জীবনের শেষ দিকে শ্লেইয়ারম্যাশারের ধারণা হয় তিনি সম্ভবত অনুভব ও অন্তর্মুখীতার গুরুত্বের ওপর বেশি জোর দিয়ে ফেলেছেন। খৃস্টধর্মকে অচল বিশ্বাস মনে হওয়ার ব্যাপারে সজাগ ছিলেন তিনিঃ কিছু কিছু ক্রিশ্চান মতবাদ ছিল বিভ্রান্তিকর, এগুলো নয়া সংশয়বাদের কাছে ধর্ম বিশ্বাস দুর্বল করে তুলেছিল। উদাহরণস্বরূপ, ট্রিনিটির মতবাদ যেন বোঝাতে চায় ঈশ্বরের সংখ্যা তিন। শ্লেইয়ারম্যাশারের অনুসারী অ্যালবার্ট রিটশল (১৮২২-৮৯) এই মতবাদকে হেলেনাইযেশনের প্রকট নজীর হিসাবে দেখেছেন। এটা গ্রিকদের প্রাকৃতিক দর্শন থেকে উদ্ভূত মেটাফিজিক্যাল ধারণার একটা আস্তরণ’ যোগ করে খৃস্টীয় বাণীকে দুষিত করেছে, যার সঙ্গে সূক্ষ্ম ক্রিশ্চান অনুভূতির কোনও সম্পর্ক নেই। তা সত্ত্বেও শ্লেইয়ারম্যাশার ও রিটশ প্রতিটি প্রজন্ম যে ঈশ্বর সংক্রান্ত নিজস্ব কল্পনানির্ভর ধারণা গ্রহণ করেছে তা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছিলেন, ঠিক যেমন প্রত্যেক রোমান্টিক কবি আপন হৃদস্পন্দনে সত্যকে অনুভব করেছেন। গ্রিক ফাদারগণ আপন সংস্কৃতির পরিভাষায় প্রকাশের মাধ্যমে ঈশ্বরের সেমিটিক ধারণাকে নিজেদের জন্যে কার্যকর করার প্রয়াস পেয়েছিলেন মাত্র। পাশ্চাত্য আধুনিক প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করার সময় ঈশ্বর সম্পর্কিত প্রাচীন ধারণাগুলো অপর্যাপ্ত প্রতীয়মান হয়েছে। কিন্তু তারপরেও শেষ পর্যন্ত শ্লেইয়ারম্যাশার জোরের সঙ্গে বলেছেন যে, ধর্মীয় আবেগ যুক্তির বিপক্ষে নয়। মৃত্যু শয্যায় তিনি বলেছেন: আমাকে অবশ্যই গভীরতম, অনুমান নির্ভর চিন্তা করতে হবে ও আমার কাছে এগুলো সর্বোচ্চ অন্তরঙ্গ ধর্মীয় অনুভূতির পুরোপুরি সমার্থক।[১৫] অনুভব এবং ব্যক্তিগত ধর্মীয় অভিজ্ঞতা কাল্পনিকভাবে রূপান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত ঈশ্বর সম্পর্কে ধারণাসমূহ অর্থহীন।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে একের পর এক প্রধান দার্শনিক ঈশ্বরের প্রচলিত ধারণা, অন্তত পশ্চিমে বিরাজমান ঈশ্বরকে চ্যালেঞ্জ করতে উদ্যত হয়েছেন। তারা বিশেষ করে মহশূন্যে বস্তুগত অস্তিত্ব সম্পন্ন এক অতিপ্রাকৃত উপাস্যের অস্তিত্বের ধারণায় সবচেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত হয়েছেন। আমরা দেখেছি, পরম সত্তা হিসাবে ঈশ্বরের ধারণা পশ্চিমে প্রবল হয়ে উঠলেও অন্য একেশ্বরবাদী ধর্মগুলো নিজেদের এ ধরনের ধর্মতত্ত্ব হতে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ভিন্ন দিকে যাত্রা করছিল। ইহুদি, মুসলিম ও অর্থডক্স ক্রিশ্চানদের প্রত্যেকেই তাদের মতো করে বিভিন্নভাবে জোর দিয়ে বলেছে যে, ঈশ্বর সম্পর্কিত মানবীয় ধারণা এটা যে অনিবৰ্চনীয় সত্তার তুচ্ছ প্রতীক এর সঙ্গে মেলেনি। সবাই বোঝাতে চেয়েছে, কোনও না কোনও সময় ঈশ্বরকে পরম সত্তা না বলে কিছু না হিসাবে বর্ণনা করাই অধিকতর সঠিক, যেহেতু আমাদের বোধগম্য উপায়ে “তিনি অস্তিতৃমান নন। শত শত বছরের পরিক্রমায় পাশ্চাত্য ঈশ্বর সংক্রান্ত অধিকতর কল্পনা-নির্ভর এই ধারণাটি হারিয়ে ফেলেছে। ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্টরা তাকে আমাদের চেনা জগতের ওপর আরোপিত আরেকটি বাস্তবতা হিসাবে দেখতে শুরু করেছিল, যিনি স্বর্গীয় বড় ভাইয়ের মতো, আমাদের কর্মকাণ্ড তত্ত্বাবধান করছেন। এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, বিপ্লবোত্তর বিশ্বের অনেকের কাছেই ঈশ্বরের এই ধারণা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য ছিল, কারণ এতে মানুষকে অত্যন্ত হীনভাবে বশ্যতা মানানো হয়েছে বলে মনে হয়, মানুষকে অর্থহীন, নির্ভরশীল করেছে যা মানুষের মর্যাদার সঙ্গে বেমানান। উনবিংশ শতাব্দীর নাস্তিক্যবাদী দার্শনিকরা যথার্থ কারণেই এই ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। তাদের সমালোচনার ফলে সমসাময়িক অনেকেই একই পথ অনুসরণে অনুপ্রাণিত হয়েছে; তারা যেন একেবারে নতুন কিছু বলছিলেন, কিন্তু যখন ঈশ্বর প্রসঙ্গে নিজেদের জবাব দিয়েছেন, তখন প্রায়শঃই অবচেতনভাবে অতীতের অন্যান্য একেশ্বরবাদীর দর্শনের পুনরাবৃত্তি করেছেন।
এভাবেই জর্জ উইলহেম হেগেল (১৭৭০-১৮৩১) এমন এক দর্শনের জন্ম দেন যা লক্ষণীয়ভাবে কোনও কোনও ক্ষেত্রে কাব্বালাহর অনুরূপ ছিল। ব্যাপারটি পরিহাসমূলক, কেননা ইহুদিবাদকে হীন ধর্ম বিবেচনা করতেন তিনি, যা মহাভ্রান্তি ঘটানো ঈশ্বরের আদিম ধারণার জন্যে দায়ী। হেগেলের দৃষ্টিতে ইহুদিদের ঈশ্বর ছিলেন স্বৈরাচারী, যিনি অসহনীয় এক আইন বা নিয়মের কাছে প্রশ্নাতীত বশ্যতা দাবি করেছেন। জেসাস নারী ও পুরুষকে এই নীচতা থেকে উদ্ধার করার প্রয়াস পেয়েছিলেন, কিন্তু ক্রিশ্চানরাও ইহুদিদের মতো একই ফাঁদে আটকা পড়ে স্বর্গীয় শাসকের ধারণাকে সংহত করেছে। এখন সময় হয়েছে এই বর্বর উপাস্যকে একপাশে ছুঁড়ে ফেলে মানবীয় অবস্থার অধিকতর আলোকিত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা। নিউ টেস্টামেন্টের যুক্তির উপর গড়ে ওঠা ইহুদিবাদ সম্পর্কে হেগেলের ভুল ধারণা ছিল: এক নতুন ধরনের মেটাফিজিক্যাল অ্যান্টি-সেমিটিজম। কান্টের মতো হেগেল ইহুদিবাদকে ধর্মের সব রকম ভুল বা ক্রটির উদাহরণ হিসাবে দেখেছেন। দ্য ফেনোমনোলজি অভ মাইন্ড (১৮০৭)-এ তিনি প্রচলিত উপাস্যের জন্যে পৃথিবীর প্রাণশক্তি আত্মা-র ধারণাকে প্রতিস্থাপিত করেন। তা সত্ত্বেও কাব্বালাহর মতো আত্মা প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা ও আত্ম-সচেতনা অর্জনের জন্যে সীমাবদ্ধতা ও নির্বাসন ভোগ করতে ইচ্ছুক ছিল। আবার কাব্বালার মতোই আত্মা-এর পূর্ণতার জন্যে পৃথিবী ও মানুষের ওপর নির্ভরশীল। এভাবে হেগেল প্রাচীন একেশ্বরবাদী দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছেন-যা খৃস্টধর্ম ও ইসলামেরও বৈশিষ্ট্য-যে ঈশ্বর জাগতিক বাস্তবতা হতে বিচ্ছিন্ন নন, তাঁর আপন জগতে ঐচ্ছিক বাড়তি কিছু নন, বরং মানুষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্লেকের মতো দ্বান্দ্বিকতার মাধ্যমে এই দর্শন প্রকাশ করেছেন তিনি, মানুষ ও আত্মা, সসীম ও অসীমকে একই সত্যের দুটি অংশ বিবেচনা করেছেন, যারা পরস্পরের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশ্মল ও আত্ম-উপলব্ধির একই প্রক্রিয়ার জড়িত। অপরিচিত অনাকাক্ষিত বিধি-বিধান পালনের ভেতর দিয়ে দূরবর্তী এক উপাস্যকে প্রসন্ন। করার বদলে কার্যতঃ হেগেল ঘোষণা করেছেন, ঈশ্বর আমাদের মনুষ্যত্বেরই একটা মাত্রা। প্রকৃতপক্ষেই, হেগেলের আত্মার কেননাসিসের ধারণা-যা পৃথিবীতে সর্বব্যাপী ও রূপ ধারণের জন্যে নিজেকে নিঃশেষে করে-এর সঙ্গে তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মে গড়ে ওঠা অবতারবাদমূলক ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে প্রচুর মিল রয়েছে।
