সত্যকে পদ্ধতির অধীন করার প্রয়াস পাওয়া আলোকন পর্বের দর্শনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন ব্লেক। তিনি খৃস্টধর্মমতের ঈশ্বরের বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছিলেন, যাঁকে নারী-পুরুষকে মনুষ্যত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে ব্যবহার করা হয়েছে। যৌনতা, স্বাধীনতা ও স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দকে দমন করার। উদ্দেশ্যে অস্বাভাবিক আইন বা বিধি জারি করার জন্যে এই ঈশ্বরকে সৃষ্টি করা হয়েছিল। দ্য টাইগার’-এ এই অমানবীয় ঈশ্বরের ভয়ঙ্কর সামঞ্জস্যতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন ব্লেক, ঈশ্বরকে তিনি ভাষাতীতভাবে পৃথিবী থেকে ‘দূরবর্তী গভীরে এবং আকাশে বহুদূরের হিসাবে দেখেছেন। তা সত্ত্বেও, বিশ্ব জগতের স্রষ্টা সম্পূর্ণ ভিন্ন ঈশ্বর তাঁর কবিতায় পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছেন। স্বয়ং ঈশ্বরকে পৃথিবীতে পতিত হয়ে ব্যক্তি জেসাসের রূপে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। তিনি এমনকি মানবজাতির শত্ৰু স্যাটানে পরিণত হন। নাস্টিক, কাব্বালিস্ট ও আদি ট্রিনিটি মতবাদে বিশ্বাসীদের মতো ব্লেক এক কেনোসিস অর্থাৎ, গডহেডের আত্ম শূন্যকরণের চিন্তা করেছেন যিনি স্বর্গ হতে নিঃসঙ্গ পতিত হয়ে মতে অবতারে পরিণত হন। একজন স্বাধীন উপাস্যের আর অস্তিত্ব রইল না, যিনি নারী-পুরুষকে বাহ্যিক সামঞ্জস্যহীন আইনের কাছে মাথা নত করার দাবি জানান। মানুষের এমন কোনও কর্মকাণ্ড নেই যা ঈশ্বরের অজানা; এমনকি গির্জা কর্তৃক অবদমিত যৌনতাও খোদ জেসাসের আবেগে প্রকাশ। পেয়েছে। স্বেচ্ছায় জেসাসের মাঝে মৃত্যুবরণ করেছেন ঈশ্বর এবং দুর্জ্ঞেয় দূরবর্তী ঈশ্বরের আর অস্তিত্ব নেই। ঈশ্বরের মৃত্যু সম্পূর্ণ হওয়ার পর মামবসুখ ঐশীসত্তা হিউম্যান ফেস ডিভাইন’ আবির্ভূত হবেন:
জেসাস বললেন; তোমরা কি কখনও তাকে ভালোবাসবে যে কখনও তোমাদের জন্যে প্রাণ দেয়নি, কিংবা যে তোমাদের জন্যে প্রাণ দেয়নি তার জন্যে কি প্রাণ দেবে? আর ঈশ্বর যদি মানুষের জন্যে প্রাণ না দিতেন এবং নিজেকে চিরকালের জন্যে মানুষের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ না করতেন, মানুষের অস্তিত্ব থাকত না; কেননা মানুষই প্রেম যেমন ঈশ্বরই প্রেম: পরস্পরের প্রতি প্রতিটি দয়া স্বর্গীয় রূপে-ক্ষুদ্র মৃত্যু বিশেষ। স্বর্গীয় রূপে ভ্রাতৃত্ববোধ ছাড়া কোনও মানুষ টিকে থাকতে পারবে না।
প্রাতিষ্ঠানিক চার্চের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন ব্লেক, কিন্তু কিছু কিছু ধর্মবিদ আনুষ্ঠানিক খৃস্টধর্মমতে রোমান্টিক দর্শন অন্তর্ভূক্ত করার প্রয়াস পাচ্ছিলেন। তাঁরাও একজন দূরবর্তী দুয়ে ঈশ্বরের ধারণাকে পরিত্যাজ্য ও অপ্রাসঙ্গিক হিসাবে আবিষ্কার করেছেন; তার বদলে অন্তর্গত ধর্মীয় অনুভূতির ওপর জোর দিয়েছেন। ১৭৯৯ সালে ওঅর্ডসঅর্থ ও কোলরিজ ইংল্যান্ডে লিরিক্যাল