একইভাবে ঈশ্বর ও ঐশীগ্রন্থের আক্ষরিক উপলব্ধি বহু ক্রিস্টানের ধর্ম বিশ্বাসকে এ সময়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কাছে নাজুক করে তুলেছিল। চার্লস লিয়েলের ভূতাত্ত্বিক সময়কালের বিশাল দৃষ্টিকোণ উন্মোচনকারী প্রিন্সিপালস অভ জিওলজি (১৮৩০-৩৩) এবং চার্লস ডারউইনের বিবর্তনের ধারণাকে সামনে নিয়ে আসা দ্য অরিজিন অভ স্পিসিস (১৮৪৯) সৃষ্টির বাইবেলিয় বিবরণের বিরোধী বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। নিউটনের সময় থেকেই সৃষ্টির প্রসঙ্গটি ঈশ্বর সম্পর্কে পাশ্চাত্যে উপলব্ধির কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছিল; মানুষ একথা বিস্মৃত হয়েছিল যে, বাইবেলের কাহিনীকে কখনও বিশ্বজগতের ভৌত ইতিহাসের বিবরণ হিসেবে বিবেচনা করার উদ্দেশ্য ছিল না। প্রকৃতপক্ষেই শূন্য হতে সৃষ্টির মতবাদ বহুকাল আগে থেকেই সমস্যা সঙ্কুল ছিল এবং অপেক্ষাকৃত অনেক পরে ইহুদিবাদ ও খৃস্ট ধর্মে অনুপ্রবেশ করেছিল; ইসলাম ধর্মে আল্লাহ কর্তৃক জগৎ সৃষ্টির ধারণা মেনে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেটা কীভাবে ঘটেছে তার বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি। ঈশ্বর সম্পর্কে কোরানের অন্য সব বক্তব্যের মতো সৃষ্টি সম্পর্কিত মতবাদও ‘রূপক’-এক নিদর্শন বা প্রতীক মাত্র। তিন একেশ্বরবাদী ধর্মের সবকটাই সৃষ্টিকে মিথ হিসাবে দেখেছে, শব্দটির সবচেয়ে ইতিবাচক অর্থে এটা এক প্রতীকী বিবরণ যা নারী-পুরুষকে একটি বিশেষ ধর্মীয় মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। ইহুদি ও মুসলিমদের কেউ কেউ ইচ্ছা করেই সৃষ্টির কাহিনীর কল্পনা-নির্ভর ব্যাখ্যা করেছে যা কোনও আক্ষরিক অর্থ থেকে মারাত্মকভাবে দূরে সরে গেছে। কিন্তু পশ্চিমে বাইবেলের প্রতিটি বিবরণকে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি বলে বিশ্বাস করার একটা প্রবণতা ছিল। বহু মানুষই পৃথিবীর বুকে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনার জন্যে ঈশ্বরকে আক্ষরিক ও শারীরিকভাবে দায়ী বলে বিশ্বাস করতে শিখেছে, যেমন আমরা কোনও কিছু তৈরি করি বা কোনও ঘটনা ঘটিয়ে থাকি।
অবশ্য এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্রিশ্চান অচিরেই বুঝতে পেরেছিল, ডারউইনের আবিষ্কারসমূহ কোনওভাবেই ঈশ্বরের ধারণার প্রতি মারাত্মক হুমকি ছিল না। মূল স্রোতধারার খৃস্টধর্ম বিবর্তন তত্ত্বের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেরেছিল, ইহুদি ও মুসলিমরা জীবনের বিকাশ সম্পর্কে বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারে কখনই তেমন বিচলিত বোধ করেনি। সাধারণভাবে বলতে গেলে আমরা দেখব, ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন উৎস থেকে। এটা অবশ্য সত্যি যে, পশ্চিমা সেকুলারিজম বিস্তার লাভ করায় তা অনিবার্যভাবে অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাসের সদস্যদের প্রভাবিত করেছে। ঈশ্বর সম্পর্কে আক্ষরিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনও বহাল আছে; পশ্চিমের অনেকেই সকল পর্যায়ে ধরেই নিয়েছে যে, আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্ব ঈশ্বরের ধারণায় মারণ-আঘাত হেনেছে।
