হেগেল অবশ্য একাধারে আলোকন পর্ব ও রোমান্টিক যুগের মানুষ ছিলেন; সে কারণে কল্পনার চেয়ে যুক্তিকে বেশি মূল্য দিয়েছেন। আবার অনিচ্ছাকৃতভাবেই অতীতের দর্শনের প্রতিধ্বনি করেছেন। ফায়লাসুফদের মতো যুক্তি ও দর্শনকে ধর্মের চেয়ে উঁচু মর্যাদা সম্পন্ন হিসাবে দেখেছেন তিনি, যা চিন্তার প্রতিনিধিত্বমূলক ধারায় প্রোথিত। আবার ফায়লাসুফদের মতো পরম সত্তা সম্পর্কে ব্যক্তির মনোজগতের ক্রিয়া হতে উপসংহার টেনেছেন হেগেল, যাকে তিনি সমগ্রকে তুলে ধরা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় বন্দি হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
তাঁর দর্শনকে আর্থার শোপেনহঅর (১৭৮৮-১৮৬০) কাছে হাস্যকরভাবে আশাবাদী ঠেকেছিল । ১৮১৯ সালে বার্লিনে হেগেল নির্ধারিত সময়েই ভাষণ দেওয়ার সময়সূচি নির্ধারণ করেছিলেন তিনি, এ বছরই তাঁর দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাজ উইল অ্যান্ড আইডিয়া গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। শোপেনহঅর বিশ্বাস করতেন, পরম সত্তা, ঈশ্বর বা আত্মা বলে কোনও কিছু এই জগতে ক্রিয়াশীল নেই: আছে কেবল বেঁচে থাকার অদম্য আদিম ইচ্ছা। এই বিষণ্ণ দর্শন রোমান্টিক আন্দোলনের নেতিবাচক চেতনায় আবেদন সৃষ্টি করেছিল। অবশ্য ধর্মের সকল দর্শন বাতিল করে দেয়নি এটা। শোপেনহর বিশ্বাস করতেন হিন্দুধর্মমত ও বুদ্ধ মতবাদ (এবং ঐসব ক্রিশ্চান যারা সমস্ত কিছুকে অসার বলে মেনে নিয়েছিল) পৃথিবীর সবকিছু মায়া মাত্র দাবি করে বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিক ও ন্যায্য ধারণায় পৌঁছেছিল। যেহেতু আমাদের রক্ষা করার জন্যে কোনও ঈশ্বর’ নেই, কেবল শিল্পকলা, সঙ্গীত এবং আত্মত্যাগ ও সমবেদনার এক অনুশীলনই আমাদের মাঝে অটল অচঞ্চল বোধ জাগাতে পারে। ইহুদিবাদ ও ইসলাম নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ শোপেনহঅর ছিল না, তাঁর দৃষ্টিতে এদুটো ইতিহাসের অসম্ভব সহজ এবং উদ্দেশ্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে তিনি দূরদর্শিতার প্রমাণ রেখেছেন: আমরা দেখব যে আমাদের দেশে ইহুদি এবং মুসলিমরা আবিষ্কার করেছে যে, থিওফ্যানি হিসাবে ইতিহাসকে দেখার পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি এখন আর আগের মতো ধরে রাখা যাচ্ছে না। অনেকেই এখন আর ইতিহাসের নিয়ন্তা ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছে না। কিন্তু মুক্তি সম্পর্কিত শোপেনহঅর দৃষ্টিভঙ্গি ইহুদি ও মুসলিম ধারণার কাছাকাছিঃ প্রত্যেককে যার যার জন্যে পরম অর্থের একটা বোধ সৃষ্টি করতে হবে। এর সঙ্গে ঈশ্বরের সার্বভৌমত্ব সম্পর্কিত প্রোটেস্ট্যান্ট ধারণার কোনওই মিল ছিল না, যেখানে বোঝানো হয়েছে যে, মুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের কিছুই করার নেই, বরং তারা সম্পূর্ণভাবে বাহ্যিক এক উপাস্যের ওপর নির্ভরশীল।
ঈশ্বর সম্পর্কিত এইসব পুরোনো ধারণা ত্রুটিপূর্ণ ও অপূর্ণ বলে ক্রমবর্ধমান হারে নিন্দিত হচ্ছিল। ডেনিশ দার্শনিক সোরেন কিয়ের্কেগার্দ (১৮১৩-৫৫) জোর দিয়ে বলেছেন যে, বিভিন্ন প্রাচীন বিশ্বাস ও মতবাদ প্রতিমায় পরিণত হয়ে ঈশ্বরের অনির্বচনীয় সত্তার বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃত খৃস্টধর্ম বিশ্বাস এসব ফসিলায়িত মানবীয় ও প্রাচীন ধ্যান-ধারণা হতে দূরবর্তী অজানায় এক উল্লম্ফন। অন্যরা অবশ্য এই পৃথিবীতেই মানুষের শেকড় স্থাপন করতে চেয়ে মহান বিকল্পের ধারণা (Great Aiternative) বাদ দিতে চেষ্টা করেছেন। জার্মান দার্শনিক