ব্যালাডস প্রকাশ করার পর এবং জার্মানিতে ফ্রেইডরিখ শ্ৰেইয়ারম্যাশার (১৭৬৮-১৮৩৪) তাঁর নিজস্ব রোমান্টিক ইশতেহার অন রিলিজিয়ন, স্পিচেস টু ইটস কালচার্ড ডেসপাইজার্স বের করেন। ডগমাসমূহ স্বর্গীয় সত্য নয় বরং স্রেফ ‘ভাষায় প্রকাশ করা ক্রিস্টান ধর্মীয় দুর্বলতার বিবরণ। ধর্মীয় বিশ্বাসকে বিভিন্ন ক্রীডের প্রস্তাবনার মাঝে সীমিত রাখা যায় নাঃ এর জন্যে প্রয়োজন আবেগ নির্ভর উপলব্ধি ও অভ্যন্তরীণ আত্মসমর্পণ চিন্তা। যুক্তির নিজস্ব স্থান রয়েছে, কিন্তু এগুলো আমাদের খুব বেশি দূরে নিতে পারে না। আমরা যখন যুক্তির শেষ সীমানায় পৌঁছাই, তখন অনুভব পরমের দিকে আমাদের যাত্রা সম্পূর্ণ করবে। শ্লেইয়ারম্যাশার ‘অনুভব’-এর কথা বলে শিথিল আবেগের কথা বোঝননি বরং এক সজ্ঞার কথা বলেছেন যা নারী ও পুরুষকে অসীমের দিকে চালিত করে। অনুভব মানবীয় যুক্তির বিরোধী নয় বরং এক কল্পনানির্ভর উল্লম্ফন যা আমাদের নির্দিষ্টতাকে অতিক্রম করে সমগ্রের উপলব্ধিতে নিয়ে যায়। এইভাবে অর্জিত ঈশ্বরের অনুভূতি প্রতিটি মানুষের গভীর থেকে উঠে আসে, বস্তুগত কোনও সত্যের সঙ্গে সংঘাত হতে নয়।
তোমাস আকুইনাসের সময় হতেই পাশ্চাত্যের ধর্মতত্ত্ব যুক্তিবাদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত জোর দিয়ে আসছিল, সংস্কারের পর এই প্রবণতা আরও বেড়ে ওঠে। শ্লেইয়ারম্যাশারের রোমান্টিক ধর্মতত্ত্ব ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার প্রয়াস ছিল । তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, অনুভূতিই শেষ কথা নয়, তা ধর্মের সম্পূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে পারবে না। যুক্তি ও অনুভব উভয়ই তাদের অতীত এক বর্ণনাতীত সত্তার দিকে ইঙ্গিত করে। শ্লেইয়ারম্যাশার ধর্মের মূল সুরকে ‘পরম নির্ভরতার অনুভূতি’[১৩[ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এটা, আমরা দেখব, এমন এক মনোভাব যা ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রগতিশীল চিন্তাবিদদের জন্যে অভিশাপে পরিণত হয়েছিল, কিন্তু শ্লেইয়ারম্যাশার ঈশ্বরের সামনে শোচনীয় বশ্যতার কথা বোঝননি। বিষয়ের প্রেক্ষিতে বাক্যবন্ধটি আমরা জীবনের রহস্যের কথা চিন্তা করার সময় যে শ্রদ্ধার বোধ জেগে ওঠে তার দিকে ইঙ্গিত করে। ভয়ের এই অনুভূতি নুমিনাসের অনুভূতি থেকে জেগে ওঠা মানুষের চিরন্তন বোধ। ইসরায়েলের পয়গম্বরগণ পবিত্র আত্মার দর্শন গভীর আঘাত হিসাবে এই অনুভূতি লাভ করেছিলেন। ওঅর্ডসওঅর্থের মতো রোমান্টিকগণ প্রকৃতিতে দেখা পাওয়া আত্মার প্রতি একই রকম শ্রদ্ধা ও নির্ভরতা বোধ করেছেন। শ্ৰেইয়ারম্যাশারের বিশিষ্ট শিষ্য রুডলফ অটো তার দ্য আইডিয়া অভ দ্য হোলি শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে এই অনুভূতির বিশ্লেষণ করেন। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষ দুয়ের মুখোমুখি হলে তাদের মাঝে আর এই বোধ থাকে না যে, তারা অস্তিত্বের আলফা ও ওমেগা ।