গোটা ইতিহাস জুড়ে ঈশ্বরের ধারণা যখনই আর কাজে আসেনি তখনই মানুষ তা ছুঁড়ে ফেলেছে। কখনও এটা প্রতিমা পূজার বিরোধিতার রূপ নিয়েছে, যেমন প্রাচীন ইসরায়েলিরা কাননবাসীদের ভজনালয়গুলো ধ্বংস করে দিয়েছিল কিংবা পয়গম্বররা যখন তাদের পৌত্তলিক দেবতাদের বিরুদ্ধে। অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। ১৮৮২ সালে ফ্রেডেরিখ নিৎশে ঈশ্বরের প্রয়াণ ঘটার ঘোষণা দিয়ে অনুরূপ সহিংস কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এক পাগলের কাহিনীর মাধ্যমে বিপ্লবাত্মক ঘটনার প্রকাশ করেছেন তিনি। এই উন্মাদ একদিন সকালে বাজার এলাকার হাজির হয়ে চেঁচাতে লাগল, আমি ঈশ্বরকে চাই! আমি ঈশ্বরকে খুঁজছি।’ উন্মাসিক দর্শকরা যখন জানতে চাইল যে, ঈশ্বর কোথায় গেছেন বলে তার ধারণা-তিনি কি পালিয়েছেন নাকি ভিন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন?-উন্মাদ চোখ রাঙিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ঈশ্বর কোথায় গেছে? সেটাই তোমাদের বলতে চাই। আমরা তাকে হত্যা করেছি-তোমরা এবং আমি! আমরা সবাই তার হত্যাকারী। এক অকল্পনীয় অথচ অপরিবর্তনীয় ঘটনা মানব জাতিকে মহাবিশ্বে ছুঁড়ে দিল। এতদিন পর্যন্ত যা মানুষকে একটা দিক নির্দেশনায় অনুভূতি যোগাচ্ছিল তা হারিয়ে গেল । ঈশ্বরের প্রয়াণ নজীরবিহীন হতাশা ও আতঙ্কের সৃষ্টি করবে। এখনও কি স্বর্গ আর নরক আছে? পাগল লোকটি যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে ওঠে, আমরা কি এক অসীম শূন্যতার মাঝে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাইনি?১৭
নিৎশে উপলব্ধি করেছিলেন, পশ্চিমের মানুষের চেতনায় এক চরম পরিবর্তন ঘটে গেছে যা অধিকাংশ লোকে যে ব্যাপারটিকে ‘ঈশ্বর হিসাবে বিবৃত করে তাতে বিশ্বাস রাখা ক্রমবর্ধমান হারে কঠিন করে তুলবে। আমাদের বিজ্ঞান সৃষ্টির আক্ষরিক অনুধাবনের ধারণাকে কেবল অসম্ভবই করে তোলেনি, বরং আমাদের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা স্বর্গীয় তত্ত্বাবধায়কের ধারণাকেও অগ্রহণযোগ্য করে দিয়েছে। মানুষের মনে হয়েছে, তারা এক নতুন দিন। প্রত্যক্ষ করছে। নিৎশের উন্মাদ জোর দিয়ে বলেছে, ঈশ্বরের প্রয়াণ মানুষের ইতিহাসের এক উচ্চতর পর্যায়ের সূচনা করবে। উপাস্য হত্যা ন্যায্য প্রতিপন্ন। করার জন্যে মানুষকেই দেবতায় পরিণত হতে হবে। দাস স্পেক যরোথুস্ট্র (১৮৮৩)-তে এক অতিমানবের জন্মলাভের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি, যিনি ঈশ্বরের স্থান গ্রহণ করবেন; আলোকিত নতুন মানুষ প্রাচীন ক্রিশ্চান মূল্যবোধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন, মানুষের মূল রীতিনীতিকে ধ্বংস করে নতুন শক্তিশালী মানবজাতির আগমন ঘটাবেন, ক্রিশ্চানদের দুর্বল ভালোবাসা ও করুণার গুণাবলীর কোনওটিই যার থাকবে না। তিনি বুদ্ধ মতবাদের মৃত ধর্মে দেখা পাওয়া চিরন্তন পুনর্ঘটন ও পুনর্জন্মের প্রাচীন মিথেরও শরণাপন্ন হয়েছেন। এখন ঈশ্বর যেহেতু পরলোকগমন করেছেন, এই পৃথিবীই পরম মূল হিসাবে তার স্থান অধিকার করতে পারে। যা কিছু বিদায় নেয়, আবার ফিরে আসে; যা কিছু মারা যায়, আবার তা জন্ম নেয়; যা কিছু ভাঙে আবার তা জোড়া লাগে। আমাদের পৃথিবী চিরন্তন ও স্বর্গীয় হিসাবে পূজিত হতে পারে, যে গুণাবলী এক সময় কেবল দূরবর্তী দুৰ্জ্জেয় ঈশ্বরের প্রতি প্রযুক্ত হতো।
