মধ্যযুগীয় অতিন্দ্রীয়বাদীরা অনেকটা এভাবেই ঈশ্বরের অনুভুতির বর্ণনা দিয়েছিল। ইবন আল আরাবী এমনকি আপন সত্তার গভীরে কল্পনা শক্তির ঈশ্বরের সৃষ্টিহীন সত্তার নিজস্ব অনুভূতি সৃষ্টির কথাও বলেছেন। যদিও কীটস স্যামুয়েল কোলরিজের (১৭৭২-১৮৩৪) সঙ্গে মিলিতভাবে রোমান্টিক আন্দোলনের সূচনাকারী উইলিয়াম ওঅডওসঅর্থের (১৭৭০-১৮৫০) সমালোচনামুখর ছিলেন, তাঁরা কল্পনা সম্পর্কে অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। ওঅর্ডসওর্থের সেরা কবিতাগুলো মানুষের মন ও প্রকৃতি জগতের মৈত্রীর জয়গান গেয়েছে, যারা দৃশ্য ও অর্থ সৃষ্টির লক্ষ্যে পরস্পর পরস্পরের ওপর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করে। ওঅর্ডসওঅর্থ স্বয়ং অতিন্দ্রীয়বাদী ছিলেন, প্রকৃতি সম্পর্কিত যার বোধ ঈশ্বর অনুভূতির অনুরূপ ছিল। লাইন্স কম্পোজড আ ফিউ মাইলস অ্যাবাভ টিনটার্ন অ্যাবি-তে তিনি মনের গ্রাহী অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন যা বাস্তবতার এক মোহাবেশের রূপ নিয়েছে:
সেই সুখী মন
যখন রহেস্যর ভার
যখন জগদ্দল বোঝ
এই দুর্বোধ্য জগতের
হালকা হয়ে আসে, সেই
নিরিবিলি সুখী মন
যখন মমতা ক্রমশঃ আমাদের এগিয়ে নেয়–
যতক্ষণ না মননের এই কাঠামোর শ্বাস
এমনকি আমাদের মানবীয় শোণিতের প্রবাহ
প্রায় থমকে যায়, আমরা ঘুমিয়ে পড়ি,
দৈহিকভাবে হয়ে উঠি জীবন্ত আত্মা
যখন ছন্দের শক্তিতে নীরব হয়ে ওঠা
চোখ দিয়ে আর আনন্দের গভীর
শক্তিতে আমরা সমস্ত কিছুর জীবন দেখতে পাই।
এই দৃশ্য হৃদয় আর আবেগ থেকে এসেছে, ওঅর্ডসওঅর্থের ভাষ্যে অনধিকার হস্তক্ষেপকারী বুদ্ধিমত্তা হতে নয়, বুদ্ধি সম্পূর্ণ বিশ্লেষণী ক্ষমতা এই ধরনের অনুভবকে নষ্ট করে দিতে পারে। মানুষের জ্ঞানগর্ভ বই ও তত্ত্ব প্রয়োজন নেই। আসলে যা দরকার তা হচ্ছে এক প্রাজ্ঞ নিষ্ক্রিয়তা’ ও ‘দর্শক ও গ্রাহক হৃদয়’। অন্তরের অনুভূতি থেকে অন্তদৃষ্টি সূচিত হয়। যদিও একে ‘প্রাজ্ঞ’ হতে হবে, অনুপ্রেরণাবিহীন ও আত্মমগ্ন নয়। কীটস যেমন বলতেন, যতক্ষণ আবেগে তাড়িত হয়ে প্রাণবন্ত অবস্থায় হৃদস্পন্দনে অনুভূত হয়ে হৃদয়ে না যাচ্ছে ততক্ষণ সত্য পুরোপুরি সত্যে পরিণত হয় না।
ওঅর্ডসঅর্থ একটি চেতনা উপলব্ধি করেছেন যা যুগপৎ প্রাকৃতিক ঘটনাবলীতে পরিব্যাপ্ত আবার তা থেকে বিচ্ছিন্ন
উন্নত চিন্তার আনন্দ আমাকে
অস্বস্তিতে দেখে দেওয়া সত্তা;
ঢের গভীরভাবে জড়িত কোনও কিছুর
একটা বোধ, সূর্যের রশ্মিতে যার
আবাস, আর পাক খাওয়া সাগর ও নীলাকাশ আর
মানুষের মন: এক সজীবতা ও আত্মা,
যা সমস্ত চিন্তাশীল জিনিসকে
চিন্তার সমস্ত বিষয়ক প্রলুব্ধ করে আর
বয়ে যায় সমস্ত জিনিসে।