লুদভিগ আন্দ্রিয়াস ফয়েরবাখ (১৮০৪-৭২) তার প্রভাব বিস্তারকারী গ্রন্থ দ্য এসেন্স অভ ক্রিশ্চানিটি (১৮৪১)-তে যুক্তি তুলে ধরেছেন যে, ঈশ্বর স্রেফ মানবীয় এক অভিক্ষেপ মাত্র। ঈশ্বরের ধারণা আমাদের মানবীয় অক্ষমতা-দুর্বলতার বিপরীতে এক অসম্ভব সম্পূর্ণতাকে স্থাপন করার ভেতর দিয়ে আমাদের নিজস্ব স্বভাব বা প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। এভাবে ঈশ্বর অমীম, মানুষ সসীম; ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, মানুষ দুর্বল; ঈশ্বর পবিত্র, মানুষ পাপী। ফয়েরবাখ পাশ্চাত্য ট্র্যাডিশনের বিশেষ দুর্বল জায়গায় হাত দিয়েছিলেন, সবসময়ই যাকে একেশ্বরবাদে বিপদজ্জনক বিবেচনা করা হয়েছে। যে অভিক্ষেপে ঈশ্বর মানবীয় অবস্থার বাইরে চলে যান সেখানে পরিণাম স্বরূপ প্রতিমা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যান্য ট্রাডিশন এই বিপদ মোকাবিলা করার বিভিন্ন উপায় আবিষ্কার করেছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে একথা সত্য যে, পশ্চিমে ঈশ্বর সংক্রান্ত ধারণা ক্রমবর্ধমানহারে বহিরঙ্গের বিষয়ে পরিণত হয়েছে এবং মানব প্রকৃতির অত্যন্ত নেতিবাচক ধারণা বিস্তারে অবদান রেখেছে। অগাস্তিনের সময় থেকেই পশ্চিমে ঈশ্বরের ধর্মে অপরাধ ও পাপ, সংগ্রাম ও চাপের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছিল, যা উদাহরণ স্বরূপ, গ্রিক অর্থডক্স ধর্মতত্ত্বের কাছে অজানা ছিল। এটা বিস্ময়কর নয় যে, ফয়েরবাখ বা অগাস্ত কোতে (১৭৯৮-১৮৫৭)-এর মতো দার্শনিকগণ, যাদের মানুষ সম্পর্কে অধিকতর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, অতীতে ব্যাপক আস্থাহীনতার কারণ এই ঈশ্বরকে বাদ দিতে চেয়েছিলেন।
নাস্তিক্যবাদ সবসময়ই ঈশ্বর সম্পর্কে প্রচলিত ধ্যান-ধারণার প্রত্যাখ্যান ছিল। ইহুদি ও ক্রিশ্চানরা নাস্তিক আখ্যা পেয়েছিল, কারণ তারা ঈশ্বর সংক্রান্ত প্যাগান ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে, যদিও ঈশ্বরে তাদের বিশ্বাস ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর নব্য-নাস্তিকরা ঈশ্বরের সামগ্রিক ধারণা নয় বরং পশ্চিমে প্রচল ঈশ্বর সম্পর্কিত বিশেষ ধারণার বিরুদ্ধে বাক্যবান হানছিল; এভাবে কার্ল মার্ক্স (১৮১৮-১৮৮৩) ধর্মকে নিপীড়িত জনের দীর্ঘশ্বাস…জনগণের জন্যে এই দুর্দশাকে সহনীয় করে তোলা আফিম’১৬ হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। যদিও তিনি জুদো-ক্রিশ্চান ট্র্যাডিশনের ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল ইতিহাসে মেসিয়ানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু ঈশ্বরকে অপ্রাসঙ্গিক হিসাবে নাকচ করে দিয়েছেন। যেহেতু ঐতিহসিক প্রক্রিয়ার বাইরে অন্য কোনও তাৎপর্য মুল্য বা উদ্দেশ্য নেই, সুতরাং ঈশ্বরের ধারণা মানুষের উপকারে আসতে পারে না। ঈশ্বরের অস্বীকৃতি নাস্তিক্যবাদ সময়ের অপচয়। তবু মার্ক্সীয় সমালোচকের কাছে ঈশ্বর আক্রমণের বিষয় ছিলেন, কেননা শাসক কর্তৃক তিনি প্রায়শঃই ব্যবহৃত হয়েছেন এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা অনুমোদন করার জন্যে যেখানে ধনী প্রাসাদে অবস্থান করে আর দরিদ্রজন তার দরজায় বসে থাকে। অবশ্য সমগ্র একেশ্বরবাদী ধর্মের ক্ষেত্রে এ অভিযোগ সত্যি ছিল না। সামাজিক অনাচারকে প্রশ্রয় দানকারী ঈশ্বর আমোস, ইসায়াহ কিংবা মুহাম্মদকে (স) শঙ্কিত করে তুলতেন, যারা ঈশ্বরের ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন, যার সঙ্গে মার্ক্সীয় আদর্শের প্রচুর সাজুয্য ছিল।
