতির কারণে মানুষ এর উপাসনা করে। ধর্ম মানব জাতির শৈশবের ব্যাপার ছিল; ছেলেবেলা থেকে পরিণত বয়সে পৌঁছাতে এর প্রয়োজন ছিল। সমাজের জন্যে অতি প্রয়োজনীয় নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটিয়েছিল তা। এখন যেহেতু মানব জাতি পরিণত হয়ে উঠেছে, একে এবার ত্যাগ করা উচিত। এটা নয়া লোগোস-বিজ্ঞান-ঈশ্বরের স্থান অধিকার করতে পারবে, আমাদের নৈতিকতার নতুন ভিত্তি যোগাবে আমাদের আতঙ্কের মোকাবিলায় সাহায্য করবে। বিজ্ঞানে আপন বিশ্বাসের বেলায় অন্ধ ছিলেন। ফ্রয়েড, যাকে প্রায় ধার্মিকতার মতো প্রবল মনে হয় না, আমাদের বিজ্ঞান বিভ্রান্তি নয়। এটা মনে করা ভ্রান্তি হবে যে, বিজ্ঞান যা দিতে পারবে না তা আমরা অন্যত্র পাব।’
সকল সাইকোঅ্যানালিস্ট ঈশ্বর সম্পর্কে ফ্রয়েডিয় দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত পোষণ করেননি। আলফ্রেড অ্যাডলার (১৮৭০-১৯৩৭) ঈশ্বরকে অভিক্ষেপ হিসাবে মেনে নিলেও বিশ্বাস করতেন যে, এটা মানুষের জন্যে উপকারী ছিল; এটা ছিল সর্বশ্রেষ্ঠর এক অসাধারণ ও কার্যকর প্রতীক। সি. জি, জাংয়ের (১৮৭৫-১৯৬১) ঈশ্বর অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বরের মতোই এক মনস্তাত্ত্বিক সত্য ছিলেন, প্রত্যেক ব্যক্তির অন্তরে যিনি অনুভূত হন। বিখ্যাত ফেস টু ফেস সাক্ষাৎকারে জন ফ্রিম্যান যখন জানতে চেয়েছিলেন তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন। কিনা, জাং জোরাল জবাব দিয়েছিলেন: “আমার বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই, আমি জানি। জাংয়ের বিশ্বাস দেখায় যে, সত্তার গভীরে রহস্যময়ভাবে অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকা একজন অভ্যন্তরীণ ঈশ্বর সাইকোঅ্যানালিস্টিক বিজ্ঞানের মুখেও টিকে যেতে পারেন; অন্যদিকে প্রকৃতই চিরন্তন অপরিপক্কতাকে উৎসাহিতকরী অধিকতর ব্যক্তিক মানবীয় গুণাবলী সম্পন্ন (anthropomorphic) উপাস্য নাও টিকতে পারেন।
মনে হয় অন্যান্য বহু পাশ্চাত্যবাসীর মতো ফ্রয়েড এই অন্তরের ঈশ্বর সম্পর্কে সজাগ বা সচেতন ছিলেন না। তা সত্ত্বেও তিনি ধর্ম ধ্বংস করার প্রয়াস বিপদজ্জনক হবে বলে এক বৈধ এবং বুদ্ধিগ্রাহ্য যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। মানুষকে যথাসময়ে ঈশ্বরকে অতিক্রম করতে হবে; প্রস্তুত হওয়ার আগেই জোর করে তাদের নাস্তিক্যবাদ বা সেকুলারিজমের দিকে ঠেলে দিলে অস্বাস্থ্যকর অস্বীকৃতি ও নিপীড়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। আমরা দেখেছি, সুপ্ত উদ্বেগ ও অন্যের প্রতি আমাদের নিজস্ব শঙ্কা থেকে প্রতিমা বিরোধিতা জন্ম নিতে পারে। ঈশ্বরকে ধ্বংস করতে ইচ্ছুক নাস্তিকদের কেউ কেউ নিঃসন্দেহে এক ধরনের চাপের লক্ষণ প্রকাশ করেছে। এভাবে প্রেমপূর্ণ নীতিবোধের পক্ষে কথা বললেও শোপেনহঅর মানুষের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে না পেরে নিভৃতচারীতে পরিণত হয়েছিলেন যিনি কেবল পোষা কুকুর আত্মানের সঙ্গেই যোগাযোগ রেখেছেন। নিৎশে কোমল হৃদয়, নিঃসঙ্গ মানুষ ছিলেন, ভঙ্গ স্বাস্থ্য ছিল তাঁর, অতি মানব থেকে একেবারেই ভিন্ন। শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। মহানন্দে ঈশ্বরকে ত্যাগ করেননি তিনি, যদিও তাঁর তাঁর পদ্যের পরমানন্দের ভাবে আমাদের সেরকম মনে হতে পারে। অনেক কম্পন, শিহরণ ও আত্ম-নিপীড়নের মরু পেরিয়ে আসা এক কবিতায় তিনি যুরোথুস্টকে দিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রত্যাবর্তনের আবেদন জানিয়েছেন।
না! তোমার সকল নিপীড়নসহ
ফিরে এসো!
হায়, ফিরে এসো,
সকল নৈঃসঙ্গের শেষে!
আমার চোখের সব অশ্রু
তোমার জন্যেই বয়ে যায়!
আমার হৃদয়ের শেষ শিখাটি
তোমার জন্যে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে!
হায়, ফিরে এসো।
আমার অচেনা ঈশ্বর! আমার বেদনা! আমার অন্তিম-সুখ।
হেগেলের মতো নিৎশের মতবাদসমূহও পরবর্তী জার্মান প্রজন্ম ন্যাশনাল সোশ্যালিজমের নীতিমালার ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করতে কাজে লাগিয়েছে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নাস্তিক্যবাদী আদর্শও ঈশ্বরের ধারণার মতোই নিষ্ঠুর, নির্দয় ক্রুসেডিয় নীতির দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে ।