হেগেলের মতো দার্শনিকগণ ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহে এ ধরনের চেতনা খুঁজে পাবেন। ওঅর্ডসওঅর্থ তার এই অনুভূতিকে প্রচলিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা না দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন, যদিও অন্যান্য উপলক্ষ্যে আনন্দের সঙ্গে ‘ঈশ্বর সম্পর্কে কথাবার্তা বলেছেন তিনি। ইংরেজ প্রোটেস্ট্যান্টরা অতিন্দ্রীয়বাদীদের ঈশ্বরের সঙ্গে পরিচিত ছিল না, সংস্কারকগণ এই ঈশ্বরকে আগেই বাদ দিয়ে কর্তব্যের আহবানে বিবেকের মাধ্যমে ঈশ্বর কথা বলেছেন; তিনি হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষাকে সংশোধন করে দেন, কিন্তু ওঅর্ডসঅর্থ প্রকৃতিতে যে অনুভূতি বোধ করেছেন তার সঙ্গে যেন তেমন মিল নেই। অনুভূতি প্রকাশের সঠিকতা নিয়ে আগাগোড়া সতর্ক ওঅর্ডসঅর্থ একে কেবল একটা কিছু আখ্যায়িত করেছেন যা সাধারণত পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞার বিকল্প হিসাবে প্রয়োগ করা হয়। ওঅর্ডসওঅর্থ চেতনাকে বর্ণনা করতে এর ব্যবহার করেছেন, কারণ প্রকৃত অতিন্দ্রীয়বাদী অজ্ঞাবাদের কারণে তিনি এর কোনও নাম দিতে চাননি, কেননা এটা তার জানা কোনও শ্রেণীতে খাপ খায়নি।
একই সময়ে আরেক অতিন্দ্রীয়বাদী কবির কণ্ঠে আরও প্রলয়ঙ্করী সুর ধ্বনিত হয়েছে, তিনি ঈশ্বর মৃত ঘোষণা দিয়েছেন। উইলিয়াম ক্লেক (১৭৫৭-১৮২৭) তাঁর প্রথম দিককার কবিতায় দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন: ‘নিষ্পাপ’ ও ‘অভিজ্ঞতা’র মতো শব্দগুলো সম্পূর্ণ বিপরীত মনে হওয়া এক অধিকতর জটিল বাস্তবতার অর্ধ-সত্য বলে আবিস্কৃত হয়েছে। ব্লেক ইংল্যান্ডে যুক্তির কালে কবিতার ছন্দোবদ্ধ রীতির বৈশিষ্ট্যকে অর্থাৎ ভারসাম্যপূর্ণ আন্টিথিসিসকে ব্যক্তিগত ও অন্তর্গত দৃশ্যকল্প সৃষ্টির পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করেন। সংস অভ ইনোসেন্স অ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স-এর মানবাত্মার দুটো পরস্পর বিরোধী অবস্থা সংজ্ঞায়িত না হওয়া পর্যন্ত অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে: পাপহীনতাকে অবশ্যই অভিজ্ঞ হতে হবে এবং প্রকৃত নিষ্পাপকে উদ্ধার করার আগে সর্বনিম্ন গভীরতায় পতিত হতে হবে। কবি একজন পয়গম্বরে পরিণত হয়েছেন, “যিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দেখেন এবং যিনি আদিম কালে মানুষের উদ্দেশে কথা বলা পবিত্র বাণী শোনেন:
ভ্রষ্ট আত্মাকে আহবান
জানিয়ে,
সন্ধ্যার শিশিরে কেঁদে
যা হয়তো তারা খচিত
মেরুকে নিয়ন্ত্রণ করতে
পারবে,
আর আলো
পড়ছে আর পড়ছে।
নাস্টিক ও কাব্বালিস্টদের মতো এক পরম পতনোন্মুখতার কল্পনা করেছেন ব্লেক। মানুষ যতক্ষণ না তার পতিত অবস্থাকে স্বীকার করছে ততক্ষণ প্রকৃত দিব্যদর্শন আসতে পারে না। প্রাথমিক যুগের অতিন্দ্রীয়বাদীদের মতো ব্লেক আমাদের চারপাশের জাগতিক বাস্তবতায় অবিরামভাবে উপস্থিত একটি প্রক্রিয়াকে প্রতীকায়িত করার জন্যে আদি পতনের ধারণাকে ব্যবহার করেছেন।
