সৌভাগ্যক্রমে আলোকন পর্ব মানুষকে তার এই শিশু অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম করে তুলবে। বিজ্ঞান ধর্মের স্থান গ্রহণ করবে। প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা ঈশ্বরের জন্ম দিয়ে থাকলে তাঁকে ধ্বংস করার জন্যে প্রকৃতির জ্ঞান প্রণয়ন করা হচ্ছে। সর্বোচ্চ সত্য বা গোপন নকশা বলে কিছু নেই, নেই বিশাল কোনও পরিকল্পনা। একমাত্র প্রকৃতি অস্তিত্বমান;
প্রকৃতি কোনও সৃষ্টি নয়; আগাগোড়াই স্বয়ং-অস্তিত্ববান, তার মাঝেই সমস্ত কিছু পরিচালিত হয়; সমস্ত মালমসলাসহ এক বিশাল পরীক্ষাগার সে, প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেই সকল যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করে। তার সকল কাজ আপন শক্তির ফলাফল এবং সেইসব এজেন্ট বা কারণের পরিণতি যা সে সৃষ্টি করে, ধারণ করে ও কর্মে প্রয়োগ করে।
ঈশ্বর যে কেবল অপ্রয়োজনীয় তাই নয়, বরং নিশ্চিতভাবে ক্ষতিকর। শতাব্দীর শেষ দিকে পিয়েরে-সাইমন দে লাপ্লেস (১৭৪৯-১৮২৭) পদার্থ বিজ্ঞান হতে ঈশ্বরকে উৎক্ষিপ্ত করেন। সৌরজগৎ ক্রমশঃ শীতল হয়ে আসা সূর্যের বিক্ষিপ্ত অংশসমূহে পরিণত হয়েছিল। নেপোলিয়ন যখন তাঁর কাছে জানতে চাইলেন: এ সবের স্রষ্টা কে? লাপ্লেস সোজাসুজি জবাব দিয়েছিলেন: ‘le n’avais pas besoin de cette hypothe’se-la.”
শত শত বছর ধরে ঈশ্বর ধর্মের একেশ্বরবাদীরা বরাবর বলে এসেছে– ঈশ্বর আরেকটি সত্তা মাত্র নন। তিনি আমাদের অনুভূত অন্যান্য বস্তুর মতো অবস্থান করেন নাই। পশ্চিমে অবশ্য ক্রিস্টান ধর্মবিদরা ঈশ্বর সম্পর্কে এমনভাবে আলোচনায় অভ্যস্থ হয়ে পড়েছিলেন যেন তিনি প্রকৃতই অন্যান্য অস্তিত্বমান বস্তুর মতো ছিলেন। তারা ঈশ্বরের বস্তুগত সত্যতা প্রমাণের জন্যে নতুন বিজ্ঞানকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, যেন তাকে অন্যান্য জিনিসের মতো পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করা যাবে। দিদেরো, হলবাখ ও লাসে এই প্রয়াসকে উল্টে দিয়েছেন এবং অধিকতর চরম অতিন্দ্রীয়বাদীর মতো একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন: মহাশূন্যে কিছু নেই। অচিরেই অন্যান্য বিজ্ঞানী ও দার্শনিকও সগর্বে ঘোষণা দিয়েছেন যে ঈশ্বরের প্রয়াণ ঘটেছে।
১০. ঈশ্বরের প্রয়াণ?
ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনায় নাস্তিক্যবাদ নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ আলোচনার বিষয় ছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা এক নতুন স্বাধীন চেতনার জন্ম দিচ্ছিল যা অনেককে ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীলতা ত্যাগে অনুপ্রাণিত করেছে। এই শতাব্দীতেই লুদভিগ ফয়েরবাখ, কার্ল মার্ক্স, চার্লস ডারউইন, ফ্রেডেরিখ নিৎশে ও সিগমুন্ড ফ্রয়েড বাস্তবতার দর্শন ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রণয়ন করেন যেখানে ঈশ্বরের কোনও স্থান ছিল না। প্রকৃতপক্ষেই শতাব্দীর শেষদিকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ভাবতে শুরু করেছিল যে, ঈশ্বরের এখনও মৃত্যু না ঘটে থাকলে যৌক্তিক মুক্তিপ্রাপ্ত মানুষের দায়িত্ব হচ্ছে তাকে হত্যা করা। ক্রিশ্চান পাশ্চাত্যে। শত শত বছর ধরে লালিত ঈশ্বরের ধারণা এ সময় মারাত্মকভাবে অপর্যাপ্ত বোধ হচ্ছিল; যুক্তির কাল যেন শত শত বছরের কুসংস্কার আর গোঁড়ামির বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল। আসলেই কি তাই? পশ্চিম এবার সূচনা করার সুযোগ করায়ত্ত করেছিল। এর কর্মকণ্ডের অনিবার্য পরিণাম মুসলিমদেরও প্রভাবিত করবে, যারা নিজেদের অবস্থান যাচাই করতে বাধ্য হবে। ঈশ্বরের ধারণা প্রত্যাখ্যানকারী বহু আদর্শই অর্থপূর্ণ প্রতীয়মান হয়েছে। পাশ্চাত্য খৃস্টজগতের মানবরূপী ব্যক্তি ঈশ্বর ছিলেন নাজুক। তার নামে ভয়াবহ সব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু তারপরেও তার প্রয়াণ আনন্দমুখর মুক্তি হিসাবে উদযাপিত হয়নি এবং সন্দেহ, আতঙ্ক আর কোনও কোনও ক্ষেত্রে যন্ত্রণাদায়ক বিরোধ দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ গবেষণামূলক চিন্তাধারার প্রতিবন্ধক ব্যবস্থা হতে মুক্ত করে নতুন ধর্মতত্ত্ব সৃষ্টি করে ঈশ্বরকে বাঁচানোর প্রয়াস নিয়েছিল, কিন্তু নাস্তিক্যবাদ বিদায় নেওয়ার জন্যে আসেনি।
যুক্তির কাল্টের বিরুদ্ধেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। রোমান্টিক আন্দোলনের কবি, ঔপন্যাসিক ও দার্শনিকরা উল্লেখ করেছিলেন যে, আপাদমস্তক যুক্তিবাদ ক্ষতিকর, কারণ তাতে মানবীয় চেতনার কল্পনা ও সহজাত প্রবৃত্তি নির্ভর কর্মকাণ্ড বাদ পড়ে যায়। কেউ কেউ সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গিতে খৃস্টধর্মের ডগমা ও রহস্যসমূহকে নতুন করে ব্যাখ্যা করেছেন। এই পুনর্নির্মিত ধর্মতত্ত্ব নরক ও স্বর্গ, পুনর্জন্ম ও উদ্ধার লাভের প্রাচীন থিমসমূহকে বাগধারায় রূপান্তরিত করে আলোকন পর্ব পরবর্তী মানুষের কাছে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে সেগুলোকে ‘মহাশূন্যে বিরাজিত অতিপ্রাকৃত সত্তার সঙ্গে সম্পর্ক হতে বঞ্চিত করে। এইসব ‘স্বাভাবিক অতিপ্রাকৃতবাদের অন্যতম মূলসুর ছিল আমেরিকায় সাহিত্য সমালোচক এম. আর. আব্রামস যেমন আখ্যায়িত করেছেন, সৃজনশীল কল্পনা। একে এমন এক গুণ বা বৈশিষ্ট্য হিসাবে দেখা হয়েছে যা এমনভাবে বাহ্যিক সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে যার ফলে একটি নতুন সত্যের সৃষ্টি হয়। ইংরেজ কবি জন কীটস (১৭৯৫-১৮২১) অল্প কথায় বলেছেন: ‘কল্পনা হচ্ছে আদমের স্বপ্নের মতো-জেগে উঠে তিনি একে সত্য বলে আবিষ্কার করেছেন।’ মিল্টনের প্যারাডাইস লস্টের ঈভের সৃষ্টির দিকে ইঙ্গিত করেছেন তিনি। সৃষ্টিই হয়নি এমন এক সত্তার স্বপ্ন দেখার পর ঘুম থেকে জেগে উঠে সামনে অবস্থানরত নারীর মাঝে তার দেখা পেয়ে যান আদম। একই চিঠিতে কল্পনাকে পবিত্র গুণ বা বৈশিষ্ট্য হিসাবে বর্ণনা করেছেন কীটস: ‘আমি হৃদয়ের টানের পবিত্রতা ও কল্পনার সত্যতা ছাড়া আর কোনও কিছুর ব্যাপারেই নিশ্চিতই নই-কল্পনা যাকে সুন্দর বলে গ্রহণ করে তা সত্য হতে বাধ্য-তা আগে হতেই থাকুক বা না থাকুক। সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ায় যুক্তির ভূমিকা খুবই সীমিত। কীটস মনের একটা অবস্থারও বিবরণ দিয়েছেন যাকে তিনি বলেছেন নেতিবাচক ক্ষমতা’, ‘যখন মানুষ সত্য ও যুক্তির দিকে বিরক্তিকরভাবে অগ্রসর না হয়ে অশ্চিয়তা, রহস্য, সন্দেহের পর্যায়ে অবস্থান করতে পারে। অতিন্দ্রীয়বাদীর মতো কবিকেও যুক্তির ঊর্ধ্বে উঠে নীরব প্রতীক্ষার মনোভাব নিয়ে নিজেকে ধরে রাখতে হয়।
